বাংলাদেশের শ্রমশক্তির উন্নয়ন

শ্রমশক্তি হলো মানুষের শারীরিক ও মানসিক শক্তি যার মাধ্যমে তার একটি অর্থনৈতিক কিংবা আর্থিক প্রাপ্তি থাকবে। অবশ্য এই প্রাপ্তির মানদণ্ড হলো টাকা যার ক্ষেত্র বিশেষে যোগ্যতার মানদণ্ডে ভিন্ন হয়ে থাকে। সবাই তার শ্রম কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে রাখে যা বেঁচে থাকার জন্য অবশ্য প্রয়োজন। আমাদের দেশে বেশিরভাগ শ্রমশক্তি অদক্ষ এবং কায়িক পরিশ্রম ছাড়া অর্থের বিনিময়ে শ্রমশক্তিতে সংযোজন করা ছাড়া আর কিছুই থাকে না এবং এই শ্রেণির লোকগুলো তাদের কর্মে নিয়োজন অনায়াসেই সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু যারা শিক্ষিত তাদের কাছে বিষয়টি এতটা সহজ নয় অথচ তাদের একটা স্বপ্ন থাকে শিক্ষিত মানুষ চাকরি করবে, অর্থ উপার্জন করবে ইত্যাদি। অথচ বাস্তবতা হলো শিক্ষিতরাই বেশি বেকার যারা পছন্দের মানদণ্ডে কাজ জোগাড় করতে অক্ষম হন যা অতিসম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ-১৫ তে উঠে এসেছে। এই জরিপের ফলাফলে দেখা যায় যে, উচ্চ মাধ্যমিক পাস এ রকম লোকদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি যা মোট শ্রমশক্তির ১১.৭৫ শতাংশ এবং উচ্চ শিক্ষিতদের কিংবা অশিক্ষিতদের বেলায় এই হার যথাক্রমে ৫.৭০ ও ২.১৪ শতাংশ।
এখানে উল্লেখ্য যে, শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমানে ২৬.৩১ লাখ লোক বেকার যার মধ্যে ৮.১০ লাখ উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা স্নাতক ডিগ্রিধারী যাদের ৭৪ শতাংশের বয়স ১৫-২৯ বছরের মধ্যে অর্থাৎ যুবক শ্রেণি। আবার উচ্চ শিক্ষিতদের ৭৮ হাজার তরুণ তরুণী কাজ কিংবা চাকরি জোগাড় করতে পারছে না। তার মানে দাঁড়ায় দেশের বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে যে পরিমাণ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে জনশক্তি বের হচ্ছে সে পরিমাণ কর্মপদ সৃষ্টি হচ্ছে না কেবলমাত্র জনশক্তির পরিকল্পনার স্বল্পতার কারণে। অর্থাৎ আগামী দিনের বাংলাদেশ বিনির্মাণে কোন খাতে কত জনশক্তির প্রয়োজন হবে তার কোনো প্রকার পরিকল্পনা নেই। যার ফলে দেশে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে সত্য কিন্তু কারা এসব প্রতিষ্ঠান চালাবে বা কিভাবে চালাবে কিংবা মানসম্মত জনশক্তি এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বের হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েই যায়। তাই বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরের যে স্লোগান সরকারের রয়েছে এটি কি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নাকি সত্যিকার অর্থে এটির প্রয়োজন রয়েছে? যদি প্রয়োজন থাকে তাহলে মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা কী তা অবশ্য আলোচনার দাবি রাখে।
এখানে উল্লেখ্য যে, বিশ্ববাংকের মতে ২০১৫-২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার সাব সাহারা দেশগুলোর কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীই বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখবে। ২০১২ সালের বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬ শতাংশই ছিল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, এর বিরাট অংশই দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার সাব সাহারা দেশে। ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৯৭০ কোটি তার অর্ধেকই বাস করবে বাংলাদেশসহ আরো সাতটি দেশে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১৬-২০২০) জনশক্তি উন্নয়নে কিছু কৌশল নিয়েছে যেগুলোকে দক্ষতা উন্নয়ন কৌশল বলা হয়। কারণ তথ্য উপাত্তে দেখা যায় যে দেশের ৫.৬৭ কোটি কর্মীর মধ্যে ৪০.৮০ শতাংশের কোনো শিক্ষা নেই এবং ২৩ শতাংশের শিক্ষা মাত্র প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত আবার যদি গ্রাম শহরের বিভাজন দেখা যায় তাহলে চিত্রটি আরো আশঙ্কাজনক বলে প্রতীয়মান হয়। অপর দিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১০ সালের শ্রমশক্তি জরিপে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৩৬ শতাংশ এবং ২০১৩ সালের জরিপে তা নেমে এসেছে ৩৩.৫০ শতাংশে। তবে শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার পরও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কেন কমেছে তা নিয়ে তেমন গবেষণা পরিলক্ষিত হয় না। আবার ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসের এক জরিপের ফলাফল দেখা যায় যে, দেশের পুরুষ জনগোষ্ঠীর ৮১.৭ শতাংশ শ্রমশক্তিতে রয়েছে এবং এই চিত্রটি নারীদের মধ্যে রয়েছে ৩৩.৫ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকার প্রায় ৯৫ শতাংশ নারীই অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং নারীদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই পারিবারিক শ্রমিক যারা অবৈতনিক হিসেবে কাজ করে থাকেন। আবার শ্রমবাজারে অংশ নেয়া ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৫১ শতাংশ আবার ১৩.৯ শতাংশ স্কুলে প্রায় ৩৩ শতাংশ কখনো স্কুলে যায় না। এই ধরনের পরিসংখ্যান (যা সরকারি দপ্তর বিবিএস কর্তৃক প্রদত্ত) যদি সত্যি হয় তাহলে বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের আবার নতুন করে ভাবতে হবে শ্রমশক্তি নিয়োজনের বিষয়টি।
আমাদের আরো ভাবনার বিষয় সরকারি-বেসরকারি উৎসের উপাত্ত নিয়ে যেখানে বড় ধরনের একটি ফাঁক রয়েছে সে যাই হোক না কেন শ্রমশক্তি বৃদ্ধি বা কম হোক এর একটি সম্মানজনক নিয়োজনের (এমপ্লয়মেন্ট) ব্যবস্থা করতে হবে যার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি জড়িত। কিন্তু কিভাবে করতে হবে এটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের শ্রমশক্তির যে অংশটি অল্পশিক্ষিত যাদের সেমি স্কিল্ড অথবা আন স্কিল্ড বলা হয়, তাদের অবশ্য একটি সারভাইভাল স্কিল আছে। তা না হলে তারা বেঁচে আছে কী করে? আমাদের এই জায়গাটিকে আরো বেগবান করার জন্য স্ব-নিয়োজিত কর্মসংস্থানের অংশ হিসেবে বিনিয়োগ (ইনভেস্টমেন্ট) একটি বড় ক্ষেত্র কিন্তু এই জায়গাটিতে বেসরকারি উদ্যোগ (এন্টারপ্রাইজ) একেবারেই স্থবির আছে যা বর্তমান জিডিপির মাত্র ২৮ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে ধরা হয় এই শ্রেণির উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের কলাকৌশল সম্পর্কে এতটা ওয়াকিবহাল নন এবং কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ পাওয়া যাবে সে সব রাস্তাঘাটের সঙ্গে এতটা পরিচিত নন। আবার যারা বিনিয়োগের অর্থ সরবরাহ করবে তারা এই কাজটিতে ততটা যতœবান নয় কারণ তারা প্রো-অ্যাক্টিভ বা ওয়ার্ক অরিয়েন্টেড নন যার প্রমাণ অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন চলমান কর্মসূচির অগ্রগতি থেকে পাওয়া যায়। যেমন- বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ ব্যাংক শাখা রয়েছে গ্রাম-শহরাঞ্চল জড়িয়ে যাদের মূলত কাজ দেশের শ্রমশক্তিকে বেগবান করে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, এই জায়গাটিতেই সবচাইতে অনীহা পরিলক্ষিত হয়। আবার যারা স্কিল্ড অথবা প্রফেশসনাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বিধায় উদ্যোগে শামিল হতে চায় তারাও যে সহজ উপায়ে বিনিয়োগের আওতায় আসবে তা অনেকাংশে বলা দুষ্কর অথচ ব্যাংকগুলোতে বিশাল অঙ্কের অলস টাকা পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে যা তাদের জন্য বিশাল বোঝা। অথচ অর্থের অভাবে দেশের শ্রমশক্তি হালে পানি না পেয়ে শুকাতে বসেছে এবং এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সব ব্যাংক ব্যবস্থাপনার পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা (মনিটরিং মেকানিজম) মনে হয় ভেঙে গেছে। তা হলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানো বাষ্পাকার বাংলাদেশের সংশয় ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে যা অনেক ক্ষেত্রে সরকার মানতে নারাজ। অথচ সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল শ্রমশক্তিকে সম্পদে রূপান্তরিত করা যা এত সহজ নয়। তার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা যা আলোকিত মানুষ তৈরিতে প্রধান অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত। কারণ এই শিক্ষা এখন একটি পণ্য। কোনো সামাজিক উপাদান নয় যা ছাত্রদের অধিক মূল্যে ক্রয় করতে হয় আর ব্যাপারীর ভূমিকায় শিক্ষক। তাহলে কি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যে শ্রমশক্তি তৈরি হচ্ছে তা বাজার উপযোগী (মার্কেট ড্রাইভেন) নয়? বাংলাদেশের যে গরিব শ্রমশক্তি বাড়িঘর ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমায় এবং দেশের জন্য রেমিটেন্স পাঠায় সেই শ্রমশক্তি দেশে থেকে অনায়াসেই স্বাচ্ছন্দ্যে সেই অর্থ উপার্জন করতে পারে যদি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচিটি সফলভাবে এগিয়ে যায়।
বাংলাদেশের জলবায়ু, প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির যথা বিবেচনা করে অনায়াসেই দেশটি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা ভিয়েতনামের মতো উদ্যোক্তাবান্ধব হতে পারে যদি ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়। আমাদের দেশের অগণিত ছাত্রছাত্রী ব্যবসায় প্রশাসনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজ থেকে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর কতজন উদ্যোক্তা (এন্টারপ্রেনর) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে তার সঠিক তথ্য না থাকলেও বিষয়টি খুব আশাপ্রদ নয়। তা হলে এসব প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তির মূল গন্তব্যস্থল কিংবা ঠিকানা কোথায় তার গ্রহণযোগ্য কোনো উত্তর পাওয়া দুষ্কর। তবে এটা বলা যায় যে, বিষয়টি অস্পষ্ট এবং বেশিরভাগই ব্যবসা কিংবা শিল্প-উদ্যোক্তা হয়ে পড়েছে হয়তো অনেকটা পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে কিন্তু বেশিরভাগ জনশক্তি অনাদরে-অবহেলায় নিঃশেষিত হতে চলেছে যা দেশের জন্য একটি ব্যয়বহুল বিপর্যয়। অথচ এদের যদি সংগঠিত করা যায় তাহলে সামনে একটা অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হতে পারে। এই জায়গাটিতে অনায়াসেই প্রস্তাব করা যুক্তিসঙ্গত যে, স্বল্প সুযোগের দেশে সবটুকুকে যদি ব্যবহার করা যায় তবে অনায়াসেই একটি অর্জন আমাদের ঘরে তুলে নিতে পারব। এ ব্যাপারে সরকারি দপ্তর (বাণিজ্য, যুব উন্নয়ন, মহিলা পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, শ্রম, জনশক্তি) কী ভাবছে তা অবশ্য আলোচনার দাবি রাখে। বাংলাদেশের জন্য রেমিটেন্স অর্জনকারী দলটি কিভাবে তাদের কষ্টার্জিত অর্জন দেশের শ্রমশক্তি নিয়োজনে কাজে লাগাচ্ছে এ নিয়ে বিভিন্ন জনের ভাষ্য বিভিন্ন অর্থাৎ মোটকথা বছরে দেশে রেমিটেন্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫.৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা অর্থমন্ত্রীর মতে, গরিব মানুষের অর্জন কিন্তু এই মানুষগুলোর অর্জিত অর্থের ব্যবহারের গতিপ্রকৃতি কী কিংবা অর্থনীতিতে এর প্রভাবই বা কী এ নিয়ে সরকারের কোনো দায়দায়িত্ব আছে বলে মনে হয় না। কিছু গবেষক বলছেন এই অর্থ অপরিকল্পিতভাবে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়িত হচ্ছে বিশেষত জমি ক্রয়, বাড়ি তৈরি ইত্যাদি কিংবা কোনো শিল্পকারখানা, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রভৃতিতে ব্যয়িত হয়েছে বা হচ্ছে যেখানে একশ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে এরকম নজির খুব কম। কাজেই সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহার উন্নয়নের পূর্বশর্ত- এই ধারণাটি যদি সত্য হয় তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন, প্রশিক্ষণ, উদ্ভাব্যকরণ প্রভৃতি বিষয়গুলোর প্রতি কার্যকর নজর দেয়ার এখনই সময়। তা হলে হয়তো পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা থেকে যাবে। এই অবস্থায় আসন্ন বাজেট জনশক্তি উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি যার মাধ্যমে একাধারে জনশক্তি হবে যারা পরবর্তীতে স্ব-নিয়োজিত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজে বা অন্যকে নিয়োজনের ব্যবস্থা করবে। এই ক্ষেত্রটিতে সরকারের ভূমিকাটি হবে সহায়ক (সাপোর্টিভ) এবং দীর্ঘমেয়াদি। আবার বেসরকারি খাতের ভূমিকাটি হবে প্রো-অ্যাক্টিভ কারণ তারাই শ্রমশক্তির উন্নয়নে প্রধান নিয়ামক ও বাহক। তারপরও সরকারের জনশক্তি উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে- এই প্রত্যাশা রইল।