‘এই ছেলেকে আপনারা কোত্থেকে পেলেন’

মা থায় পুষ্পলাল টোপর। মুখে রাজ্যের হাসি। চারপাশে ঘিরে ধরা মানুষটিকে দেখলে মনে হয় ওই বুঝি রাজ্যাভিষেক হতে যাচ্ছে তার। না, রাজসিংহাসন নয়, জয় করে এসেছেন আইপিএল। বাঙালি শির উঁচু করে বীরের বেশে অবতরণ স্বদেশে। ৩১ মে দেশের প্রতিটি দৈনিকে প্রকাশিত হাস্যোজ্জ্বল রঙিন ছবিটা বলে দেয় মুস্তাফিজ কতটা তুষ্ট। শুধু মুস্তাফিজ নয়, পুরো বাংলাদেশ তৃপ্ত ফিজে। সদ্য সমাপ্ত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ আইপিএলের নবম আসরে সেরা বোলারদের তালিকায় পঞ্চম স্থানে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। টুর্নামেন্টে ১৬ ম্যাচে ৬১ ওভার বল করে ৪২১ রান দিয়ে মোট ১৭ উইকেট নেন তিনি। সেরা বোলিং ফিগার ১৬ রান দিয়ে ৩টি উইকেট। ইকোনমি রেট ৬.৯০। তাই তো টুর্নামেন্টের এ আসরে ‘ইমার্জিং প্লেয়ার অব দ্য আইপিএল ২০১৬’ নির্বাচিত হয়েছেন ২০ বছর বয়সী সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়ার এই কাটার মাস্টার। আইপিএলের ইতিহাসে এ খেতাব অর্জনকারী প্রথম বিদেশি খেলোয়াড় হলেন তিনি। এ জন্য ১০ লাখ রুপি ও একটি ট্রফি পেয়েছেন মুস্তাফিজ। টাইগার ক্রিকেটে উদীয়মান নক্ষত্র।

ক্রিকেট! ওই একটি জায়গায় একত্রিত বাংলাদেশ। মত-ভিন্নমতের সম্পূর্ণ মিশেলে একাকার হয় বাঙালির আবেগ অনুভূতি আনন্দ উপলব্ধি। যেখানে হানাহানি, রক্তপাত, জিঘাংসা, জোর-জবরদস্তি কিংবা ঘোষ-দুর্নীতির কোনো ঠাঁই নেই। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মীয় অনুশাসন, পোশাক-পরিচ্ছদসহ সর্বক্ষেত্রে বাঙালি রুচিবোধে পরিবর্তনের ব্যাপকতা থাকলেও তারতম্য নেই নব্বই গজের সবুজ গালিচায়। সবার চাওয়া-পাওয়ার বিশাল সাম্রাজ্যে ঘুরপাক খায় ওই একটি নেশা। কোটি প্রাণের তীক্ষè দৃষ্টি বুঁদ হয় সেখানে। ক্রিকেটে কুড়ি বছর আগের বাস্তবতা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলনায় শুধুই পরিবর্তন। বাংলাদেশকে এক সুতোয় গাঁথার যে নিপুণ কারিশমা প্রদর্শিত হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন হলো এ দেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটার। ব্যাট-বলের বাঙালি বীরত্ব দিন দিন দাপটের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। চরম বৈরিতা জয় করে পক্ষ-বিপক্ষ সর্বশক্তিকে এক ছাতার নিচে টেনে আনা এবং ব্যর্থতা-গ্লানি মুছে ষোলো কোটি প্রাণে আনন্দ চাদর জড়িয়ে দেওয়াই টাইগার ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। আর সেই ক্রিকেটের প্রাণভোমরা আমাদের সাকিব-তামিম-মাশরাফি-মুস্তাফিজরা। যাদের ক্রিক ছন্দময়তা এবং সুমধুর তাল সর্বদা নাচিয়ে ছাড়ছে ক্রিকেটপ্রেমী বাঙালিকে।

ক্রিকেটে টাইগারদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান টানলে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে। লেখার বর্ণনাও হবে দীর্ঘ। সেই বিস্তর বর্ণনে যেতে চাচ্ছি না। কারণ আজকের লেখিয়ে বিষয় শুধুই মুস্তাফিজ। এই বিস্ময় বালকে মাতাল ক্রিকেটদুনিয়া। যার মন্ত্রমুগ্ধ বোলিংয়ে বোকা বনছে ব্যাট হাতে ক্রিজে দাঁড়ানো জাঁদরেল মানুষটি এবং ক্রিকেটীয় খাতায় সঠিক অংক কষতে ভুল করছেন ক্রিকেট প-িত-মহাপ-িতরা। মুস্তাফিজের বোলিং মুন্সিয়ানা নিত্যনতুন চমক সৃষ্টি করছে। পিট চাপড়ে সন্তুষ্টির শতভাগ অনুভূতি জানাতে দৌড়ে আসছে মাঠের সতীর্থজন। আর মাঠের বাইরে বসা পর্যবেক্ষক সংস্থা নানা উপাধি উপমায় রাঙিয়ে দিচ্ছে তার ব্যক্তিত্ব সীমানা। এ বঙ্গবালকের বোলিং বারুদে ঘষা লাগতেই জ্বলে ছারখার হচ্ছে ব্যাটের মধ্যভাগ এবং পোড়ামনে মাঠ ছাড়ছেন আক্রান্ত অথর্বজন। মুস্তাফিজে সদ্য বধ হওয়া ব্যথিত চেহারা যেন বলছে, যে খেলেছে সেই বুঝিছে মুস্তাফিজ যন্ত্রণা।

বাইশ গজের ক্রিজে ব্যাটসম্যানদের ব্যাটযন্ত্রে বাড়তি আতঙ্ক ধরালেও গুণমুগ্ধ ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের প্রশংসায় ভাসছেন এই প্রতিভাবান বোলিং জাদুকর। সেরাদের সেরা কাতারে যেমন নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন তেমনি বাঙালি বাংলাদেশকে টেনে ধরছেন অনন্য অবস্থানে। দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা মুস্তাফিজ আমাদের গর্বিত গন্তব্য। তাই তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জাতীয় সম্পদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তাকে। তার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মুস্তাফিজ দেশের জাতীয় সম্পদ। সে দেশকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে। মুস্তাফিজ বিশ্বের নম্বর ওয়ান। তার সফলতার জন্য দেশবাসীর পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই।’ সাকিবের পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে আইপিএল মাতিয়ে কাউন্টি এবং বিগব্যাসের বৃহৎ মঞ্চেও নাম লেখাতে যাচ্ছেন মুস্তাফিজুর রহমান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়া কীর্তিমান ক্রিকেটারদের একজন সে। তাই তাকে জাতীয় বীর কিংবা জাতীয় সম্পদ বললে অত্যুক্তি হবে না।

বাঙালির গর্বিত ও অহঙ্কারের চিত্ত ময়দান এবং ক্রিক বাজার সবখানেই মুস্তাফিজ বন্দনা। সর্বত্র চলছে মুস্তাফিজ মচ্ছব। যে গুণকীর্তনে আজ সবাই মাতোয়ারা। এবার ফিজ প্রশংসার খ-িত অংশবিশেষের পরখে নামতে হয়, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ তার অফিসিয়াল টুইটারে বলেছে, ‘জাদুকরী? রহস্যময়? অসাধারণ? আমরা তো আমাদের তারকা খেলোয়াড় মুস্তাফিজের জন্য বিশেষণের সংকটে পড়ে যাচ্ছি!’ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ও আইপিএলে মুস্তাফিজের দল হায়দরাবাদের অধিনায়ক ডেবিড ওয়ার্নার জানিয়েছেন, ‘ও যেভাবে বলের গতি পরিবর্তন করে, সেটা একটা শিল্প। নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যতে সে গ্রেট বোলারদের একজন হবে। বাংলাদেশের ভাগ্য যে, ওকে পেয়েছে।’ ভারতীয় বোলার ও আইপিএলে মুস্তাফিজের সঙ্গী ভুবনেশ্বর কুমার বলেন, ‘ওর সঙ্গে বল করতে পারা দারুণ ব্যাপার। তার কাছ থেকে আমি স্লোয়ার শেখার চেষ্টা করছি, কিন্তু সে যেভাবে এটা করে, আর কেউ তা পারে না।’ ইংলিশ অলরাউন্ডার ও মুস্তাফিজের কাউন্টি দল সাসেক্সের অধিনায়ক লুক রাইট বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘আমাদের সাসেক্সম্যান মুস্তাফিজ অবিশ্বাস্য! সাসেক্স সমর্থকরা নিশ্চয়ই তার বোলিং দেখে দারুণ আনন্দ পাবে।’ সাবেক ভারতীয় ব্যাটসম্যান ও আইপিএলে মুস্তাফিজের দল হায়দরাবাদের উপদেষ্টা ভিভিএস লক্ষ্মণের মতে, ‘ও এত স্মার্ট বোলার! শুরুর দিকে ওর বলে তিন-চার রকমের বৈচিত্র্য, শেষের দিকে আবার তিন-চার রকমের। আর সবকিছুতে কী দারুণ নিয়ন্ত্রণ!’ এবং সাবেক ইংলিশ বাঁহাতি পেসার ও ধারাভাষ্যকার অ্যালান উইলকিনস জানান, ‘মুস্তাফিজকে যতবার দেখবেন, পরমুহূর্তেই আরও দারুণ কিছু নিয়ে সে আপনার সামনে হাজির হবে। অনেকটা সের্গেই বুবকার মতো, যে প্রতিনিয়তই নিজের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেত।’ যে তকমাই সাঁটানো হোক মুস্তাফিজের দেহদেয়ালে তার আসল পরিচয় কিন্তু কাটার মাস্টার।

মুস্তাফিজ মাস্তানি যারা দেখেছেন তারা নিঃসন্দেহে নিখাদ ভক্ত বনে গেছেন তার। কে নেই এই দলে। খোদ আইসিসিও যেন তৃপ্তিতে তপ্ত। পত্রিকান্তরে শিরোনাম হয়েছে ‘আইসিসি সভাতেও প্রশংসাধন্য।’ সদ্যসমাপ্ত আইসিসির সভায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসানের কাছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান ওয়ালি এডওয়ার্ডসের জিজ্ঞাসা ছিলÑ ‘এই ছেলেকে আপনারা কোত্থেকে পেলেন?’ ওই প্রশ্নের জবাবে বিসিবি বসের উত্তরটা কী হতে পারে? যদি এই প্রশ্নের সারমর্ম খুঁজি এমন করে (কাল্পনিক অর্থে) ‘আরে ভাইছাব এইডা হইলো বাঙালি পোলা। গেরামের কাদামাটি শরীরে মাইক্কা বড় হইছে। খাঁ খাঁ রইদ মাথায় নিয়া, মাটি ফাটা মাঠে শক্ত ঢেলা ছুইড়া বল করার কৌশল আয়ত্ত করছে হে। আস্তে আস্তে যখন এক্কেবারে মাস্টার হইয়া গেছে তখন ধইরা আনছি সেই সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের তেঁতুলিয়া গ্রাম থাইক্কা। আর ওইখানে আইয়াই শুরু করছে তার আসল কাম।’ মুস্তাফিজকে নিয়ে বিসিবি প্রধানের হাসি মুখের উত্তরটা হয়তো এ রকমই ছিল।

একজন আদর্শবান বোলারের আসল উদ্দেশ্য উইকেট শিকার। রানের চাকা মন্থর রেখে ব্যাটওয়ালা ব্যক্তিকে সাজঘরে পাঠানোই বল হাতের সার্থকতা। স্পিন, ফাস্ট কিংবা মিডিয়াম যে কোনো বোলারই কম-বেশি উইকেট পেয়ে থাকেন। কিন্তু উইকেটশূন্য ক্যারিয়ার সমাপ্ত হয়েছে এমন বোলার কি আছেন? একজন বলছেন না! না! না! আরেকজন বলছেন হলে হতেও পারে! রেকর্ড কর্নারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি বল করে উইকেটশূন্য থেকেছেন ইংল্যান্ডের লেন হপউড (টেস্টে ৪৬২ বল), ওয়েস্ট ইন্ডিজের জর্জ হেডলি (টেস্টে ৩৯৮ বল), বাংলাদেশের আনোয়ার হোসেন মনির (টেস্ট ও ওয়ানডে ৩৯৬ বল), অস্ট্রেলিয়ার অটো নাথলিং (টেস্টে ২৭৬ বল) এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের আলফ্রেড স্কট (টেস্টে ২৬৪ বল)। তবে শ্রীলঙ্কান অতুলা সামারাসেকেরার বেলায় রহস্যটা একটু ভিন্ন। তিনি ৪ টেস্টের ক্যারিয়ারে ৩ উইকেট পেলেও ৩৯টি ওয়ানডেতে ৩৩৮টি বল করেও থেকেছেন উইকেটশূন্য।

কেউ উইকেটহীন আবার কেউ উইকেটে পূর্ণ এই তো খেলা। আমাদের মুস্তাফিজ এক বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দেখিয়েছেন এবং দেখাচ্ছেন ক্রিকেট বলের নিপুণ নৈপুণ্য। গত বছর ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-২০ ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা মুস্তাফিজুর রহমান বছর যেতে না যেতেই টুয়েন্টি-টুয়েন্টির ক্ষুদ্র সংস্করণে বনে গেলেন ৫০ উইকেটের মালিক। ১৫ মে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের অধিনায়ক মুরালি বিজয়কে আউট করে উইকেটের হাফ সেঞ্চুরি পূরণ করেন কুড়ি বছরের এ তরুণ। তার প্রথম টি-২০ শিকার পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদি। আর বিজয় পঞ্চাশতম শিকার। ৫০ উইকেট পেয়েছেন তিনি ৩৫ ম্যাচে। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে ২২, বিপিএলে ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে নিয়েছিলেন ১৪ ও আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে ১৬ ম্যাচে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। আইপিএলে প্রথমবার খেলতে গিয়েই নিজের নামের পাশে যুক্ত করেছেন পুষ্পতুল্য প্রশংসা। এক বছরের ছোট্ট ক্যারিয়ারে মুস্তাফিজের কীর্তিকথা যেমন, ওয়ানডে সিরিজে অভিষেকে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার যৌথ বিশ্ব রেকর্ড; ৩ ম্যাচের সিরিজে অভিষেকে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার একক বিশ্ব রেকর্ড; ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার একক বিশ্ব রেকর্ড, ব্রায়ান ভিটোরির পর ওয়ানডে ইতিহাসের দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচেই ইনিংসে ৫ উইকেট, প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট, ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ওয়ানডেতে এটাই সর্বোচ্চ, ভিটোরির ছিল ১০ উইকেট; অভিষেকেই বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিতীয় সেরা বোলিং, মাশরাফি-রুবেলের পর তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ইনিংসে ৬ উইকেট।

কে এই মুস্তাফিজ? কে এই কাটার মাস্টার? বছর দেড়েক আগে কি কেউ চিনত তাকে। অভিষেকের পর থেকে নিজের জাত ও মান চিনিয়েছেন সাতক্ষীরার অজোপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা লিকলিকে হালকা দেহভঙ্গির আশ্চর্য ক্ষমতাধর এই বোলিং বারুদ। যার বৈচিত্র্যময় ডেলিভারিতে কুপোকাত ম্যাচভাগ্য। ক্রিকেটবিশ্বের নামিদামি আসরগুলোতে সাকিব যখন নিয়মিত প্রতিনিধি তখন মুস্তাফিজ যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। হিন্দি-ইংলিশ অজানা মুস্তাফিজ ছিলেন হায়দরাবাদের বিশেষ ব্যবস্থায়। মুস্তাফিজপ্রেমী অনেকে নাকি বাংলা শেখার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। হাজারো তরুণীর ঘুম চুকিয়ে কল্পনার কম্পিউটার মনিটর স্ক্রিন দখল করেছে বিশ বছর বয়সী এই নিভৃত তরুণ। লেখাপড়ায় অন্যমনস্ক গেঁয়ো গন্ধের মুস্তাফিজ হয়ে উঠবে ক্রিকেট অভিধানের অতুল যোদ্ধা কে জানত। শিক্ষা অর্জনের পাঠশালায় অমনোযোগী ছেলের নাম শুনেই যারা ঠোঁট বাঁকিয়ে অতৃপ্তির জানান দিত তাদের গায়ে লেগেছে জাদুকরী পরশ। তারাও বলছে মুস্তাফিজ! মুস্তাফিজ!

সাকিব বিশ্বের শীর্ষ অলরাউন্ডার। তাকে চাপিয়ে কৌতূহলের নয়াদিগন্তে এখন স্বদেশী অন্য আরেকজনের নাম। আইপিএল গ্যালারি, পর্দা সামন, ধারাভাষ্য বক্স, সানরাইজ হায়দরাবাদ ফ্যাঞ্চাইজি এবং অধিনায়ক ওয়ার্নার, সঙ্গী খেলোয়াড়সহ ক্রিকেট প্রাজ্ঞদের নয়নমণি ছিল বঙ্গ আত্মার এই কুশলী কারিগর। একটা সময় অতীত হয়েছে যখন বাঙালি ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের ভক্ত সমর্থক হিসেবে খোদ বাঙালিকেই খুঁজে পাওয়া যেত না। আর এখন টাইগারদের ম্যাজিকেল পারফরম্যান্স গোটা ক্রিকেট সীমানায় তুলছে ধারাবাহিক ঝড়। শুধু বাংলাদেশ নয়, সাকিব-মুস্তাফিজভক্তরা প্ল্যাকার্ড হাতে হাজির হয় বিলাতের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে। বিশেষ করে চলতি সময়ের ক্রিকেট সমীকরণে যে নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম মুস্তাফিজ। যাকে ঘিরে ক্রিকেট অঙ্গনে স্বস্তি-অস্বস্তি দুটোই দৌড়াচ্ছে সমানতালে। একজন বোলারের বোলিং চতুরতায় বেশি বিপর্যস্ত হতে দেখা যায় প্রতিপক্ষ আরেকজন ব্যাটসম্যানকে। তবে বোলারের নিখুঁত গতি ও শৈল্পিক কারুকাজে আম্পায়ারদ্বয় ভোগেন অজানা আতঙ্কে এমনটি হতে পারে বিরল ভাবনার শামিল। আর খেলা পরিচালনাকারী এই কর্তাব্যক্তিদের সিদ্ধান্তহীনতার পথে ঠেলে দিচ্ছেন আমাদের কাটার মাস্টার। তার বলের দৃশ্যমান গতি-প্রকৃতি নাকি বুঝতে সমস্যা হয় আম্পায়ারদের। তৃপ্তি-অতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির প্রধানতম প্রতীক কাটারবয় মুস্তাফিজ। যাকে নিয়ে বাড়তি পরিকল্পনা থাকে বীপরীতমুখী শিবিরে। উইকেট পেছনে আম্পায়ারকেও দাঁড়াতে হয় একটু ভাবনা নিয়ে।

মুস্তাফিজ টাইগার ক্রিকেট তথা বিশ্ব ক্রিকেটের অসাধারণ সৃজনীশক্তি হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় সম্পদ এই দীপ্তিমান বোলার। বিশ বছর বয়সী মুস্তাফিজের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছে। এ দেশের ক্রিকেটে অনেক কিছু দেওয়ার সক্ষমতা লুকিয়ে আছে যার মধ্যে। তাই মুস্তাফিজ নিয়ে ভাবতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে।