অবশেষে রূপ পাচ্ছে পৃথক বাস লেন

গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে বিমানবন্দর সড়ক মানেই নিত্য যানজটে আটকে থাকা। ভাগ্য সহায় না হলে চার ঘণ্টা সময় লাগে ঢাকায় পেঁৗছতে। যদিও গাড়িতে এ পথ মাত্র ৪০ মিনিটে পাড়ি দেওয়া সম্ভব। তবে তা নির্বিঘ্ন ও বাস্তবায়ন করতে হলে পৃথক বাস লেন বা ‘বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট’ (বিআরটি) স্থাপন জরুরি। এক যুগ আটকে থাকলেও অবশেষে শুরু হচ্ছে পৃথক বাস লেন নির্মাণের কাজ। আজ রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিআরটির অবকাঠামো নির্মাণকাজের উদ্বোধন করবেন।

ঢাকা মহানগরের যানজট নিরসনে ২০০৪ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছিল। এসটিপির প্রথম পর্যায় (২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল) বিআরটির পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা ছিল মহাপরিকল্পানায়; কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ২০১২ সালের ২০ নভেম্বর একনেকে অনুমোদন পায় বিআরটি। বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন না করেই ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর বিআরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তারও প্রায় তিন বছর পর শুরু হতে যাচ্ছে নির্মাণকাজ।

প্রকল্প পরিচালক একিউএম একরামুল্লাহ বলেন, অর্থছাড়ের হিসাবে প্রকল্পটি খুব বেশি না এগোলেও, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর গাজীপুরে বিআরটি ডিপো নির্মাণের কাজ শুরু হবে। প্রকল্পে বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সংশোধিত খসড়া অনুযায়ী, জয়দেবপুর থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার বাসের জন্য পৃথক বিআরটি-৩ নির্মাণ করা হবে। পূর্বাঞ্চল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি-৭ নির্মাণ করা হবে। ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

প্রথম পর্যায়ে জয়দেবপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথে বিআরটি বাস্তবায়ন করা হবে। এতে ব্যয় হবে দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা। চার দশমিক পাঁচ কিলোমিটার চার লেনের উড়াল বাস লেন (এলিভেটেড বাস লেন), আট লেনের টঙ্গী সেতু, বিভিন্ন ইন্টারসেকশনে ছয়টি ফ্লাইওভার নির্মিত হবে। অন্যান্য স্থানে সড়ক প্রশস্ত করা হবে। এ ছাড়া নির্মাণ করা হবে

গাজীপুর ও বিমানবন্দরে দুটি বাস টার্মিনাল, ১৪১টি সংযোগ সড়ক উন্নয়ন, ২০ কিলোমিটার ড্রেন। বিআরটির কারণে পথের দুই ধারে সেসব ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ করা হবে, তাদের পুনর্বাসনে আটটি বাজার নির্মাণ করা হবে।

যানজট নিরসনে সারাবিশ্বে সবচেয়ে সফল হলো বিআরটি। ভারতের গুজরাট, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, ব্রাজিলের রিওসহ একাধিক শহরে বিআরটি আছে। এ পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত গাড়ি বা প্রাইভেট কার সুবিধা পায় না। বিআরটির সুবিধা ভোগ করেন বাসযাত্রীরা। অর্থাৎ গণপরিবহনের যাত্রীরা এর মাধ্যমে উপকার পাবেন।

গণপরিবহন অবকাঠামো নির্মাণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামছুল হক অভিন্ন মত প্রকাশ করে বলেন, অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নে হাজার হাজার কোটি টাকা লাগে। অথচ বিআরটি সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল। তিনি জানান, এ পদ্ধতিতে বাসকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিদ্যমান রাস্তার মাঝ বরাবর ডিভাইডারের দুই পাশে বাসের জন্য আলাদা লেন করা হবে। এ লেন রাস্তার অন্য অংশ থেকে আলাদা করা হবে দেয়াল তুলে। বাসের লেনে অন্য কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। ফলে বাস বিনা বাধায় চলবে। মোড়গুলোতেও বাস প্রাধান্য পাবে। তবে জয়দেবপুর-বিমানবন্দর বিআরটিতে মোড়গুলোয় ফ্লাইওভার নির্মাণ করায় বাস এমনিতেই বাধাগ্রস্ত হবে না। বিনা বাধায় ২০ কিলোমিটার পথ বাস চলতে পারবে। নির্দিষ্ট ২৫টি স্টপেজে বাস থামবে। সেখান থেকে যাত্রীরা বাসে উঠবেন।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটির ১৬ কিলোমিটার হবে বিদ্যমান সড়কে। এ কাজ করবে সওজ। উত্তরার হাউস বিল্ডিং থেকে টঙ্গীর চেরাগ আলী পর্যন্ত বিদ্যমান সড়ক সরু হওয়ায় সেখানে সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড বাস লেন নির্মাণ করা হবে। বিদ্যমান টঙ্গী সেতু পুনর্নির্মাণ করে আট লেনে উন্নীত করা হবে। এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। রাস্তার পাশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ করবে এলজিইডি।