সেন্ট্রাল আফ্রিকায় চিকিত্সার ভরসা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

পেটে খাবার নেই। পরনে ভালো কাপড় তো স্বপ্নের মতো। সামাজিক নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। পড়াশোনার কোন সুবিধাজনক ব্যবস্থা নেই। বাসস্থানের অবস্থাও ভালো না। বিশাল ভূখন্ডে যাতায়াতের জন্য একটিমাত্র প্রধান সড়ক। বলছিলাম সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের কথা। এমন একটি দেশে চিকিত্সা ব্যবস্থা যে নাজুক হবে এটা সহজেই অনুমেয়।

পুরো দেশটিতে কেবল রাজধানী বাঙ্গীতে একটিমাত্র সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। দেশটির মানুষ এইচআইভিসহ নানা রোগে ভুগছে প্রতিনিয়ত। আর মরার উপর খাঁড়ার ঘাঁ হিসেবে রয়েছে প্রতিদিনকার সংঘর্ষ। এতেও আহত হয়ে অনেকেই আসে হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে ভাল চিকিত্সা পান না তারা।

তবে এমন একটি জনপদের জন্য আর্শিবাদ হয়ে দেখা দিয়েছে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল। এটি দেশটির কাগাবান্দুরে অবস্থিত। ব্যানব্যাট-২ এর নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি মেডিক্যাল টিম। এখানে গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি, ডেন্টালসহ সবধরনের রোগের চিকিত্সা দেয়া হয়। রয়েছে আইসিইউ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার। রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম এবং এক্সরের ব্যবস্থাও রয়েছে।

প্রতিদিন লাইন ধরে এই হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। আহত হয়েও লোকজন আসছেন। তারা বলছেন, এই হাসপাতালের চিকিত্সা আমাদের একমাত্র ভরসা। জানা গেছে, এই অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিত্সক, নার্সসহ ৬৯ জন জনবল রয়েছে। এখানে আছে চিকিত্সার আধুনিক সব যন্ত্রপাতিও।

মিনস্কা মিশনের কর্মকর্তারাও এখানে চিকিত্সা নিতে আসেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই চিকিত্সা কার্যক্রম দেখে কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়েছেন। কর্মকর্তারা বলেন, এমন জায়গায় উন্নতমানের হাসপাতাল ভাবতে অবাক লাগে। তবে এটা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষেই সম্ভব। যদিও এটি শান্তি রক্ষীদের রুটিন দায়িত্ব নয়। ২৪ ঘন্টা এই হাসপাতাল খোলা থাকে। স্থানীয় মানুষ শ্রদ্ধা করে এবং ভালোবাসে শান্তি রক্ষা মিশনে অবস্থানরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে। মেজর জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসানের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ১৯ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। রাজধানী বাঙ্গী থেকে প্রায় ৫শ কিলোমিটার দূরে দুর্গম এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত উক্ত অস্থায়ী হাসপাতাল। প্রতিনিধিদলের প্রধানের সঙ্গে মিশন কর্মকর্তাদের বৈঠককালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অস্থায়ী হাসপাতালে অসহায় মানুষদের চিকিত্সা সেবা প্রদানের বিষয়টি শান্তিরক্ষী মিশনের বিরল এক দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেন মিনস্কা মিশনের কর্মকর্তারা।

জানা যায়, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকেকর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নিন্মমানের। শহর ব্যতিত অন্যান্য এলাকায় রাস্তা নেই বললেই চলে। দেশটির সড়ক পথের সর্বমোট দূরত্ব ২৪ হাজার কিলোমিটার। এরমধ্যে মাত্র ৭০০ কিলোমিটার পিচঢালা রাস্তা। জাতীয় সড়ক পথের দূরত্ব ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এছাড়া আঞ্চলিক সড়কপথের দূরত্ব ৩ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। বাকি ১৫ হাজার ২৬৪ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে চলা পথ। এসব রাস্তা বিভিন্ন গ্রামে বিদ্যমান। অনেক গ্রাম রয়েছে যেখানে চলাচলের রাস্তা না থাকায় অত্যন্ত দুর্গম ও ঝুকিপূর্ণ। ক্যামেরুন ও চাঁদের সঙ্গে সড়ক পথে বাসে যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকলেও সেটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অনিয়মিত। দেশটির একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলো ‘বাঙ্গী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। সেন্ট্রাল আফ্রিকার অভ্যন্তরে আঞ্চলিক কোন বিমান চলাচল নেই। এছাড়া দেশটিতে রেলপথের কোন ব্যবস্থা নেই। যোগাযোগের চরম অব্যবস্থার মধ্যে চিকিত্সা সেবা নিয়ে প্রতিদিন স্থানীয় জনগণ অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার। অনেকে সুচিকিত্সার অভাবে কাতরাতে কাতরাতে মারা যায়। এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।

সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ১৭টি প্রদেশে বিভিক্ত। প্রত্যেকটি প্রদেশ আঞ্চলিক পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত হয়। এটাকে বলা হয় সাধারণ পরিষদ। প্রত্যেকটি প্রদেশের সভাপতিত্ব করেন প্রিফেক্ট। এসব প্রদেশ আবার ৭১টি উপ-প্রদেশে বিভক্ত। বেশিরভাগ প্রদেশের নামকরণ করা হয়েছে সেই এলাকার নদীর নামে।