সরকারের জঙ্গিবিরোধী উদ্যোগে আস্থা দিল্লির

উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের কঠোর অবস্থানে ভারতের আস্থা রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গতকাল রবিবার নয়াদিল্লিতে বার্ষিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা ও হুমকির বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, বাংলাদেশে সহিংসতা দুর্ভাগ্যজনক। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এক লাখ ইমামের ফতোয়ার প্রশংসা করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ চুক্তির জন্য ভারতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় ভারত উদ্বিগ্ন। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব ড. এস জয়শঙ্কর গত মাসে তাঁর সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে এ দেশের সরকারের প্রতি তাঁদের আস্থার কথা জানিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের সেই আস্থা অটুট রয়েছে। বিশেষ করে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার কারণে ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়াপ্রত্যাশী মহলের বিষয়েও নয়াদিল্লি অবগত। বিশেষ করে, ভারতীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটি মহল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বা হুমকি দিচ্ছে এমন আশঙ্কাও রয়েছে কূটনৈতিক মহলে।

নয়াদিল্লিতে গতকাল সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ ইস্যুতে সাংবাদিকরা এ দেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের একের পর এক হামলা, রামকৃষ্ণ মিশনে হামলার হুমকি, উদ্বেগ জানিয়ে রামকৃষ্ণ মিশন থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে চিঠি পাঠানোর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া জানতে চান।

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন, ‘এসব হামলা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও আমাদের জন্য কষ্টদায়ক। উচ্চপর্যায়ে আমি এ বিষয়ে কথা বলেছি। এ কথা বলা জরুরি যে বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিন হাজারেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শেখ হাসিনা অনেক কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য খুশির খবর হলো বাংলাদেশের ইসলামী ধর্মগুরুরা ফতোয়া জারি করেছেন যে ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ অনৈসলামিক কাজ। এক লাখ ধর্মগুরু এতে স্বাক্ষর করেছেন।’

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে সুষমা স্বরাজ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল সীমান্ত চুক্তি (এলবিএ) বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এখনো হয়নি। তিস্তা চুক্তির তিনটি অংশীদার—ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্যের পর তিস্তা চুক্তি হবে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুনর্নির্বাচিত হয়ে আবারও সরকার গঠনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সবাই ভালো সম্পর্ক চায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এবার শপথ নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

সুষমা স্বরাজ বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিস্তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যে পৌঁছার আজ সঠিক সময় এসেছে।’

প্রতিবেশী দেশগুলোতে নিপীড়িত হিন্দুদের শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় দেওয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে সুষমা স্বরাজ বলেন, তারা যে নীতি প্রণয়ন করেছেন সেখানে কেবল সংখ্যালঘু হিন্দু নয়, নিপীড়িত বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ভারতের মোদি সরকারের ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতির বাস্তবায়ন এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) অকার্যকর হয়ে পড়েছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন, প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অগ্রগতি হয়েছে। তিনি এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে স্থল সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন, পালাটানা থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদাহরণ দেন।

রামকৃষ্ণ মিশনের নিরাপত্তায় ভারতীয় দূতের সন্তোষ : বাংলানিউজ জানায়, রামকৃষ্ণ মিশনের নিরাপত্তায় সরকারের উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। তিনি বলেছেন, সম্প্রতি রামকৃষ্ণ মিশনে ধর্মগুরুকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পরপরই সরকার যে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট এবং কৃতজ্ঞ। গতকাল দুপুরে ঢাকার গোপীবাগে রামকৃষ্ণ মিশন পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রামকৃষ্ণ মিশনের শীর্ষস্থানীয় ধর্মগুরুরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশ চাইলে ভারত সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এ ছাড়া ধর্মীয় উগ্রবাদ মোকাবিলায় ভারত বাংলাদেশের পাশে থাকবে।

রামকৃষ্ণ মিশনের নিরাপত্তায় সরকারের উদ্যোগ দেখে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘এখানকার কর্তৃপক্ষ কেবল ঢাকায় রামকৃষ্ণ মিশন নয়, বাংলাদেশের ৪০টি মিশনেও নিরাপত্তা দিতে সক্ষম। এ বিষয়ে আমরা বাংলাদেশের প্রতি আস্থা রাখি।’ তিনি বলেন, হুমকির পর থেকে বাংলাদেশ সরকার ও রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশন সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।