বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টে সফলতা শতভাগ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেশের সর্বপ্রথম বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সফলতা শতভাগ। এ পর্যন্ত ২১ রোগীর বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। ওই ২১ জনই বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন। এমনটাই জানালেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট এবং হেমাটোলজি ও হেমাটোঅনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ খান। তবে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগটি চলছে বহিরাগত ক্লিনার দিয়ে। বিভাগের চারজন ক্লিনারই সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ খান আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, এ পর্যন্ত যে ২১ জনের বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৭ জন পুরুষ এবং চারজন মহিলা। তারাদের মধ্যে সবাই সুস্থ রয়েছেন। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলে দেশের সর্বপ্রথম বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হয় ২০১৪ সালের মার্চ মাসে। ১০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এ ট্রান্সপ্লান্টের ঘোষণা দেয়া হয়। বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টে দেশের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-২ এর বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল ও হাভার্ড মেডিকেল স্কুলের বিশেষজ্ঞরাও।
অধ্যাপক ডা. এম এ খানের বলেন, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগটি করা হয়েছে সবচেয়ে অত্যাধুনিক। পুরো ইউনিটটি করা হয় কম্পিউটারাইজড। হাতের কাজ থাকলেও নামে মাত্র। এ বিভাগে ফ্লোরগুলো করা হয়েছে ইপেক্সি। এতে কোনো ব্যাক্টেরিয়ার জীবাণু ঢুকতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, এ জীবাণু রোধে দেয়ালগুলোয় লাগানো হয়েছে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল সিলিকন। বোনম্যারোতে পাঁচটি কেবিন রয়েছে। প্রতিটি কেবিনে অত্যাধুনিক জিনিসপত্র দেয়া হয়েছে। রোগীদের যাতে মানসিক অস্বস্তি না লাগে, তার জন্য টিভিও রাখা হয়েছে। প্রতিটি কেবিনে রয়েছে পজেটিভ প্রেশার, যাতে কোনো নার্স কেবিনে ঢুকলে তার সঙ্গে থাকা জীবাণুগুলো মুক্ত হয়।
অধ্যাপক এম এ খান আরও জানান, এ বিভাগ অন্যান্য বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে রয়েছে রোগীদের জন্য ব্যায়াম ঘর, খাবারের ঘর। স্টেম সেল সংগ্রহ করার জন্য আলাদা কক্ষ। স্টেম সেল ল্যাবটি হবে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস কক্ষÑ যেখানে সেল সংগ্রহ করে রাখা হবে। তিনি বলেন, আগে স্টেম সেল নেয়া হতো হাড় থেকে, এখন তা নেয়া হয় রক্ত থেকে। তবে এ বিভাগে কোনো সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারে না। একজন চিকিৎসক বা নার্সও যদি এ বিভাগে প্রবেশ করেন, তবে তাকে দুইবার তার পোশাক পাল্টাতে হয়।
এ বিভাগে হাত ধোয়ার পানিও হচ্ছে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত। প্রতিটি রোগীর জন্য রয়েছে স্পেশাল পানির ফিল্টার, যার মূল্য ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। রোগী ছেড়ে দেয়া হলে ওই ফিল্টারও পরিবর্তন করা হয়। এখানে একজন রোগীর বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করতে খরচ হয় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা, যা দেশের বাইরে খরচ হয় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের ওপর থাইল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিকিৎসক নার্স ও প্যারামেডিকসদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হয়েছে। ক্লিনারের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত চারজন ক্লিনার দিয়ে চলছে এ বিভাগ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের মাধ্যমে ব্লাড ক্যানসার, লিউকোমিয়া, থ্যালাসেমিয়া, লিম্ফোমা, সিভিয়ার অ্যাপ্লাস্টি অ্যানিমিয়াসহ জটিল রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব। তাদের আর অন্য কোথাও যেতে হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. বিমলাংশু দে বলেন, আমাদের প্রথম ধাপে ছিল রোগীর শরীর থেকে স্টেম সেল নিয়ে ২০ জন রোগীর চিকিৎসা করা হবে। এর পর বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন করা হবে ‘অ্যালাজনিক ট্রান্সপ্লান্ট’ অর্থাৎ ডোনার থেকে স্টেম সেল নিয়ে। তিনি বলেন, এ কাজটা আমরা সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পেরেছি। তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে চারজন চিকিৎসক, ২০ জন নার্সকে এ বিষয়ের ওপর স্পেশাল ট্রেনিং দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি সবাইকে বোনম্যারোর ডোনার হওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন এক নতুন অধ্যায়। আমাদের এ চিকিৎসাসেবার এ পর্যন্ত কোনো ব্যর্থতা নেই। সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে একেবারে গরিব রোগীদের এ চিকিৎসাসেবায় নিয়ে আসার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিত্তবানদের স্বচ্ছতায় এ চিকিৎসাসেবায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সরকার ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল ও হাভার্ড মেডিকেল স্কুলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করার পর ২০১০ সালের শেষ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের চিকিৎসক, সেবিকা, মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা বোস্টনে গেছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকেও চিকিৎসকরা এসে হাতেকলমে কাজ শিখিয়েছেন বাংলাদেশীদের। শুধু যে চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টরাই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তা-ই নয়, প্রতিস্থাপনের পর ইনফেকশনের আশঙ্কায় রোগীদের বিশেষ ব্যবস্থায় রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিটে এমন কক্ষ তৈরি করতেও প্রকৌশলীদেরও বিদেশে পাঠানো হয়।