মহাস্থানের নতুন রূপ

পাল্টে যাচ্ছে বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়। আড়াই হাজার বছর আগে এটি ছিল প্রাচীন বাংলার রাজধানী। যা পুণ্ড্রনগরী নামে পরিচিত ছিল। কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসা সেই দর্শনীয় স্থানটি এখন সাজছে নতুন রূপে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেসকো) সহযোগিতায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হচ্ছে গড় এলাকাজুড়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে এই কাজটি আলাদা একটি ইউনিটের মাধ্যমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তদারকি করছে। পুরো মহাস্থানগড় এলাকার প্রাচীন নকশা ও এর আধুুনিক অলংকরণ মিলিয়ে কাজটি চলছে। কাজ শেষ হলে এগুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে মহাস্থান পাবে একটি নতুন চেহারা, যা দেখে পর্যটকরা আকৃষ্ট হবেন।’ সরেজমিনে ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মহাস্থানগড়ের প্রাচীন স্থাপনার দেয়ালগুলো যেখানে ভেঙে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে তা মেরামত করা হচ্ছে প্রাচীন নকশার আদলে। এ জন্য প্রাচীন ইটের মতো করে ভাটা থেকে ইট তৈরি করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন সংরক্ষণে বিশ্বে এ ধরনের কাজ স্বীকৃত। প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ সংস্কারে প্রাচীন ইট বানিয়ে তা মূল স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার কনজারভেশন আর্কিটেক্ট নিলাম করে তার সহযোগী ও শ্রীলঙ্কার রাজমিস্ত্রিদের নিয়ে কাজগুলো করছে। সংস্কারকাজে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি প্রতিনিধি আব্দুল মালেক বলেন, ‘শুধু ইট-পাথর ও চুন-সুরকি নয়, বিশেষ ধরনের মেহগনি কাঠ ও টালি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দেখতে অপরূপ। অনেকটা নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ঘরবাড়ির মতো। একটি বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বেড়ানো, থাকা-খাওয়া ও কেনাকাটা করার জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকছে। ইতিমধ্যে কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে।’ এই প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে, দক্ষিণ এশীয় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (এসএটিআইডিপি)। প্রায় ২০ রকমের এই কাজে উল্লেখযোগ্য হলো কেনাকাটার জন্য মার্কেট, প্রবেশদ্বার, খাবারের দোকান, শৌচাগার, কাঠের ব্রিগ, পিকনিক স্পট, পার্কিং, রাস্তা কার্পেটিংসহ অন্যান্য। ২০১৪ সালের ১ এপ্রিল সরকারের সঙ্গে এই কাজটি করার জন্য এডিবির চুক্তি হয়। ১৫ মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে কাজের সময়সীমা বাড়ানো হয়। প্রাথমিকভাবে একটি প্রকল্পে কাজের ব্যয় ধরা হয় ছয় কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা পরে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আরেকটি প্রকল্পে ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ রাস্তাঘাট নির্মাণ ও প্রাচীন ঐহিত্য সংরক্ষণের পুরনো নকশায় আধুনিক কাজ করা হচ্ছে। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে এই কাজে ব্যয় হচ্ছে ছয় কোটি ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। দ্বিতীয় এই কাজটির মেয়াদ রয়েছে ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এসএটিআইডিপির পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘শিগগির কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আবহাওয়াজনিত নানা প্রতিকূলতার কারণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।’ সরকারিভাবে বলা হয়েছে, এ বছর দেশে পর্যটক আগমনের সংখ্যা বেড়ে যাবে। এ জন্য বিদেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে প্রচারের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা না থাকায় পর্যটক হারাতে বসেছিল দেশের বৌদ্ধ সভ্যতার অনন্য নিদর্শন মহাস্থানগড়, ভাসু বিহার, গোকুল মেড়। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রাচীন এই অনন্য সভ্যতার দর্শনার্থী নেমে এসেছিল শূন্যের কোঠায়। পর্যটক আকর্ষণে ইতিমধ্যে মোটেল, ক্যাফেটেরিয়া, বিমান ও বেসরকারি বিমানের কানেক্টিং ফ্লাইটসহ শুল্কমুক্ত বিপণিতে পর্যটকদের জন্য ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এমনটি জানিয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের এক সূত্র জানায়, চলতি বছরজুড়ে পর্যটকদের জন্য এ ছাড় থাকবে। গড় এলাকার আশপাশে গোকুল মেড় (বেহুলার বাসরঘর হিসেবে পরিচিত), বৌদ্ধদের নির্মিত উচ্চতর বিদ্যায়াতন ভাসু বিহার যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। এডিবির কাজ শেষ হওয়ার আগেই পর্যটকদের কেউ এই এলাকায় রাত্রিযাপন করতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের রেস্টহাউস সংস্কার করা হয়েছে। সেখানে তাঁরা সেই সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া মহাস্থানগড়ের চারদিকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হচ্ছে। গত শনিবার মহাস্থানগড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অনেক বিদেশি পর্যটক প্রত্ন সম্ভারের গোবিন্দভিটা অংশ ঘুরে দেখছেন। এর পাশে পাহাড়ের মতো উঁচু প্রত্নস্থাপনাকে সাজানো হয়েছে নতুন আঙ্গিকে। সেখানে দেশি ও বিদেশি ফুলের বাগান করা হয়েছে। মহাস্থানে বেড়াতে আসা পর্যটক মি. স্যানিয়ার ড্রিমস বলেন, ‘আমার বাড়ি লন্ডনের একটি শহরে। ওয়েবসাইটে প্রাচীন পুণ্ড্রনগরী মহাস্থানগড়ের ছবি দেখে ও বর্ণনা পড়ে কৌতূহল হয়েছিল। দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ফিরে গিয়ে আমি পরিচিতজনদের এটা বলব।’ উল্লেখ্য, প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের রাজধানী মহাস্থানে তাম্রদ্বারের সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। এই তাম্রদ্বারটি পুণ্ড্রনগরীর প্রবেশদ্বার ছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।