বিদেশীদের আগ্রহ বাড়ছে চাঁপাইয়ের আমে

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার আম সাম্রাজ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা রফতানি পণ্যের তালিকায় উঠে আসার এক মাসের মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আম ব্যবসায়ীরা খুবই আগ্রহী হয়ে উঠেছে এখানকার আম তাদের দেশে নিয়ে যাবার ব্যাপারে। যদিও ইতোপূর্বে এ বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দুই হাজার টন আম রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা এখন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণের বেশি, পাঁচ হাজার টনে উন্নীত হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিশ্চিত করেছে। জুনের প্রথম সপ্তাহে ও মধুমাস জ্যৈষ্ঠের তৃতীয় সপ্তাহে তিনটি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রথম চালান ৮৫ টাকা কেজি দরে তিন (৩) টনের কাছাকাছি আম ইউরোপের দেশসমূহে পাঠানোর মধ্য দিয়ে এক ধরনের কর্মচাঞ্চল্যতা দেখা দেয় স্থানীয় আম ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকদের মধ্যে। একই ভাবে দ্বিতীয় চালান পাঠাবার প্রস্তুতি নিয়ে এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ছয় টন আম পাঠানো হয় ইংল্যান্ডে।

লি এন্টারপ্রাইজ, কেটিএস এন্টারপ্রাইজ ও মরিশন এন্টারপ্রাইজ অতি দক্ষতার সঙ্গে প্যাকেটজাত করে জার্মানি ও ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে। প্রথম চালানে এখানকার ক্ষিরসা পাতের (হিম সাগর) আধিক্য অধিক পরিমাণে থাকলেও দ্বিতীয় চালানে পাঠানো হয়েছে খুবই উৎকৃষ্ট মানের ল্যাংড়া। এর মধ্যে গাজীপুর ল্যাংড়াও রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম প্রথম ও দ্বিতীয়বার উন্নত মোড়ক জারের মাধ্যমে রফতানির জন্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্ব বাজারে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশের বাজারে আম রফতানি করলেও এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দী হিসাবে পাশে মিলেছে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে শিবগঞ্জ অঞ্চরের আম বিদেশের বাজারে অতি আধুনিক প্রতিযোগিতায় স্থান করে নেবার পর বিদেশীদের নজর পড়েছে চাঁপাইয়ের ভোলাহাট অঞ্চলের প্রতি। কারণ ভোলাহাট ভারতের শ্রেষ্ঠ আম উৎপাদনকারী এলাকা মালদহের একেবারে কাছাকাছি। মালদহ সদর, ইংরেজ বাজারসহ তাদের ৮টি বড় ধরনের আম উৎপাদনকারী এলাকা হতে ভোলাহাটের দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রেই ঢিল ছোড়া দূরত্বসহ প্রায় ৩৫ মিনিটের পথ। তাই বিদেশের আম ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই টার্গেট করেছে ভারতীয় আম বাজারকে টেক্কা দিতে ভোলাহাটের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা। কারণ ভোলাহাটের আম ভারতীয় উৎপাদিত আমের সমকক্ষ। তাই বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের আম পৌঁছা মাত্র টার্গেট করে ভোলাহাটের আম নিয়ে যাবে। দামেও কম ও মানের দিক দিয়েও সমকক্ষ হবার কারণে এবার বিদেশী আম ব্যবসায়ীদের নজর পড়েছে ভোলাহাটের ওপর। বিদেশীরা কৌশল হিসাবে প্রথম চটে বেছে নেন ভোলাহাটে একটি সেমিনার করার। এই অঞ্চলের সব চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তড়িঘড়ি আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি করে নিয়ে আসেন ইউনিভার্সিটি অব ফিলি পাইন লসরেনোমের প্রফেসর এন্তাকে। জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কৃষি বিজ্ঞানী কৃষিবিদ, ফাও প্রতিনিধি ড. সামিম আহম্মেদ চৌধুরী, ড. জিল্লুর রহমানসহ শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সেমিনার করে বিভিন্ন উপকরণ তুলে দেন ১৩ আম চাষী ও ১০ জন আম ব্যবসায়ীর হাতে। এসব উপকরণের মধ্যে রয়েছে গরম পানিতে আম শোধন মেশিন (হটওয়ার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট), ১০টি আম পাড়ার ঠুসি, ২০টি ক্যারেট ও বাগান থেকে আম পরিবহনের জন্য ১টি ভ্যান প্রদান করা হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আম উৎপাদন, আম পাড়া, গরম পানিতে আম শোধন এবং সঠিক পদ্ধতিতে পরিবহনের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভোলাহাট থেকে বিদেশে আম রফতানির লক্ষ্যে ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনকে এসব উপকরণ দেয়া হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আঞ্চলিক অফিস এশিয়া এন্ড দি প্যাসিফিকের যৌথ উদ্যোগে এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

একজন বিশেষজ্ঞ কৃষিবিজ্ঞানী জনকণ্ঠকে জানান বর্তমানে যে ভাবে গাছ থেকে আম নামানো হয়ে থাকে তাতে ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ আম নষ্ট হয়ে যায় এবং পরিবহনের ক্ষেত্রেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সাধারণভাবে সংগৃহীত আমের গায়ে ময়লাও আমের রস লেগে থাকে। যা রফতানির ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। কিন্তু গাছ থেকে মেশিনের দ্বারা আম পেড়ে ঠিকমত সংগ্রহের মাধ্যমে শোধন করা হলে বিদেশে আগ্রহ বাড়বে এ দেশের আম গ্রহণ ও বাণিজ্যে। ইতোমধ্যেই বিদেশী সংস্থা ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ রক্ষা করা শুরু করেছে এসব প্রতিষ্ঠান। এসব বিদেশী সংস্থা আম চাষ থেকে শুরু করে পরিপক্ব আম বিদেশে রফতানি উপযোগী করতে সব ধরনের কলাকৌশল হাতে নাতে শিক্ষা দিবে। এখানে উল্লেখ্য যে ইতোমধ্যেই ভোলাহাটের ফজলি, আশ্বিনাসহ প্রায় ১১টি জাত এবারই বিদেশের বাজারে স্থান বা রফতানি হবে বলে জানা গেছে। যা চলবে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত।