বিলাতি ধনেপাতা চাষে ধনী দুই বন্ধু!

রেজাউল করিম সোহাগ, শ্রীপুর: দুই বন্ধু মাহবুব আর মফিজুল। দু’জনই ছিলেন অটোচালক। বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে থাকেন। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কলুর বলদের খাটুনিও তাদের সংসারের অভাব দূর করতে পারছিল না। তিন চাকার বাহনে বসে একপর্যায়ে ভিন্ন স্বপ্ন বুনেন দুই বন্ধু। স্থানীয় কৃষকদের উত্পাদিত শাকসবজি নিয়ে গ্রাম থেকে শহর-উপশহরে যেতে হতো তাদের। লাউ, কুমড়া, শসা, ধনেপাতাসহ বিভিন্ন তরকারি অটোরিকশায় বহন করতে হতো। দুই বন্ধু সিদ্ধান্ত নিলেন তারাও কৃষি কাজে লেগে যাবেন।
সংসারের আয়ের বাহন সিএনজি অটোরিকশা বিক্রি করে শুরু করলেন বিলাতি ধনেপাতার চাষ। প্রথম বছরেই বাজিমাত। পরের বছর চাষের পরিধি বাড়ল কয়েক গুণ। অটোচালক দুই বন্ধু বিলাতি ধনেপাতা চাষে এখন লাখপতি! সফল এই দুই বন্ধু হলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের দক্ষিণ বারোতোপা গ্রামের আজিজ মুন্সির ছেলে মফিজুল ও মুছেন সিকদারের ছেলে মাহবুব সিকদার। তাদের ধনী হওয়ার গল্প এখন বেকারদের ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
মফিজুল বলেন, বিলাতি ধনেপাতা আমাদের সংসারের আলাদিনের চেরাগ। অভাব-অনটনে নিমজ্জিত আমাদের সংসারে বিত্তের আলো ফুটিয়েছে এই ধনেপাতা। তিনি জানান, সিএনজি অটোরিকশা বিক্রির টাকা থেকে প্রথম বছর বিশ হাজার টাকা দিয়ে এক কেজি বীজ কেনেন দুই বন্ধু। এক বিঘা জমিতে চাষ শুরু করেন। ওই বছরই খরচ শেষে দুই লাখ টাকার ব্যবসা হয়। পরের বছর আরও বেশি জমিতে চাষ করতে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে চার লাখ টাকার বীজ কিনে সাড়ে চার বিঘা জমিতে চাষ করেন। ওই বছর প্রায় পঁচিশ লাখ টাকার ব্যবসা হয়। চলতি বছর আরও বেশি টাকার ধনেপাতা বিক্রি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
মাহবুব সিকদার বলেন, এখন আমরা প্রায় ছয়
বিঘা জমিতে ধনেপাতার চাষ করছি। এসব জমিতে ধনেপাতার সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে মাচায় চাল কুমড়া ও ঝিঙা চাষ করছি। এতে ধনেপাতার প্রয়োজনীয় ছায়ার পাশাপাশি সবজি বিক্রি করে প্রায় তিন লাখ টাকার অতিরিক্ত মুনাফা হয়েছে। এখন নিয়মিত ৩০-৩৫ জন লোক আমাদের এ চাষাবাদে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। এ বছর আমাদের ১০-১২ লাখ টাকা শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে।
মাহবুব জানান, জেলা শহরের আড়তসহ ঢাকার কারওয়ান বাজারে বিক্রি হয় এসব ধনেপাতা। বর্তমানে ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে পাতা বিক্রি করা হচ্ছে। সামনে হয়তো ১২০-১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা যাবে। এ বছর এবং আগামী বছর মিলে আমাদের টার্গেট এক কোটি টাকার বিলাতি ধনেপাতা ও বীজ বিক্রি করা।
নারী শ্রমিক সরবানু জানান, এখানে ২৫০-৩৫০ টাকায় আমরা ৩০-৩৫ জন শ্রমিক হাজিরা কাম করে খাই। হাজিরার টাকা সপ্তাহে বা মাসে নেই। ঈদেও বোনাস দেয় মালিকরা।
মাওনা ইউপি সদস্য মো. সুরুজ্জামান বলেন, মফিজুল ও মাহবুবের সাফল্যে আমরা গর্বিত। তাদের এ সাফল্য দেখে এলাকার অনেক বেকার যুবক এমন কাজে আগ্রহী হচ্ছে।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা তাহমিনা সুলতানা জানান, এমন পরিসরে বিলাতি ধনেপাতা চাষ এ অঞ্চলে প্রথম। তাদের অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে আরও বেশি কাজ করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যে আমাদের দফতরের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রজেক্ট ঘুরে দেখেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম জানান, বিলাতি ধনেপাতার সবুজ আস্তরণের আশি শতাংশই পানি। এতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যগুণ। রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আরও রয়েছে অধিক পরিমাণ খনিজ, ক্যালসিয়াম, ফাইভার (খাদ্য আঁশ) এবং ভিটামিন এ।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এএসএম মূয়ীদুল হাসান জানান, খাবারে সুগন্ধি ছড়াতে বিলাতি ধনেপাতার জুড়ি নেই। ভারতীয় অঞ্চলে এ ফসলের চাষ শুরু হলেও এখন এ অঞ্চলের মাটিতে বিলাতি ধনেপাতা চাষ সম্ভাবনাময় একটি ফসল। বিলাতি ধনেপাতার বিশেষত্ব হল বর্ষাতেও পচন ধরে না। এ সময় বাজারে দামও বেশি পাওয়া যায়। মফিজুল-মাহবুবের সাফল্য আমাদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের সব ধরনের সহায়তা করবে কৃষি অফিস।