স্বপ্ন সফলের দ্বারপ্রান্তে মর্জিনা

মর্জিনা বেগম একজন সফল মা। তিনি পেশায় শ্রমিক হলেও তার কুঁড়েঘরে জ্বলছে চাঁদের আলো। তার স্বপ্ন ছিল ঘাম ঝরানো উপার্জনে একমাত্র ছেলেকে ডাক্তার বানাবেন। আর মেয়েকে বানাবেন উকিল। হতদরিদ্র মায়ের এমন আকাশছোঁয়া স্বপ্নটা আজ বাস্তবের দ্বারপ্রান্তে। তার পুত্র রিপন বিশ্বাস ঢাকার একটি মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস শেষ বর্ষের ছাত্র। শিবালয় উপজেলার বাউলিকান্দা গ্রামে হতদরিদ্র সংগ্রামী নারী মর্জিনা বেগমের বাড়ি। ইউনিয়ন পরিষদের একজন তালিকাভুক্ত মাটি কাটার শ্রমিক তিনি। ১৭ বছর আগে ৫ বছরের ছেলে রিপন ও দেড় বছরের মেয়ে সুরমা আক্তারকে রেখে তার কাঠমিস্ত্রি স্বামী লালন মিয়া ঢাকায় গিয়ে আর ফিরে আসেনি। ভিটেমাটি বলতে কিছুই না থাকায় তিনি বাবার বাড়িতে ভাইয়ের সঙ্গে একটি ছাপড়া ঘর তুলে বসবাস করছেন। মর্জিনা বেগমের গ্রামে গিয়ে দেখা গেলো, এলাকার নারী শ্রমিকদের সঙ্গে তিনি রাস্তায় মাটি কাটার কাজ করছেন। প্রখর রৌদ্র আর কঠোর পরিশ্রমে ক্লান্ত মর্জিনা। তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন কাজ আর একটু বাকি আছে। এক ফাঁকে কাপড়ের আঁচলে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে তিনি এগিয়ে এলেন। এর পর একটি গাছের ছায়ায় বসে তার দুঃখ কষ্ট ও স্বপ্নের কথা বলতে শুরু করেন। মর্জিনা জানালেন, একসময় স্বামীর অবর্তমানে দুই শিশু সন্তানকে কি খাওয়াব, কিভাবে তাদের মানুষ করব এ নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখেন তিনি। সন্তানদের মুখে দুবেলা খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেলেও তার স্বপ্ন ছিল ছেলে-মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা। এই প্রতিজ্ঞা নিয়েই নেমে পড়েন জীবন যুদ্ধে। শুরু করেন মাটি কাটার কাজ। পাশাপাশি মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজও করতে হয়েছে তাকে। দরিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও তিনি ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। শুধু মায়ের স্বপ্নই নয় সঙ্গে ছেলে রিপনেরও স্বপ্ন ডাক্তার হবার। একমাত্র পুত্র রিপন ছোটবেলা থেকেই ছাত্র হিসেবে ছিল মেধাবী। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে সে বৃত্তিও পেয়েছিল। হরিরামপুরের ভাদিয়াখোলা ফিরোজা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে রিপন। এরপর মায়ের ও নিজের চেষ্টায় ভর্তি হয় ঢাকা আইডিয়াল কলেজে। সেখান থেকে এইচএসসি পাস করে। মর্জিনা বেগম জানান, এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর ছেলেকে কিভাবে ডাক্তারি পড়াবেন সে চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়েন তিনি। মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ও কর্তা ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন মা ও ছেলে দুজনই। অনেকে তাদের কথা শুনে মুচকি হাসি দিয়ে উপহাসও করেছেন। তারপরও হাল ছাড়েননি মর্জিনা। মায়ের স্বপ্নকে মিথ্যা হতে দেবো না এমন আত্মবিশ্বাসী হন ছেলে রিপন। শেষমেশ এলাকার সচেতন মানুষের পরামর্শ নিয়ে সোজা চলে যান সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম আনোয়ারুল হকের কাছে। পরে তার মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে যায় রিপন। মন্ত্রীর সুপারিশেই ঢাকার গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজে দরিদ্র কোটায় ভর্তির সুযোগ পান তিনি। বর্তমানে তিনি এমবিবিএসের শেষ বর্ষের ছাত্র। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অধীনে সারা দেশের ৫ জন মেডিকেল শিক্ষার্থীকে যে শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে ছিলেন রিপন বিশ্বাসও তাদের একজন। তবে রিপনের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মানুষের অবদানের পাশাপাশি অবদান রয়েছে প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক অরূপ রায়ের। তার লেখনীসহ নানা সহযোগিতা রিপনকে এগিয়ে নেয় অনেক দূর। মর্জিনার সঙ্গে আলাপচারিতার একপর্যায়ে মুচকি হেসে বলেন, আমার হাড়ভাঙ্গা কষ্টের উপার্জন বিফলে যায়নি। আজ আর আমার কোনো কষ্ট নেই। ছেলে আমার স্বপ্ন পূরণ করেছে। সব কষ্টের কথা আমি ভুলে গেছি। ছেলে ডাক্তার হচ্ছে, গরিব দুঃখীর সেবা করতে পারবে। এখন একটি ইচ্ছা একমাত্র মেয়েকে উকিল বানাবো। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ যেন আমার সে স্বপ্ন পূরণ করেন। গর্বিত মায়ের অহংকার রিপন বিশ্বাস বলেন, আমার মা আমার কাছে আদর্শ। মায়ের শরীরের প্রতিটি ঘামের ফোঁটা আমার জীবনে আশীর্বাদ। মা আমার শত কষ্ট করে মাটি কেটে আমাদের মানুষ করেছেন। আমার মায়ের মতো এত পরিশ্রম ও মনের জোর থাকলে ডাক্তার কেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব। আজকে আমার এই অবস্থানে আসার পেছনে আমার মায়ের পাশাপাশি সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম আনোয়ারুল হক, প্রথম আলোর রিপোর্টার অরূপ রায়সহ আরো অনেকে আমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। এজন্য তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। রিপনের স্বপ্ন ডাক্তার হয়ে গ্রামে মায়ের নামে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলবেন। যেখানে এলাকার গরিব-রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হবে। তিনি বলেন, মায়ের স্বপ্ন বোনকে উকিল বানানো। সেই স্বপ্ন পূরণে বোনকেও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের আওতায় ‘সফল জননী নারী’ ক্যাটাগরিতে বিভাগীয় ও জেলাপর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছিলেন মর্জিনা বেগম।