বৈশ্বিক সমীকরণ ও বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শতাব্দী প্রাচীন। উপমহাদেশের প্রবেশপথ খায়বার গিরিপথ ধরে একসময়ের বিখ্যাত সিল্ক রুট প্রসারিত ছিল বাংলাদেশ পর্যন্ত। আর এদিকে সমুদ্রপথে চীনা বন্দরগুলো থেকে পণ্যপ্রবাহ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে পৌঁছে যেত দিল্লি পর্যন্ত। সেই চিরায়ত সম্পর্কে খানিকটা ছেদ পড়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে এ অঞ্চলের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হয়। আঞ্চলিক কৌশলগত কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। উভয় দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। ১৯৯০ সাল থেকে চীন অর্থনৈতিক সংস্কারের আওতায় বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। কঠোর পরিশ্রমী চীনা জনগণের অবদানে মহাচীনের অর্থনীতিতে মহা উল্লম্ফন ঘটে। চীন হয়ে দাঁড়ায় অন্যতম ‘অর্থনৈতিক পরাশক্তি’। অর্থনৈতিক শক্তি রাজনৈতিক শক্তিকে অপ্রতিরোধ্য গতি দান করে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বব্যাপী চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অনুভূত হতে থাকে। জাপানের অর্থনৈতিক পরাক্রমের পর চীনের উত্থান এবং উদীয়মান বাঘ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার অব্যাহত উন্নয়ন পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী হওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট করে তোলে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সময় ও সংকটের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এখন স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে। এখন অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে— অর্থসাহায্য, কারিগরি সাহায্য, অনুদান, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি এবং উন্নয়ন প্রকল্পে— প্রতিটি ক্ষেত্রে চীন-বাংলাদেশের সম্পর্ক উচ্চমার্গের। বিশেষত সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র এবং সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে উভয় দেশের সম্পর্ক ঈর্ষণীয়। চীন বাংলাদেশের সামরিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে প্রধান সরবরাহকারী দেশ। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈশ্বিক সমীকরণ সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অব্যবহিত পরে যখন আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন অনেকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার কারণ মনে করা হয়, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগ এর স্বাভাবিক মিত্র নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় চীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধিতা করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে ভেটো প্রয়োগ করেছে। আরো সংবেদনশীল বিষয় হচ্ছে, চীন ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার পর পরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের বেজায় রাগ থাকারই কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বাস্তবতাকে মেনে নেয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ২১ বছর পর ক্ষমতাসীন হয়, তখন চীনের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের কোনো টানাপড়েন ঘটেনি। এবার যখন বিরোধী দল কথিত অবৈধ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সাধারণ জনগণ মনে করছিল, চীনও পাশ্চাত্যের মতো নির্বাচনকেন্দ্রিক সমালোচনা অব্যাহত রাখবে। প্রাথমিকভাবে একটু-আধটু সমালোচনা করলেও পরে আওয়ামী লীগের নির্বাচন মেনে নেয়। অবশ্য এত দিনে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা এবং হুয়াংহু-ইয়াংসিকিয়াং-ব্রহ্মপুত্রে অনেক পানি গড়িয়েছে। চীন এখন আর পুঁজিবাদবিরোধী শক্তি নয়। বরং বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক।
‘লেট বেটার দ্যান নেভার’ অবশেষে বাংলাদেশে চীনের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ৭৭৪ একর জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে দেশের প্রথম ‘জিটুজি’ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এটি স্থাপনের কাজও পেয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান চীনা হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। এ নিয়ে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক কর্তৃপক্ষের (বেজা) একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ সমঝোতা স্মারক জিটুজি পর্যায়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে একটি মাইলফলক। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১০০ কোটি ডলার বিদেশী বিনিয়োগ আসবে। এটি বাস্তবায়ন হলে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। চীন যে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হতে চায়, এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা প্রমাণিত হলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী দুবছরের মধ্যে উন্নয়নকাজ সমাপ্ত করে অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কেমিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যাল, গার্মেন্টস, টেলিযোগাযোগ, কৃষিনির্ভর শিল্প-কারখানা, রাসায়নিক দ্রব্য, ডিজিটাল যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, টেলিভিশন/ মনিটর, চিকিত্সা/ অপারেশনের যন্ত্র, প্লাস্টিক এবং আইটিসহ বিভিন্ন শিল্প স্থাপন করা হবে। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় এ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ মালিকানা থাকবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় ৭৭৪ একর জমির মধ্যে ২৯০ একর এরই মধ্যে বন্দোবস্ত দিয়েছে সরকার। এ জমি অধিগ্রহণের জন্য গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ৪২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন করা হয়।
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন। উল্লেখ্য, উভয় দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গত তিন দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। তবে বাণিজ্যিক ব্যবধান ব্যাপক। চীন এক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৬ সালে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক্ষেত্রে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। চীন বাণিজ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আফতা) আওতায় চীন ৮৪ প্রকারের বাংলাদেশী পণ্যদ্রব্যের রফতানি শুল্ক রোহিত করেছে। এখন পাট ও টেক্সটাইলের ওপর থেকে শুল্ক রহিত করার প্রক্রিয়া চলছে। চীন বাংলাদেশের অব্যাহত বিদ্যুত্ চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্প স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উন্নয়নে চীনা অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধির প্রস্তাবও এসেছে। চীন এখন বাংলাদেশ থেকে চামড়া, তুলা, মাছ ইত্যাদি আমদানি করে এবং বাংলাদেশে টেক্সটাইল মেশিনারি, ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি, সিমেন্ট, সার, টায়ার, কাঁচা রেশম ও ডাল রফতানি করে। আমদানি-রফতানি উভয় ক্ষেত্রে নিজ নিজ দেশ আরো পণ্য বিনিময় বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ২০১০ সাল-পরবর্তী উভয় দেশে বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি ব্যাপকতর হয়ে ওঠে। এ সময় চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে ওঠে। ২০০৫ সালে চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়া বাও বাংলাদেশে এক সরকারি সফরে আসেন। এ সময় বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশেষত পরিবহন ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে নজর দেয়া হয়। এ সময় মিয়ানমার হয়ে ঢাকা-বেইজিং ভায়া কুনমিং বিমান চলাচলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। চীনা প্রধানমন্ত্রী তাত্ক্ষণিকভাবে চট্টগ্রামে ডিঅ্যালুমিনিয়াম ফসফেক্ট (ডিএপি) সার কারখানা সহজ ঋণে স্থাপনে চীনা সহায়তার তাত্ক্ষণিক প্রতিশ্রুতি দেন। এর পরের বছর ২০০৭ সালে চীনা সহকারী বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং চাও বাংলাদেশ সফর করেন। তার সঙ্গে ছিল ৩৯ সদস্যের চীনা ব্যবসায়ী দল। তারা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশে আসেন। সম্ভবত এটিই ছিল বাংলাদেশ সফরকারী বিদেশী বৃহত্তম বাণিজ্যিক দল। এর মধ্যে ছিল এমন ১০টি কোম্পানি, যাদের গোটা পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে।
চীনের অর্থনীতির ব্যাপক সমৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রচুর বিনিয়োগ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। চীন উন্নয়ন অর্থনীতি, সেবা খাত এবং শিল্প উন্নয়নে পৃথিবীব্যাপী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে। সাম্প্রতিককালে যে অর্থনৈতিক মন্দা গোটা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়, তা চীনের অর্থনীতিকে কোনো রকম ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি। বাংলাদেশের অব্যবহূত সম্ভাবনাময় জনশক্তি চীনা বিনিয়োগের একটি বড় কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ এখন পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের এশীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। চীন বাংলাদেশের এ অগ্রগতিকে নিজস্ব কুশলতা দ্বারা তার পক্ষে নিতে চায়। চীন এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইউরোপ-আমেরিকায় যদি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের রফতানি সংকুচিত হয়ে আসে, তাহলে চীনসহ পূর্ব এশিয়া হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের আরেকটি বৃহত্ বাজার। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রে চীন এশিয়া, আফ্রিকা ও পাশ্চাত্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। এরই মধ্যে যথেষ্ট চীনা বিনিয়োগ এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ বিনিয়োগের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। ২০১১ সালে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য ২১৯টি প্রকল্প প্রস্তাব আসে। এর মধ্যে অধিকাংশই চীন থেকে আগত। বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কাঠামোগত বাধা হলো পরিবহন তথা যোগাযোগ সমস্যা। প্রস্তাবিত ঢাকা-ইউনান সড়ক যোগাযোগ সম্পন্ন হতে পারলে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটা অসম্ভব ছিল না। সেক্ষেত্রে মধ্যবর্তী মিয়ানমারকে বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী করতে পারলে উভয় দেশই উপকৃত হবে। চীনের সর্ব দক্ষিণে ভূবেষ্টিত ইউনান প্রদেশ বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটতম দূরত্বে রয়েছে। সে কারণে ইউনানের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা যোগাযোগের ব্যাপারে বেশ উত্সাহী। অদূর ভবিষ্যতে সড়ক যোগাযোগটি সম্ভব হলে তা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য এ শিল্প বাণিজ্য সম্ভাবনা প্রসারিত হতে পারে মেকং অববাহিকার দেশ কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত। চীনের নবগঠিত এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) প্রাচ্যের তথা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। চীনের আহ্বানে বাংলাদেশ এআইআইবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যপদ গ্রহণ করে সম্মানিত হয়েছে। পাশ্চাত্যের বিশ্বব্যাংক (ডব্লিউবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মোকাবেলায় বিকল্প শক্তি হিসেবে ওই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা এ অঞ্চলের জন্য একটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী অক্ষুণ্ন থাকলে ওই ব্যাংক এবং চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এ অঞ্চলের জন্য সমৃদ্ধ ভবিষ্যত্ নির্মাণ করবে।
বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘আপন মাংসে হরিণ বৈরী’। সে রকম বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দেশের জন্য অপরিসীম সম্ভাবনা এবং অনতিক্রম্য সমস্যার সৃষ্টি করেছে। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করতে পারে। কূটনীতিক মহল মনে করেন, বাংলাদেশের এ অবস্থান বুমেরাংও হতে পারে। অস্বীকার করে লাভ নেই যে, বাংলাদেশ এক রকম চারদিকে থেকেই ভারতবেষ্টিত। আর ভারত হচ্ছে এ অঞ্চলের প্রধান শক্তি। সুতরাং ভারতের কব্জা থেকে বাংলাদেশের বের হওয়ার পথ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং কণ্টকাকীর্ণ। চীনের প্রসঙ্গ এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, সে ভারতের এক রকম চিরায়ত বৈরী। যেহেতু চীন ভারতের শত্রু, সেহেতু ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র। পৃথিবীর এ অঞ্চলে অর্থাত্ বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিবলয়ের পুনর্বিন্যাস চলছে, সে কারণে বাংলাদেশে চীনের বৃহত্ বিনিয়োগ এবং প্রকল্প সহায়তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনা সহায়তা এক রকম নিশ্চিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমীকরণের ফলে তা পরিত্যক্ত হয়। অন্যদিকে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীন আগ্রহ দেখালেও এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যায় প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ ও সুবিধা দেয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। চীন যাতে বঙ্গোপসাগর তথা বাংলাদেশ সীমানায় পা ফেলার কোনো জায়গা না পায়, সেজন্য আঞ্চলিক এবং একক পরাশক্তি সক্রিয় রয়েছে বলে বাংলাদেশের কূটনীতিক মহল মনে করেন। আন্তর্জাতিক যাঁতাকলে বাংলাদেশের স্বার্থ নিষ্পিষ্ট হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কথায় যেমন বলে— ‘বাঘে মহিষে লড়াই করে, উলু খাগড়া পড়ে মরে’।