না’গঞ্জের সম্ভাবনাময় জাহাজ নির্মাণ শিল্প

১০০ কারখানায় কাজ করছে ৫০ লাখ শ্রমিক

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা, বালু ও মেঘনা নদীর তীরে শ’খানেক  ছোট-বড় ডকইয়ার্ড বা জাহাজ নির্মাণ কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে শীতলক্ষ্যার তীরেই রয়েছে ৭০টির মতো ডকইয়ার্ড। এসব ডকইয়ার্ডে অর্ধলক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। কোন ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই শীতলক্ষ্যার তীরে সম্ভাবনাময় এ শিল্পের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। সরকার একটু নজর দিলেই ডকইয়ার্ড বা জাহাজ নির্মাণ শিল্পে আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন এ শিল্পের সঙ্গে যুক্তরা।

 

শীতলক্ষ্যা নদীর কাঁচপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দরের কলাগাছিয়া ইউনিয়নের মোহনপুর পর্যন্ত নদীর পূর্ব পাশে এসব ডকইয়ার্ডের অস্তিত্ব নজরে আসবে। দেখা যাবে নদীর তীরে এসব ডকইয়ার্ডে বড় বড় জাহাজ নির্মাণ অথবা মেরামত হচ্ছে। নদীর পাশ দিয়ে যাবার সময় এসব ডকইয়ার্ড থেকে ‘খটখট’, ‘টুং টাং’ শব্দ ভেসে আসবে।

 

কি ধরনের নৌযান তৈরি হয়

 

শীতলক্ষ্যা নদী বন্দরের লেজারার্স এলাকায় অবস্থিত বন্দর ডকইয়ার্ডের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম বাসু বলেন, এসব ডকইয়ার্ডে লাইটারেজ জাহাজ, তেল পরিবহনের জন্য ট্যাঙ্কার, বালু পরিবহনের জন্য বাল্কহেড, ওয়াটার বাস এবং পন্টুুনসহ যে কোন ধরনের জাহাজ তৈরি সম্ভব। ওয়াটার বাস সর্বোচ্চ ৪৫ ফুট, লাইটারেজ জাহাজ ২৪৫ ফুট, বাল্কহেড ১৩০-১৫০ ফুট এবং পন্টুন ৪৫ থেকে ১২০ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। এর মধ্যে লাইটারেজ জাহাজ ৮শ’ টন এবং বাল্কহেড ১৭০-২৫০ টন পর্যন্ত ওজনের হয়ে থাকে।

 

বাসু বলেন, যে কোন জাহাজ তৈরি বা মেরামত করা হয় টন হিসেবে। জাহাজ তৈরির ক্ষেত্রে বাজার দর অনুযায়ী ৩০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা টন দাম রাখা হয়। আর মেরামতের জন্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। একটি লাইটারেজ জাহাজ তৈরিতে ৬ থেকে ৮ মাস, ট্যাঙ্কার ৮ মাস থেকে ১ বছর, বাল্কহেড ৪ থেকে ৫ মাস এবং পল্টুন ২ মাসের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব। যাত্রী পরিবহনের জন্য সরকার প্রথম যে দু’টি ওয়াটার বাস তৈরি করেছিল তা শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত থ্রি এঙ্গেল ডকইয়ার্ডে তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।

 

 যে কোন ধরনের জাহাজ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে বিআইডব্লিউটিএ’র ডিজি শিপিং থেকে নকশার অনুমোদন নিতে হয়। এরপর অনুমোদিত ডকইয়ার্ডের মাধ্যেমে (যাদের এনওসি আছে) জাহাজটি তৈরি করা হয়। আগে দুবাই, ডেনমার্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাইটারেজ জাহাজসহ নৌযানগুলো তৈরি করে আনা হতো। এতে দেশে বর্তমানে যে খরচ হয় তার চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি খরচ পড়তো। কিন্তু বেসরকারি এসব ডকইয়ার্ডের কারণে এখন অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে এদেশেই এসব নৌযান তৈরি সম্ভব হচ্ছে। তবে এখন দেশে যে কোন ধরনের নৌযান নির্মাণের জন্য সরকার কোন নকশার অনুমোদন দিচ্ছে না। যে কারণে এখন ডকইয়ার্ডগুলোতে নতুন জাহাজ নির্মাণের পরিবর্তে মেরামতের কাজ বেশি হচ্ছে। আর দেশে যে পরিমাণ নৌযান রয়েছে সেগুলো মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত ডকইয়ার্ড না থাকলে নৌযানের মালিকেরা সমস্যায় পড়তেন। তাই সম্ভাবনাময় এ শিল্পে এখন অনেক নতুনরাও এগিয়ে আসছেন এবং নতুন নতুন ডকইয়ার্ড গড়ে তুলছেন।

 

বাসু বলেন, তার ডকইয়ার্ডে কাজ থাকলে এক হাজার পর্যন্ত শ্রমিক কাজ করে। স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ১৫০। বাকিরা অনিয়মিত।  আর কাজ বেশি হলে আরো বেশি সংখ্যক শ্রমিক কাজ করে। স্থায়ী শ্রমিকদের বেতন মাসে ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। আর অনিয়মিত শ্রমিকদের দৈনিক ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেয়া হয়।

 

যেভাবে ডকইয়ার্ড গড়ে ওঠে

 

বিআইডব্লিউটিএ এবং শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ডকইয়ার্ডের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর তীর বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এক বছর মেয়াদী (একসনা) লিজ নিয়ে একটি ডকইয়ার্ড গড়ে তোলা হয়। এক্ষেত্রে প্রতি শতাংশ জমির জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ জমার দেবার পাশাপাশি একটি স্লিপার (জাহাজ টেনে তোলার জন্য রেল লাইনের মতো করে তৈরি) তৈরির জন্য প্রতি ফুট হিসেবে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষকে অর্থ প্রদান করতে হয়। ভালভাবে একটি স্লিপার তৈরিতে কোটি টাকার মতো খরচ হয়। এছাড়া পরিবেশ অধিদফতর থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। প্রতি বছর পরিবেশ অধিদফতরকে রিনিউ ফি হিসেবে ৩৫ হাজার টাকা, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের বার্ষিক ফি ৭০ হাজার টাকার পাশাপাশি ডিজি শিপিংকে প্রতি বছর ফি হিসেবে ১০ হাজার টাকা এবং প্রতিমাসে শতকরা ৪ ভাগ ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। তবে এত কিছুর পরেও ডকইয়ার্ড মালিকরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন না। কারণ নদীর সীমানা সনাক্তের জন্য প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। অথচ ডকইয়ার্ড মালিকরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বৈধভাবে অনুমতি নিয়ে ডকইয়ার্ড তৈরি করে। বিদ্যুতের সংযোগ পেলেও মিটার এবং ট্রান্সফরমার নিজস্ব অর্থায়নে বসিয়ে নিতে হয় মালিকদের।

 

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ডকইয়ার্ড

 

শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা ডকইয়ার্ডগুলোর মধ্যে বন্দরের সোনাকান্দায় অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ওয়ার্কার্স অন্যতম। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালনা করছে। এ ডকইয়ার্ডে নৌবাহিনীর জন্য বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড, বন্দর ডকইয়ার্ড, সৈয়দ ডকইয়ার্ড, খন্দকার ডকইয়ার্ড, খান ডকইয়ার্ড, সাওঘাট ডকইয়ার্ড, একরামপুর ডকইয়ার্ড, শাহ আলম ডকইয়ার্ড, জামান ডকইয়ার্ড। অপরদিকে রূপগঞ্জে বালু নদীর তীরে মাস্টার ডকইয়ার্ড, খান ডকইয়ার্ড, ফাহিম ডকইয়ার্ড, শামস ডকইয়ার্ড, তালহা ডকইয়ার্ড, আমির ডকইয়ার্ড, মালেক ডকইয়ার্ড, ফটিক ডকইয়ার্ড, ভাই ভাই ডকইয়ার্ড, মনির ডকইয়ার্ড, মাসটাং ইঞ্জিনিয়ারিং কায়েতপাড়ার জাহাজ কারখানাগুলোর মধ্যে অন্যতম। শীতলক্ষ্যার তীরে ৭০টির পাশাপাশি রূপগঞ্জে বালু নদীর তীরেও ১৫-২০টির মতো ডকইয়ার্ড রয়েছে। এগুলোর বাইরে মেঘনা নদীর তীরে আনন্দ ও মেঘনা শিপইয়ার্ড রয়েছে। আনন্দ শিপইয়ার্ড ইতোমধ্যেই বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে জাহাজ রফতানি করে সুনাম কুঁড়িয়েছে। আর মেঘনা শিপইয়ার্ডে মেঘনা গ্রুপের কাঁচামাল পরিবহনের জন্য লাইটারেজ জাহাজ তৈরি এবং মেরামত করা হয়। এছাড়া খান নামে অপর একটি ডকইয়ার্ড সোনারগাঁয়ের পিরোজপুরে অবস্থিত।

 

সরকারের কাছে দাবি

 

নিট গার্মেন্টের পর ডকইয়ার্ড শিল্পে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হতে পারে দাবি করে বেশ কয়েকজন ডকইয়ার্ড মালিক বলেছেন, এ শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এর জন্য পৃথক কোনো ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নেই। ব্যক্তিগতভাবে ১৬-১৮ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কাজ করলে ঋণ পরিশোধের পর তেমন লাভ পাওয়া যায় না। তাই তারা এ শিল্পের জন্য ওয়ান ডিজিট সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তাছাড়া হয়রানিরোধে দেশের কোনো একটি নদীর তীরে এ শিল্পের স্থায়ী ব্যবস্থা করারও দাবি জানান তারা। তবে ডকইয়ার্ড মালিকদের কোনো সমিতি বা সংগঠন না থাকায় তারা   জোরালোভাবে তাদের বক্তব্য বা দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরতে পারছেন না।