ভিক্ষার কথা শুনলে এখন লজ্জা লাগে, সফলতার গল্প

অতীতের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলার চাঁদখানা ইউনিয়নের ছফিরহাট গ্রামের বিধবা আহিনা বেওয়া (৫৫) বললেন, ‘আজ আমি সফল, দীনতা আমার দিকে হাত বাড়াতে পারে না। আমার খাদ্য, বস্ত্রের অভাব ঘুছে গেছে। এখন ভিক্ষার থালা নিয়ে মানুষের কাছে হাত পাততে হয় না। আর অতীতের ভিক্ষার কথা মনে হলে ভাবতেও লজ্জা লাগে। আমার কাছে মøান হয়ে গেছে অতীত। বদলে গেছে আমার জীবনধারা।’

স্বামীকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলার পর দুই চোখে অন্ধকার দেখছিলেন তিনি। বাধ্য হয়ে ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিয়েছিলেন। এখন ভিক্ষা ছেড়ে দিয়ে সব মিলে ভাল আছি জানিয়ে বিধবা আহিনা বেওয়া মুচকি হেসে মুখ ঢাকলেন। শুধু আহিনা বেওয়া নয়, এই কিশোরীগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নজুড়ে এখন একজন ভিক্ষুক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

প্রধানমন্ত্রীর একটি ঘোষণা ছিল, যেখানে ভিক্ষুক সেখানেই পুনর্বাসন। তাই নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলার চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করেছে। ভিক্ষুক নেই। পুনর্বাসিত ভিক্ষুকরা পেয়েছে ঘর, জড়িয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়। সেই সঙ্গে পুনর্বাসিত ভিক্ষুকের হাতে তৈরি হয়েছে এখানে সমতল ভূমিতে চা বাগান। মাত্র দু’বছরে ভিক্ষুকমুক্ত কিশোরীগঞ্জ উপজেলা একটি মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জুন এই উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করে তালিকার মাধ্যমে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন এখন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার একটি প্রতিনিধি দল পুনর্বাসনকৃত ভিক্ষুকদের বাড়িতে গিয়ে তাদের পুনর্বাসনের সফলতা দেখে এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণার এত বড় সফলতা কিভাবে সম্ভব তা সরজমিনে এসে ঘুরে দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যলয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। ২০১৫ সালের ২৯ মে তিনি এই উপজেলা এসে পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছিলেন মুশা মডেল মাদ্রাসা মাঠে। তিনি তার ইচ্ছামতো উপস্থিত পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের সঙ্গে কথা বললেন। প্রশ্নে প্রশ্নে জেনে গেছেন অনেক কিছুই। আহিনা বেওয়া থেকে সকলেই তাকে জানায় তাদের অতীত ও বর্তমানের জীবনধারার কথা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যলয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের অবস্থার আরও উন্নতির চিত্র সরজমিনে দেখতে আগামী ১৬-১৭ দুদিনের সফরে নীলফামারী আসার কথা রয়েছে।

পুনর্বাসনকৃত ভিক্ষুকরা এখন একটি বাড়ি একটি খামারের সদস্য হয়ে যেমন সুবিধা পেয়েছেন তেমনি ছাগল পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেলাই মেশিন দিয়ে কাজ করে প্রতিদিন তাদের আয় হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।

স্বামী পরিত্যক্ত কেশবা গ্রামের ভিখারিণী কল্পনা বেগম (৩৫) বললেন, স্বামীর সঙ্গে ঘর ভাঙার পর দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। বাবা-মা নেই, ভাই রিক্সাচালক। কেউ আমার ভার গ্রহণ করেনি। বাধ্য হয়ে দুটি সন্তান ও নিজে বাঁচার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেই। এ উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হলে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের

তালিকায় আমার নাম আসে। একটি সেলাই মেশিন পেয়ে যাই। এখন আমি ছোটখাটো সেলাইয়ের কাজ করে প্রতিদিন ২০০ টাকার বেশি রোজগার করছি।

বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি গ্রামের আমেনা বেগমের (৬৫) বলেন, তার স্বামীর মৃত্যুর পর এক ছেলেকে নিয়ে তিনি অকুল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। খেয়ে না খেয়ে থাকার পর চরম বাস্তবতার মধ্য বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেন। বর্তমানে ছেলে বড় হলেও বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস করছে। আমি ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে দুটি ছাগল পেয়েছি। এর মধ্যে একটি ছাগল তিনটি বাচ্চা দিয়েছে। সঙ্গে পেয়েছি ২৪শ’ টাকা। এই টাকা দিয়ে বাড়ির সামনে বিস্কুট চানাচুরের দোকান দিয়েছি। এখন তাকে আর ভিক্ষা করতে হয় না। নিতাই কুটিয়ালপাড়া গ্রামের বাছান উদ্দিন, চাঁদখানা নগর বনগ্রামের আম্বিয়া খাতুন, মর্জিনা খাতুন ও দুরাকুটি গ্রামের কেচুমাই তারা সবাই পুনর্বাসিত হয়ে এখন ভাল আছেন।

ভাবতে ভাল লাগছে বাংলাদেশের এমন একটি উপজেলা যেখানে কোন ভিক্ষুক নেই। একজন ইউএনও বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে মোট ৯৭৯ জন ভিক্ষুককে বিভিন্ন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করে একটি উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে পারে। তাহলে সরকারী, বেসরকারী, বিত্তবান মানুষ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি একাট্টা হয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে তবে খুব সহজেই বাংলাদেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব। স্বাধীনতার এত বছর পর আমরা বোধহয় এই স্বপ্নটি দেখতে পারি।

একটি বাড়ি একটি খামারের প্রকল্প পরিচালক ড. প্রশান্ত রায় জানান, পুনর্বাসনকৃত ভিক্ষুকদের একটি বাড়ি একটি খামারের সদস্য করে এর সুবিধা প্রদানের আবেদন যা পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পুনর্বাসনকৃত ভিক্ষুকদের একটি বাড়ি একটি খামারের সদস্য করে এর সকল সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক জাকির হোসেন বলেন, কিশোরীগঞ্জ ভিক্ষকমুক্ত হয়ে আজ দেশের একটি মডেল উপজেলায় পরিণত হয়েছে।

পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের চা বাগান ॥ উপজেলায় পুনর্বাসিত ভিক্ষুকরা নিজেরা চা বাগান করেছে। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এই চা বাগান জীবন-জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখন আর ভিক্ষা করে না তারা। অনেকেই উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় খাস জমিগুলোতে চা বাগান করছে। সেখানে পুনর্বাসিত ভিক্ষুকরা চায়ের জমিতে কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে তারা চা চাষের জমিতে কৃষি শ্রমিক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের ঘর ॥ আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের জমিসহ সুন্দর মডেলের একটি করে টিনের বাড়ি তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে সকল পুনর্বাসিত ভিক্ষুক একটি করে ঘর পাবেন। এর মধ্যে তিন দফায় ৭০ জনকে এই টিনের ঘর করে দেয়া হয়েছে। এই ঘরের নক্সাটি করেন প্রধানমন্ত্রীর দফতরের আশ্রয়ন ২ প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ সিকদার। ১৬ ফিট ৬ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ১০ ফিট ৬ ইঞ্চির প্রস্থ একটি ঘরে টিনের ঘরের সঙ্গে রয়েছে নলকূপ ও স্যানিটেশন ল্যাটিন।

যেভাবে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন ॥ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৯৫১ জন ভিক্ষুককে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নানা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। এদের মধ্যে ৭১১ জন ছাগল পালন, ৬৫ জন গবাদী পশুপালন এবং ১৭৫ জনকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িত করা হয়। এছাড়া ৫৯৯ জনকে বয়স্ক ভাতা, ২০৯ জনকে বিধবা ভাতা এবং ৫৩ জনকে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি ২৩ জনকে ৫ শতক করে খাস জমি প্রদান করে বসতভিটার সঙ্গে খামার স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। এলজিএসপি-২ প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসনকৃত ভিক্ষুকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

পুনর্বাসন কমিটি ॥ পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের দেখভাল এবং তাদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার জন্য উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও মনিটরিং কমিটি। এসব কমিটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলার বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ সদস্য হিসেবে কাজ করছে।