কর্মমুখর রংপুরের বেনারসি পল্লী

খট্ খট্ শব্দ করে অবিরত চলছে তাঁত। দম ফেলানের ফুরসত নেই কারিগরদের। পবিত্র ঈদুল ফিতর যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে কারিগরদের ব্যস্ততা। তেমনি বেড়েছে ক্রেতাদের পদচারণা। সবমিলিয়ে সেখানে বিরাজ করছে উত্সবের আমেজ। তাঁতিদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। তবে শাড়িসহ উত্পাদিত কাপড় প্রসেসিং এবং কাটিং স্থানীয়ভাবে করার ব্যবস্থা না থাকায় সময়মতো তা সরবরাহ করতে পারবে কিনা এনিয়ে শংকায় তাঁত মালিকরা। সরেজমিনে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তালুকহাবু এলাকার বেনারসি পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে এই চিত্র। বর্তমানে বেনারসি পল্লীতেই বিক্রি হচ্ছে সেখানকার তৈরি শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি। বিভিন্নস্থান থেকে লোকজন গিয়ে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজের কাপড় ক্রয় করছেন। ঈদ উপলক্ষে সেখানে বেড়ে গেছে ক্রেতাদের ভিড়।

 

ফাইয়াজ বেনারসির স্বত্বাধিকারী ফরিদা রহমানের সাথে কথা হলে তিনি জানান, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ক্রেতাদের পদচারণা বেড়ে গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা এসে স্বল্প দামে শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি ক্রয় করছেন। ঈদ উপলক্ষে তিনি দিনে দেড় লাখ থেকে ২ লাখ টাকার বেনারসি শাড়ি বিক্রি করছেন। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই ক্রেতাদের পদচারণা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, বেনারসি শাড়িসহ উত্পাদিত কাপড় প্রসেসিং ও কাটিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় ক্রেতাদের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সঠিক সময়ে তা সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান তার কারখানায় ৩০ জন কারিগরসহ ৮২ জন কাজ করে। তিনি বলেন, বেনারসি পল্লীর উত্পাদিত শাড়ি, থ্রি-পিস ও ও পাঞ্জাবি দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমেরিকা, ইরান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

 

বেনারসি পল্লীতে কাপড় কিনতে আসা পীরগাছা বিএম কলেজের প্রভাষক শাম্মী আক্তার, তামান্না নাসরিন, শাকিলা জান্নাত ও ঢাকা থেকে আসা সারা সুলতানাসহ অনেকেই জানান, হাবু গ্রামে বেনারসি পল্লীর উত্পাদিত কাপড় অনেক মানসম্মত এবং টেকসই। বেশ কয়েক বছর ধরে এখানকার কাপড় নিজেরা ব্যবহার করছি, আত্মীয়-স্বজনকে বিভিন্ন উত্সবে উপহার দিচ্ছি। বেনারসি পল্লীতে তৈরি শাড়ি, থ্রি-পিচ ও পাঞ্জাবির দাম মার্কেটের চেয়ে অনেক কম।

 

বেনারসি পল্লীর কারিগর লুত্ফার, হামিদুল, আনোয়ারুল, মিঠুন, আশরাফুল, ফেরদৌস, হাসু মিয়া, স্বপন, বাদল, ছাহেরা বেগম, আঙ্গুরা বেগম, জরিনা, ফুলজান, ছালেহা, জমিলা, নুরুন্নাহার, মোসলেমা, কুলসুম জানান, একটি শাড়ি তৈরি করে পাওয়া যায় ৮শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা। থ্রি-পিসে পান ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকা এবং পাঞ্জাবিতে পান ৫শ’ থেকে ৮শ’ টাকা। তাদের অভিযোগ, ঈদ উপলক্ষে আমাদেরকে দেওয়া হয় না কোনো উত্সব ভাতা, বাড়ানো হয় না মজুরি।

 

তাঁত মালিক ও শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি তৈরিতে ব্যতিব্যস্ত তাঁতীরা। যন্ত্রের মতো তারা একনাগারে কাজ করেই চলেছে। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে এবং রাতের ঘুম হারাম করে তারা ব্যস্ত সারাদেশের ঈদের বাজারে বেনারসি সরবরাহ করতে। বর্তমানে বেনারশি কাতান শাড়ি বিক্রি হচ্ছে ১৮শ’ থেকে ৭ হাজার টাকায়, জুট কাতান বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকায়, বিয়ের শাড়ি বিক্রি হচ্ছে ১৩ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। উত্পাদিত শাড়ি রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ নাম। এগুলো হচ্ছে: বেনারশি, বারবুটা, কুচিকাট, ফুলকলি প্রভৃতি। এবার ঈদে জুট কাতানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। জুট কাতানের থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায়। কাতানের থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে ১৫শ’ থেকে ২২শ’ টাকায়। পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে ১২শ’ থেকে ২২শ’ টাকায়।

 

মঙ্গাকবলিত রংপুরের গঙ্গাচড়ায় উপজেলার গজঘন্টা ইউনিয়নের তালুক হাবু গ্রামসহ আশপাশের আরো ৪/৫টি গ্রামে গড়ে উঠেছে তাঁতিপাড়া বা বেনারসি পল্লী। এখানকার তাঁত শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রহমান। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি এবং স্বাবলম্বী হওয়ার বাসনায় কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় আসে আব্দুর রহমানের। বেনারসি শাড়ি তৈরিকে বেছে নেয় জীবন-জীবিকার উপায় হিসেবে। ভারত, পাকিস্তান ও ইরান থেকে বেনারসির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন। এরপরে ১৯৯৭ সালে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরাতন তাঁত কিনে যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে তার ৪০টি তাঁত। আব্দুর রহমানের দেখাদেখি প্রতিবেশীরাও ঝুঁকে পড়েন এ শিল্পে। দেখতে দেখতে প্রসার ঘটে। হাবু গ্রামের প্রায় সবাই এখন তাঁতি। আশপাশের ৪/৫টি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছিল এই শিল্পটি। কিন্তু বর্তমানে উত্পাদিত কাপড়ের বাজার গড়ে না ওঠা, শ্রমিক সংকট, স্থানীয়ভাবে সুতা না পাওয়া এবং প্রসেসিং ও কাটিং মেশিন না থাকাসহ নানা সমস্যায় হয়ে কমে গেছে। নিশাত বেনারসির স্বত্বাধিকারী আব্দুল কুদ্দুস জানান, কয়েক বছর থেকে স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন উত্সবে বেনারসি পল্লীর কাপড় বিক্রি বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। কিন্তু স্থানীয় বাজারে সুতা পাওয়া যায় না, আনতে হয় ঢাকার মিরপুর থেকে। এসব কারণে দাম বৃদ্ধি পায়।