চিরন্তন সবুজ, অদম্য মানুষ

ঈদের ছুটিতে ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়। চেনা ঢাকা অনেকটাই অচেনা মনে হয়। ৭ জুলাই ঈদের দিনে গুলশান এলাকা থেকে চলেছি ধানমণ্ডি ৪ নম্বর সড়কে। তেজগাঁও সাতরাস্তার কাছে এসে মগবাজার ফ্লাইওভারে না উঠে ডানদিকে মোড় নিয়ে গাড়ি চলল ‘ট্রাকস্ট্যান্ডের রাস্তা’ ধরে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না_ এ কোন্ সবুজের রাজ্যে এসে পড়েছি! মাত্র কিছুদিন আগেও এ এলাকায় রিকশা, সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা গাড়ি, কোনো ধরনের যানবাহন নিয়েই প্রবেশ করায় আগ্রহবোধ করতাম না। চারদিকে শুধু ট্রাক আর ট্রাক। এলোমেলো করে রাখা ট্রাকের এপাশ-ওপাশ দিয়ে একটু এগোতে পারতে না পারতেই ফের অবরুদ্ধ হয়ে পড়া।

২০০৭ সালে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের বিশেষ ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পর ‘ধর-মার-কাট’ নীতি-কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। রাজনীতিক-ব্যবসায়ী-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-ট্রেড ইউনিয়ন নেতাসহ অনেককেই যেনতেন বিচারে কয়েক বছরের জেল দেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে সাতরাস্তার ট্রাকস্ট্যান্ডটিও স্বাভাবিক রূপ ফিরে পায়, যা দেখে কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন_ বাঙালি কেবল ‘ডাণ্ডাতেই ঠাণ্ডা’ থাকে। এমনও বলা হয়, গণতান্ত্রিক শাসনামলে এমনটি সম্ভব নয়। এই আপ্তবাক্যই যেন সঠিক প্রমাণ করে দেয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকার। ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের কারণে যে পাকা সড়কটিকে মনে হচ্ছিল ‘শেরেবাংলা নগরের মানিক মিয়া এভিনিউয়ের মতো প্রশস্ত’_ স্বল্প সময়ের মধ্যেই সেটা আবার দখল করে নেয় মালিক ও শ্রমিকরা। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের অবশ্যই এতে সায় ছিল, মদদও ছিল। কারও কারও হয়তো ‘ভাগও’ ছিল।

এভাবেই চলে যায় কয়েক বছর। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন আনিসুল হক। তিনি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতা ছিলেন। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের অগ্রণী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ছিলেন। টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। ঢাকা সিটিকে নতুন রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মেয়র হিসেবে কাজ শুরু করেন। আলাপ-আলোচনা ও সময় দেওয়ার পরও ২৯ নভেম্বর সিটি করপোরেশন সাতরাস্তা-কারওয়ান বাজার সড়ক থেকে ট্রাক সরিয়ে নেওয়ার জন্য মালিক-শ্রমিকদের আহ্বান জানালে দ্রুতই তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে ব্যারিকেড। পুলিশ আসে বাঁশি বাজিয়ে। পরিস্থিতি অগি্নগর্ভ হয়ে উঠতে থাকলে মেয়র আসেন ঝুঁকি নিয়ে। তাকে হেনস্তা করারও চেষ্টা হয়। তবে তিনি অনড় থাকায় ওই এলাকা থেকে ট্রাক বিদায় নেয়। নতুন করে আস্তানা গাড়তে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জান খান কামাল এ এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। সাতরাস্তা-কারওয়ান বাজার সড়কটিতে যেন স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলে সে জন্য তিনি সব ধরনের সহায়তা দেন। ফলে গতি বাড়ে। কিছুদিন পর সড়কটিতে রোড ডিভাইডার বসে। আইল্যান্ডে গাছ লাগানো হয়। বর্ষার পানি সেসব গাছকেই আস্তে আস্তে বড় করে তোলে। ঈদের দিনে এ সড়কের সবুজ দেখে মুগ্ধ হই। এদিন সকালে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঐতিহ্যবাহী ঈদের জামাতের খুব কাছেই সন্ত্রাসী হামলা হয়। মনটা তাই বিষণ্ন ছিল। মাত্র সাত দিন আগেই গুলশানে হলি আর্টিসান বেকারিতে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় অন্তত ২০ জনকে। সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিহত হন দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা। আমাদের এই সবুজ-শ্যামল জনপদ সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠবে, শ্বাপদেরা অবাধে বিচরণ করবে_ এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দেশবাসী নিদারুণ ক্ষুব্ধ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিশ লাখ নারী-পুরুষ-শিশুর রক্তে বাংলার সবুজ মাটি লাল হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি অল্পদিনের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এক জার্মান নাগরিক ১৯৭৩ সালে বলেছিলেন বাংলাদেশের প্রকৃতি আর মানুষ নিয়ে তার অভিজ্ঞতা। তিনি ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে যশোর থেকে সড়কপথে ঢাকা আসার সময় দুই পাশের বেশিরভাগ বাড়ি দেখেন আগুনে পোড়া। গাছপালা প্রায় নেই। চলার পথ নিরাপদ রাখতে হানাদাররা কেটে দিয়েছিল গাছ। এক বছর পর একই পথ ধরে তিনি যশোর থেকে ঢাকা আসেন। বিস্ময়াভিভূত হয়ে তিনি দেখেন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রায় সব মানুষ নিজ নিজ ঘর তুলে ফেলেছে। প্রকৃতিও সবুজ হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

হাতিরঝিল নতুন রূপ পাওয়ার পরও এমন দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে ঝিল ও সড়কপথ নির্মাণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি সবুজ-শ্যামল করতে তো চাই প্রকৃতির সহায়তা। রাতারাতি তো গাছপালা গজায় না। হাতিরঝিলের ব্যবস্থাপকরা সেখানের সড়কের দু’পাশে লাগালেন নানা জাতের গাছ। এগুলো কি বেড়ে উঠতে পারবে? কোনো কোনো সংবাদপত্র শুকিয়ে যেতে থাকা গাছের আলোকচিত্র ছেপে মন্তব্য করে_ টাকা গেল জলে। কিন্তু দ্রুতই আমরা দেখি জলই সব গাছ বাঁচিয়ে দিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি প্রকল্পটি চালু হয়। তখন শীতের সময়। প্রকৃতি রুক্ষ। গাছের পাতা ঝরে পড়ে। কিন্তু এখানে তো গাছই নেই। অথচ শীতের পর বসন্ত ও গ্রীষ্মের তাপদাহ শেষে যেই না বর্ষা এলো আকাশ ফুঁড়ে, আনন্দে হেসে উঠল হাতিরঝিলের মৃতপ্রায় ছোট ছোট গাছের চারাগুলো। এরপর চার বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। হাতিরঝিল এখন রীতিমতো সবুজ উদ্যান। এশিয়ার নানা দেশ থেকে, ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে যারা এ এলাকায় পা রাখেন কিংবা দ্রুতগতিতে মোটরযানে ছুটে চলেন_ সবাই মুগ্ধ হন। সাতরাস্তা-কারওয়ান বাজার ট্রাকস্ট্যান্ডের সড়কের কচি গাছগুলোও প্রথমবারের মতো বর্ষার ছোঁয়া পেয়ে সজীব-প্রাণোচ্ছল হয়ে ওঠে। এ দৃশ্য দেখে গুলশান-শোলাকিয়ায় দুর্বৃত্তদের নৃশংস ছোবলের ঘটনায় বিষণ্ন মনটা হঠাৎই যেন সাহস ফিরে পেল। নিজেকেই যেন বলে উঠি, আমরা হার মানব না। এ বাংলাদেশ তো নিজের শক্তিতেই জেগে উঠতে পারে।

কয়েক বছর আগের ঘটনা। মুম্বাই শহর প্রবল বর্ষণে বিপর্যস্ত। প্রকৃতির রুদ্ররোষ নিয়ে খবর বের হলো সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে মানুষের দুর্দশার চিত্র। দ্বিতীয় দিনে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা শুরু করলেন_ কয়েক বছর আগে একই ধরনের বৃষ্টির পর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ও জনজীবন স্বাভাবিক করতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল সরকারি পর্যায়ে_ তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? তৃতীয় দিনে গণমাধ্যম ভিন্নরূপে দেখা দিল, সব সংবাদপত্রের শিরোনাম_ মুম্বাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কীভাবে জনজীবন স্বাভাবিক হয়ে আসতে শুরু করেছে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে, কারখানায় উৎপাদন চলছে, কৃষকরা মাঠে কাজ করছে_ এমনি নানা সচিত্র খবর তুলে ধরা হয়েছে।

মাত্র কয়েকটি মাসে সাতরাস্তা-কারওয়ান বাজার ট্রাকস্ট্যান্ডের সড়ক কিংবা হাতিরঝিল যেভাবে প্রকৃতির ছোঁয়ায় এবং একই সঙ্গে এর ব্যবস্থাপকদের আন্তরিকতায় সবুজ-শ্যামলরূপে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে, তাতে নিশ্চিত ভরসা পাই, আশ্বস্ত হই_ বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াবেই। কেউ আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না।