টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় ধান-চাল সংগ্রহের গুরুত্ব

অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, দেশ কৃষিপণ্য উৎপাদনে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু কৃষিপণ্য উৎপাদনের কারিগর কৃষককুল তুলনামূলক ভালো নেই। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, অসময়ে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করে কৃষক চাষাবাদ করলেও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক ব্যাংক ঋণ, মহাজনি ঋণ কিংবা এনজিও ঋণ পরিশোধ করতে পারেন না, তারা দেনাদার হয়ে পড়েন। ফলে পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদ করতে হলে তারা আবার চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। অথবা আগাম ফসল বিক্রি করে চাষাবাদ করা ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর থাকে না। অথচ কৃষকদের অকান্ত পরিশ্রম, সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা, প্রযুক্তির উৎকর্ষে প্রতিনিয়তই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারও চায় কৃষক যেন তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। সে কারণে গম, ধান কাটার মৌসুম এলে সরকার ফসলের উৎপাদন খরচ ও লভ্যাংশ যোগ করে গম, ধান, চালের দর নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ গম, ধান, চাল সংগ্রহ করে থাকে। এরপরও কৃষক কেন তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না, বাস্তব এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই এ লেখার অবতারণা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, চাল, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ ও পাট মিলিয়ে ৬টি কৃষিপণ্যের উৎপাদন ৫ কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে, যা গত বছরের তুলনায় ১১ লাখ ৮০ হাজার ৪৮৩ মেট্রিক টন বেশি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে উল্লেখিত পণ্য ৬টির উৎপাদন ছিল ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৬৯ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন, যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রাথমিক হিসেবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৬ লাখ ৫০ হাজার ২১৫ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চালে উৎপাদন বেড়েছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৮৬৭ টন, গমে ৪৪ হাজার ৯২৮ মেট্রিক টন, ভুট্টায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪২৮ টন, পেঁয়াজে ৩ লাখ ১৭ হাজার ২৩৮ টন, আলু ৩ লাখ ৪ হাজার ২৬১ টন এবং পাটে উৎপাদন বেড়েছে ১১ হাজার ৭৬১ মেট্রিক টন। তুলনা করলে দেখা যায়, ৬টি পণ্যের মধ্যে পাট ও গমের উৎপাদন অন্যান্য পণ্যের মতো বাড়েনি। কারণ সোনালি আঁশখ্যাত পাট বহু বছর ধরে চাষিরা চাষাবাদ করলেও উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে পাট চাষ প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। আর গমের ক্ষেত্রেও অবস্থা একই রকম থাকায় চাষিরা গম চাষের আগ্রহ দিনে দিনে হারিয়ে ফেলছেন। স্বস্তির বিষয়, সরকার ইতোমধ্যেই ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক আইন-২০১০’-এর সফল বাস্তবায়নে পাটশিল্পকে পুনর্জীবিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে গত বছরের উৎপাদিত পাট চড়া দামে বিক্রি করে কৃষক লাভবান হয়েছেন। অবশ্য এ কারণে এ বছর পাটের চাষ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আমরা আশাবাদী, এ বছর পাটচাষিদের পাটের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত হবে এবং তারা লাভবান হবেন।

আগেই বলেছি, সরকার মূলত কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেই ধান, গম ও চাল সংগ্রহ করে থাকে। বাস্তবতা হচ্ছে, যে পরিমাণ ধান ও গম উৎপাদন হয়, সে অনুপাতে সরকার ধান, চাল ও গম সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে প্রতি বছর সরকার গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ ধান, চাল ও গম সংগ্রহ করে তা উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। উল্লেখ্য, বছরে আমন ও বোরো সংগ্রহ মৌসুমের মধ্যে সিংহভাগ ধান উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। দুই মৌসুমে ধান উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মেট্রিক টন। অথচ সরকার দুই মৌসুমে ধান ও চাল সংগ্রহ করে মাত্র ১২-১৩ লাখ মেট্রিক টন। সঙ্গত কারণেই ধান কাটা-মাড়াই শুরু হলে একমাত্র ছোট-বড় চাল কলমালিক এবং কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী ছাড়া ধান কেনার আর কেউ থাকে না। এমনকি বোরো মৌসুমে ধান কাটার সময় কোনো কোনো বছর লাগাতার বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে রোদের অভাবে চাষিরা যেমন ধান প্রসেস করে গোলাজাত করতে পারে না, তেমনি মিলমালিকদের পক্ষে ধান কিনে তা চাল আকারে প্রস্তুত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ধান নিয়ে চাষিদের বিপাকে পড়তে হয়। প্রাকৃতিক এসব সমস্যার মাঝে আর এক ভোগান্তি কৃষি মজুরের সংকটের কারণে বাড়তি মূল্যে চাষিদের ধান কাটতে হয়। যদিও সরকারের কৃষিবান্ধব পরিকল্পনার কারণে ডিজেল, বীজ ও রাসায়নিক সারের মূল্য যেমন বাড়েনি, তেমনি সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাষাবাদের উপকরণগুলো নির্বিঘেœ চাষিদের কিনতে সমস্যাও হয়নি। ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে। মূল সমস্যা হচ্ছে, উৎপাদিত ধান ও গমের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের অভাব। যদিও সরকার চলতি বোরো মৌসুমে সংগ্রহ নীতিমালার পরিবর্তন করে কৃষকদের কাছ থেকে ৭ লাখ মেট্রিক টন ধান ও চাল কলমালিকদের কাছ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত চাল কলমালিকদের সঙ্গে সরকার চাল সংগ্রহের জন্য চুক্তি করেনি। ফলে দেশের প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার চাল কল বন্ধ থাকার দরুন ধানচাষিদের ধান তারা কিনতেও পারছেন না। ফলে ধানের বাজার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতও হচ্ছে না। যদিও এর আগে সরকার বোরো মৌসুমে দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে থাকত। কিন্তু এবারই প্রথম চাল কলমালিকদের কাছ থেকে তুলনামূলক স্বল্প পমিরাণ চাল সংগ্রহ করার ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ধান সংগ্রহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আশা করা হচ্ছিল, বাড়তি ধান সংগ্রহ করায় কিছুটা হলেও কৃষক ধানের ন্যায্য দাম পাবেন। তবে ধান সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করে ধান সংগ্রহ করায় চাষিদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। কারণ বরাদ্দকৃত ধানের পরিমাণ এতই কম, যেখানে একজন ধানচাষি সরকারি দরে যৎসামান্যই ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। আমরা মনে করি, একমাত্র গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারে খাদ্য অধিদপ্তরের ক্রয়কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হলেই শুধু ধানচাষিদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ জন্য বর্তমানে যে পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়, তার পরিমাণ অন্তত তিনগুণ বাড়ানো উচিত। যদিও সরকারের খাদ্যশস্য মজুদ উপযোগী আরও খাদ্যগুদামের অভাব এখনো প্রকট। এ সংকট উত্তরণে খাদ্যশস্য মজুদ উপযোগী খাদ্যগুদাম নির্মাণ করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত তা করা সম্ভব হবে না, ততদিন পর্যন্ত খাদ্যগুদাম ভাড়া করে হলেও ধান সংগ্রহ কার্যক্রমকে জোরদার করা ছাড়া ধান, গমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে না। সম্প্রতি নীলফামারীতে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষের’ কৃষক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ভুট্টাচাষিদের দাবির মুখে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষণা করেছেন, ভুট্টাচাষিদের মূল্য নিশ্চিত করতে আগামীতে সরকার ধান, চাল, গমের পাশাপাশি ভুট্টাও সংগ্রহ করবে। সন্দেহ নেই, অর্থমন্ত্রীর এই আশ্বাস ভুট্টাচাষিদের জন্য একটি বড় মাপের সুখবর। আমরাও চাই, ভুট্টাচাষিদের ভুট্টার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে ভুট্টা সংগ্রহ করা হলে দেশের চরাঞ্চলের পতিত জমিতে ভুট্টা চাষ করে কৃষি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠা চাল কলশিল্পকে রক্ষা করাও অতীব জরুরি। কারণ এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের রুটি-রুজি জড়িত। এসব চাল কলশিল্পে মহিলা ও পুরুষ শ্রমিকরা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। আবার চাল কলশিল্পে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে। কোনো কারণে এ শিল্প ধ্বংস হলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের অভাবে লাখ লাখ দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক বেকার হবেন, অন্যদিকে ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত টাকাও গচ্চা যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। অথচ কৃষি অর্থনীতির বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে দেশে গড়ে ওঠা প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার চাল কলশিল্পকে রক্ষার স্বার্থে যেখানে সরকারকে চাল সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি করা উচিত, সেখানে এ বছর চাল সংগ্রহের পরিমাণ কমে আনায় চাল কলশিল্প এখন হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে কৃষি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা যেমন বাড়বে, তেমনি কাক্সিক্ষত পরিমাণ প্রবৃদ্ধি অর্জন করাও কঠিন হবে। এমনকি হাসকিংনির্ভর মিল চাতাল বন্ধ হলে গুটিকতক আধুনিক অটোমেটিক রাইস মিলের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে কৃষকের উৎপাদিত ধান ক্রয়ের যে প্রতিযোগিতা চালু আছে, তা কমে আসবে এবং কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করা অনেকাংশেই সম্ভব হবে না। বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে মোটা ধানের চাল ও চিকন ধানের চালের জন্য দুই ধরনের দর নির্ধারণ করে চাল সংগ্রহ নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। কারণ চিকন ধানের ফাইন রাইস আধুনিক অটোমেটিক রাইস মিল থেকে সংগ্রহ করে ‘জিটুজি’ পদ্ধতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা যাবে। পাশাপাশি মোটা ধান থেকে প্রস্তুতকৃত ভালো মানের চাল সংগ্রহ করে বিভিন্ন চ্যানেলে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ অব্যাহত রাখলে সাধারণ ভোক্তারাও তুলনামূলক কম মূল্যে চাল কিনে খেতে পারবে। অবশ্য সরকার ইতোমধ্যেই পল্লি রেশনিং পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিয়ে তা আগামী জুলাই মাস থেকে কার্যকরের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্মরণে রাখতে হবে, উৎপাদক, ভোক্তার স্বার্থরক্ষার পাশাপাশি ধাননির্ভর কৃষিভিত্তিক চাল কলশিল্পকে রক্ষা করতে না পারলে এর নেতিবাচক প্রভাবে কৃষি অর্থনীতি চরম সংকটে পড়তে পারে, যা টেকসই কৃষি অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হবে না।

এমতাবস্থায় সরকারকে কৃষক, ভোক্তার স্বার্থরক্ষার পাশাপাশি চাল প্রস্তুতকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাল কলশিল্প এবং অত্যাধুনিক অটোমেটিক চাল কলশিল্পকে রক্ষার স্বার্থে এমন খাদ্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেন ‘চিকন ফাইন চাল’ ও ‘মোটা ভালো মানের চাল’ দুই রকম দরে সংগ্রহ করে ‘জিটুজি’ পদ্ধতিতে চাল বিদেশে রপ্তানির পাশাপাশি দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সম্ভব হয়।