বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬% ছাড়াল

টানা কয়েক বছর স্থবিরতার পর বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে গতি ফিরেছে। গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ঋণ প্রবৃদ্ধি। ব্যাংক ঋণের সুদহার কমায় নতুন বিনিয়োগ ও পুরনো বিনিয়োগের সম্প্রসারণ, তৈরি পোশাক খাতের সংস্কারসহ নানা কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। আগের মাসে যা ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল সমকালকে বলেন, বিনিয়োগ চাহিদার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। যে হারে বাড়ছে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিলেও ঋণ নেওয়ার তুলনায় বেশি পরিশোধ করছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রক্ষেপণের মধ্য থেকেই ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে দীর্ঘসময় ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা ছিল। অস্থিরতা এখন কমেছে। পাশাপাশি রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোর বেশ উন্নয়ন হয়েছে। নতুন করে অনেক কারখানা বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ পেয়েছে। এসব কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আসছে। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নতুন উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকার এসএমই ঋণ নিয়ে নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ১২ শতাংশ বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরের মধ্যে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এখন সর্বনিম্ন সুদে ঋণ পাচ্ছেন। গত এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর ঋণের গড় সুদহার ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের বছরের একই মাসে যা ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ ছিল। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ছিল ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। দুই থেকে তিন বছর আগেও অনেক ক্ষেত্রে শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ নিতে ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হতো। এখন নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন এমন উদ্যোক্তারা ১০ শতাংশের কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন। এতে করে বেসরকারি খাতে ধারাবাহিকভাবে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। প্রতি মাসেই এ হার বাড়ছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, শিল্পে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে স্থবিরতা ছিল তা কাটতে শুরু করেছে। এতে শিল্পোদ্যাক্তাদের অনেকেই বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। সার্বিকভাবে বিনিয়োগে কিছুটা গতি আসায় বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ছে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, চলতি অর্থবছরের শুরুতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে কিছুটা স্থবিরতা ছিল। তবে সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ, আমদানি-রফতানি, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ অনেকখানি বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫৪ হাজার ১৭ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাস শেষে ছিল পাঁচ লাখ ৬১ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে ৯২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে আগামী জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। বাস্তবে এ প্রবৃদ্ধির হার এর চেয়ে বেশি দাঁড়াবে। চলতি অর্থবছর ব্যাংক থেকে সরকার ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও গত ১৩ জুন পর্যন্ত উল্টো ৭ হাজার ২১৩ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এতে করে বেসরকারি খাতে চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।