সংশোধিত এডিপির ৯০% বাস্তবায়ন

সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) শতভাগ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ৯০ শতাংশ। তবে দুটি মন্ত্রণালয়ের হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ দুটি মন্ত্রণালয়ের হিসাব যোগ হলে বাস্তবায়ন কিছুটা বাড়তে পারে। তার পরও সার্বিক এডিপি বাস্তবায়ন ৯১ শতাংশের বেশি হবে না। যদিও সে পর্যন্ত ১১ মাসে বাস্তবায়ন হয়েছিল সংশোধিত এডিপির ৬২ শতাংশ।
২০১৫-১৬ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য হিসাব গতকাল প্রকাশ করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এডিপি বাস্তবায়নের হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ দুটি ছাড়া বাকি ৫২টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কর্তৃক আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য হিসাব দেয়া হয়েছে। তাতে বাস্তবায়ন হয়েছে ৯০ শতাংশ। মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে বাস্তবায়ন হার ছিল ৬২ শতাংশ। পরবর্তী এক মাসেই তা ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে অর্থ ছাড়ের কারণে কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বছরে চার কিস্তিতে অর্থ ছাড়ের নিয়ম রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিবার পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু অনেক প্রকল্প সারা বছর অলস সময় পার করে অর্থবছরের শেষ মাসে চার কিস্তির অর্থ একসঙ্গে ছাড় করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। আর এডিপি বাস্তবায়ন হার বাড়ানোর জন্য যেহেতু নানা মহলের চাপ রয়েছে, তাই খুব একটা বিচার-বিশ্লেষণ না করেই অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতে টাকার অঙ্কে বাস্তবায়ন হার বাড়লেও কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
২০১৫-১৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের বিষয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, চলতি অর্থবছরে মোট এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৯০ শতাংশ। এটি প্রাথমিক হিসাব। কেননা এখনো স্বাস্থ্যসহ দুটি মন্ত্রণালয়ের হিসাব যোগ হয়নি। তবে পরিকল্পনামন্ত্রীর আশা, চূড়ান্তভাবে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়ন ৯২ শতাংশ হবে, যা গত অর্থবছরে ছিল ৯১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের পুরো সময়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ব্যয় করতে পেরেছে ৭৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছর এ ব্যয় ছিল ৭১ হাজার ১১৫ কোটি টাকা।
গত অর্থবছর সংশোধিত এডিপির ৯১ শতাংশ বা ৭১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। ওই অর্থবছরও শতভাগ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। ২০১৩-১৪ অর্থবছর সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৯৩ শতাংশ।
এডিপি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছর সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। তাদের বাস্তবায়ন শতভাগের ওপর। ৯৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মন্ত্রণালয়টি ব্যয় করেছে ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এ হিসাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়নের হার ১২১ শতাংশ। ১১৮ শতাংশ ব্যয় করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। ৩ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মন্ত্রণালয়টি ব্যয় করেছে ৪ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
সার্বিক এডিপি বাস্তবায়নের হার নির্ভর করে মূলত বড় ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাস্তবায়নের ওপর। এ ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুকূলে বরাদ্দ রয়েছে মোট এডিপির ৭০ শতাংশের বেশি। সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া স্থানীয় সরকার বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে ৯৫ শতাংশ। ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিভাগটি ব্যয় করতে পেরেছে ১৫ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া বিদ্যুত্ বিভাগের এডিপি বাস্তবায়নের হার ৯৬ শতাংশ। ১৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিভাগটি ব্যয় করেছে ১৪ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা। আর বেশি বরাদ্দ পাওয়া বিভাগগুলোর আরেকটি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। চলতি অর্থবছর বিভাগটির অনুকূলে বরাদ্দের পরিমাণ ৬ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। বরাদ্দের শতভাগই ব্যয় করেছে তারা। শতভাগ এডিপি বাস্তবায়নের তালিকায় রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।
৯৯ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে ছয়টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এগুলো হচ্ছে— মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ধর্ম-বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণলায় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ৯৮ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে তিনটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এগুলো হলো— বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। সংশোধিত এডিপির ৯৭ শতাংশ বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, বস্ত্র ও পাট, পররাষ্ট্র এবং আইএমইডি। ৯৬ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিদ্যুত্ বিভাগ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ৯৩ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জ্বালানি ও খণিজ সম্পদ বিভাগ। সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়নের হার ৯২ শতাংশ। এছাড়া মহিলা ও শিশু-বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৯১ শতাংশ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ৯০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে।
অর্থবছরের শুরুতে বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নসহ এডিপির আকার ধরা হয় ১ লাখ ৯৯৭ কোটি টাকা। নিজস্ব অর্থায়ন বাদে মূল এডিপির আকার ছিল ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাকিটা ছিল সরকারের তহবিল। আর বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা। গত এপ্রিলে এডিপি সংশোধন করে ৯১ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর বাইরে বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা।