শোলাকিয়াকে ‘কারবালা’ হতে দেয়নি পুলিশ

দেশের বৃহত্তম ঈদের জামাত শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে জঙ্গি হামলায় হতাহতের ঘটনা তিন দিন ধরে দেশজুড়ে প্রধান আলোচিত বিষয়। এদিকে কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকায় বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি। অনেকেই বলছেন, পুলিশের বাধা পার হয়ে জঙ্গিরা ঈদগাহ মাঠে প্রবেশ করতে পারলে সেদিন ‘কারবালা’ প্রান্তর হয়ে যেত শোলাকিয়া।

শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে প্রতিবছর তিন লাখেরও বেশি পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরের ছাদে বসেও লোকজন ঈদের নামাজ আদায় করে। সব মিলিয়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া ময়দান। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এবার ওই জনসমুদ্রে মুসল্লিদের বেশে মিশে গিয়ে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল জঙ্গিরা।

পুলিশ সদস্যরা জীবন বাজি রেখে মাঠে হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেন। ফলে সীমাহীন হত্যাযজ্ঞের হাত থেকে বেঁচে যায় হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় হয়ে চরশোলাকিয়ার সবুজবাগ আবাসিক এলাকার প্রবেশপথেই পুলিশের চেকপোস্ট ছিল। এখানেই পুলিশের প্রথম বাধার মুখে পড়ে জঙ্গিরা হাতবোমা ফাটায়।

পুলিশ জানায়, বোমার আঘাতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়ে পড়লে তাঁদের মধ্যে আনসারুল্লাহ ও জহিরুল ইসলাম নামের দুজনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুই জঙ্গি। চেকপোস্ট পার হয়ে মাঠের ভেতর ঢুকে জঙ্গিরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে বা গুলি ছুড়লে ভয়াবহ পরিণতি হতো। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তাব্যক্তি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণাই মিলেছে।

শ্রম ও জনকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নু এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পুলিশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ঘটনাটি সামাল দিয়েছে। নামাজ শুরুর আগেই জঙ্গি হামলা ঠেকিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি মাঠে ঘটলে অনেক মানুষ মারা যেত। এ ছাড়া হামলার খবর মাঠে পৌঁছে গেলেও অঘটন ঘটে যেত।’

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকও সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘হামলাকারীদের টার্গেট ছিল শোলাকিয়া মাঠ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতার কারণে বড় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছে দেশ।’

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘হামলাকারীদের উদ্দেশ্যই ছিল শোলাকিয়া মাঠে হামলা চালানো। তারা কোনোভাবে সফল হলে স্মরণকালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শোলাকিয়ায় ঘটত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে সেই ভয়াবহ ঘটনা থেকে রক্ষা করেছে দেশকে।’

স্থানীয়রা জানিয়েছে, শোলাকিয়া মাঠে হামলার গুজব ছড়িয়ে পড়লেও হুড়োহুড়ি ও পদদলনে ব্যাপক প্রাণক্ষয় ঘটতে পারত। বড়দের সঙ্গে ঈদের নামাজে হাজার হাজার শিশু শোলাকিয়ায় আসে। ফলে বিপর্যয় হতো ভয়াবহ। ওই মাঠে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া বাজিতপুরের মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ জঙ্গিদের না আটকালে শোলাকিয়া মাঠ কারবালা ময়দান হয়ে যেত।’

ঈদের দিন সকাল পৌনে ৯টায় শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের আধাকিলোমিটারের মধ্যে আজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে পুলিশের চেকপোস্টে জঙ্গিদের বোমা হামলায় দুই পুলিশ, এক নারী ও এক জঙ্গি প্রাণ হারায়। ওই ঘটনায় আট পুলিশ সদস্যসহ তিন পথচারী গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ জঙ্গিদের ব্যবহৃত দুটি পিস্তল, দুটি চায়নিজ কুড়াল ও একটি চাপাতি উদ্ধার করে।