তিস্তাপাড়ের মেরিনা এখন স্বাবলম্বী

ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের ৪নং ব্লকের মেম্বার পাড়াগ্রামের গৃহবধূ মেরিনা। একটি গাভী প্রতিপালন করে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ লিটার দুধ বিক্রি করছেন। এতে প্রতিদিন আয় হচ্ছে দু’শ থেকে চারশ’ টাকা। নিজের পরিবারের সদস্যদের পুষ্টির চাহিদা মিটিয়েও সংসারের আর্থিক যোগান হচ্ছে। এই অর্থ থেকে দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ চলে। এরপরও দুই বছরের মধ্যে ৫০ হাজার টাকায় এক বিঘা জমি বন্ধক নিয়েছেন চাষাবাদ করার জন্য। এভাবেই গাভী প্রতিপালন করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন মেরিনা।

মেরিনা বাল্যবিয়ের শিকার। তিনি যখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাবা-মা ১৯৯০ সালে তাকে বিয়ে দেন। বাল্যবিয়ে হওয়ায় তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বিয়ের সময় স্বামীর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু সর্বনাশা তিস্তার ভাঙ্গনে চার বছরেই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। অভাব-অনটনে সংসারে প্রতিনিয়ত ঝগড়া-বিবাদ, অশান্তি শুরু হয়। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে পৃথক করে দেয়। মেরিনার কোলজুড়ে আসে এক পুত্রসন্তান। স্বামীর একার আয়ে সংসার চলে না। এরপর তার কোলজুড়ে আসে আরও দুই সন্তান। স্বামীর একার আয়ে পাঁচজন মানুষের খরচ চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্বামীকে সংসারে আর্থিক সহযোগিতার জন্য নিজেই কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেন।

এ প্রসঙ্গে মেরিনা বলেন, স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজতে থাকি। প্রথমে পল্লীশ্রী ঘাতসহনশীল কমিউনিটি গঠনের কাজ শুরু করলাম। এই কমিউনিটির প্রত্যেকটি পরিবারের দরিদ্রতা দূর করার লক্ষ্যে তাদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ, পছন্দমতো খাবার গ্রহণ করতে পারে এ জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে স্থানীয় জনসংগঠন তৈরি করি। নিয়মিত সভায় অংশ নিই। সভায় বিভিন্ন বিষয় আলোচনা এবং বাজার সম্প্রসারণ পরিকল্পনার মাধ্যমে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজে নিই। আমি সংগঠনের দুধ উৎপাদক দলের সদস্য হওয়ায় প্রকল্পের গাভীপালন ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নিই। এই প্রশিক্ষণ গ্রহণে গাভীপালনের আধুনিক কলা-কৌশলগুলো সম্পর্কে ধারণা হয়। এর পরই আমি একটি উন্নতজাতের গাভীপালনের স্বপ্ন দেখি। আমার স্বপ্নের কথা সিবিওর সভায় তুলে ধরি। পল্লীশ্রী রিকল প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৪ সালে সিবিওর হতদরিদ্র সদস্য হিসেবে আমাকে একটি উন্নত জাতের গাভী প্রদান করা হয়। গাভী পাওয়ার সাত দিনের মাথায় একটি বকনা বাছুর হয়। এতেই ঘুরে দাঁড়াই আমি। এভাবেই মেরিনা নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেন নিজের চেষ্টায়। তার ভাগ্য পরিবর্তনের এলাকার অন্য নারীরা তার কাছে আসেন পরামর্শ নিতে। মেরিনার গল্প শুনে তাদের নিজেদের জীবনের পরিবর্তন করতে চান। তিনি এসব নারীদের আয় করার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।

পল্লীশ্রী রিকল প্রকল্পের সমন্বয়কারী পুরানচন্দ্র বর্মণ বলেন, স্থায়িত্বশীল আয়ের পথ সৃষ্টি করা গেলেই পরিবারের দরিদ্রতা কমে আসবে। তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম হবে। এ জন্য প্রয়োজন জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, গাভীর খাবার নিশ্চিত করা, বাসস্থান উন্নয়ন, উন্নত জাতের ঘাস চাষ, নারী-পুরুষের কাজের সমন্বয়সাধন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজারের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন, জাত উন্নয়ন, বিদেশী জাতের গাভী পালন, দানাদার খাবারের ব্যবস্থা করা, প্রশিক্ষণ প্রদান, ফ্রি চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রদান করা।

এ প্রসঙ্গে মেরিনা বেগম বলেন, দুধের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য কালেকশন সেন্টার গাভীর দুধ নিচ্ছে। জাত উন্নয়নের পাশাপশি যদি পরিবারে নারীর আয় বাড়ানো যায় তবে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে তার পরিচিতি বাড়বে এবং অন্যরাও তা দেখে গাভী পালনে উদ্বুদ্ধ হবেন। ফলে এক সময় প্রতিটি পরিবারের আয় বৃদ্ধি পাবে। তারা দরিদ্রতার কবল থেকে মুক্তি পাবে, পরিবারে নারীর মর্যাদা বাড়বে।