ঈদে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার জুতার বাজার, জমে উঠেছে বেচাকেনা

সারাবছর জুতার চাহিদা থাকলেও রোজার ঈদে তা কয়েকগুণ বাড়ে। আর এ চাহিদা মেটাতে রাজধানীর পুরান ঢাকার কারখানা ও গুলিস্তানের পাইকারি সব মার্কেটে চলছে জোর প্রস্তুতি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জুতা কিনতে আসছেন পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। ঈদবাজার ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে দিনরাত পরিশ্রম করে জুতা তৈরি করছেন কারিগররা। ক্রেতা আকর্ষণে এবার জুতার ডিজাইন, আকৃতি ও রঙে ভিন্নতা আনা হয়েছে। এবারকার ঈদ মৌসুমে ফুলবাড়িয়াসহ পাইকারি বাজারে ১২শ’ কোটি টাকার জুতা বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানসংলগ্ন ফুলবাড়িয়ায় রয়েছে বেশ কয়েকটি জুতার পাইকারি মার্কেট। এগুলো হলো- সিটি সুপার মার্কেট, জাকের সুপার মার্কেট, ঢাকা ট্রেড সেন্টার ও সিদ্দিকবাজার সমবায় মার্কেট। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এখানে আসছেন জুতা সংগ্রহ করতে। এছাড়া রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, বসুন্ধরা সিটি, গুলশান, ধানম-ি ও উত্তরার বড় বড় শপিংমল এবং ফ্যাশন হাউসে যেসব জুতা-স্যান্ডেল শোভাবর্ধন করছে তার প্রায় ৬০ শতাংশের যোগান দেন এখানকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এছাড়া নন-লেদার ও প্লাস্টিকের অধিকাংশ জুতা আসে চীন, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে। তবে পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার, মালিটোলা, নাজিরাবাজার, আলুবাজার, বংশাল, নবাবগঞ্জ ও ইসলামপুওে তৈরি দেশী জুতার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। পরিসংখ্যান বলছে, পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে জুতার বাজার প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার। এবারকার ঈদ মৌসুমে পুরান ঢাকার পাইকারি বাজারগুলোর অন্যতম ফুলবাড়িয়া মার্কেটসহ পাইকারি বাজারে ঈদে ১২শ’ কোটি টাকার জুতা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশে জুতার বৃহত্তম বাজার ফুলবাড়িয়া সিটি সুপার মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, এ মার্কেটের এক থেকে সাততলা পর্যন্তই জুতার শোরুম। রয়েছে কয়েক শ’ জুতার দোকান। এগুলোর মধ্যে আফজাল সুজ, তানিশা সুজ, সম্রাট সুজ, রংধনু সুজ, স্বদেশ সুজ, মাসুম সুজ, রুমান সুজ, ডিলাক্স সুজ, পদ্মা সুজ, যমুনা সুজ, কাজী সুজ, সিকদার সুজ, ঝর্ণা সুজ ও মিলন সুজসহ বিভিন্ন কোম্পানির দেশী জুতার দোকান। এর বাইরে এ মার্কেটে প্রায় অর্ধশত বিদেশী জুতার দোকান রয়েছে। তবে সিংহভাগ দোকানই দেশী জুতার। এসব দোকানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোজার আগে থেকেই জুতার পাইকারি বেচাকেনা চলছে। পুরো রমজান মাসই এ বেচাকেনা চলবে। কোন কোন দোকানে ক্রেতার সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশু ও নারী-পুরুষের বাহারি ডিজাইনের জুতায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ দোকানগুলো। রাজধানীসহ দেশের অন্য এলাকার খুচরা বিক্রেতারা এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটছেন নতুন ডিজাইন ও সাশ্রয়ী দামের জুতার জন্য, যাতে ঈদবাজারে ভাল মুনাফা হয়। এবার বর্ষা মৌসুমে ঈদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জুতা আমদানি ও দেশীয় কারখানায় তৈরি জুতা শোরুমগুলোতে স্থান পেয়েছে। সিলেটের জুতা ব্যবসায়ী ফরিদ হোসেন ও হবিগঞ্জের জুতা ব্যবসায়ী মালেক দেওয়ান জনকণ্ঠকে বলেন, দেশী জুতার পাশাপাশি এখন বিদেশী জুতারও চাহিদা বেড়েছে। অন্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বিক্রি হয় রোজার সময়। এ বাড়তি চাহিদা মেটাতে আগাম পাইকারিতে কেনাকাটা করছেন তারা।

ফুলবাড়িয়া মার্কেটের তানিশা সুজের স্বত্বাধিকারী মোঃ মাসুম শেখ জনকণ্ঠকে জানান, পাইকারিতে জুতা বিক্রি শুরু হয়েছে মূলত রোজার আগে থেকেই। এবার প্রস্তুতিও ভাল ছিল। ঈদে ব্যবসা কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে বলেন, এখনও আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই জুতার বাজার জমে উঠবে বলে তিনি জানান। আফজাল সুজের ম্যানেজার নাসির মিয়া জানান, এ মার্কেটে দেশী জুতা বেশ ভাল চলছে। তবে এবার বিদেশী জুতারও বেশ চাহিদা রয়েছে। আরও কয়েকদিন পর জুতার বাজার পুরোপুরি শুরু হবে বলে তিনি জানান। ঢাকা ট্রেড সেন্টার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বেচা-বিক্রি ভাল। আশা করছি সামনের দিনগুলোতে আরও ভাল বিক্রি হবে। এদিকে পুরান ঢাকার পাদুকাপল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, ঈদের পাইকারি বাজার ধরতে বিরামহীন কাজ চলছে। ক্রেতাদের পছন্দসই নতুন নতুন ডিজাইনের জুতা তৈরি করছেন কারিগররা। ঈদবাজার ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে দিনরাত পরিশ্রম করে জুতার কাজ করছেন তারা। শোরুমগুলোও বাহারি সব ডিজাইনের জুতার পসরা সাজিয়ে রেখেছে। ব্যবসায়ীর জানান, বিগত ঈদ মৌসুমে দোকানভেদে প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছে। এবার ওই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন। জুতার বিকিকিন সম্পর্কে লেদার টেকের স্বত্বাধিকারী মাসুদ আহমেদ বলেন, চীন থেকে আমদানি করা পণ্য বাজার দখল করে আছে। এসব সস্তা জুতার ভিড়ে মার খেয়ে খাচ্ছে দেশীয় জুতা। এজন্য দেশী জুতার কাঁচামালের উচ্চমূল্যকে দায়ী করেন তিনি।