চাপাতি নয়, বিজ্ঞানমনস্কতাই হোক বিজয়ের হাতিয়ার

পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি যদি বিজ্ঞানী না হতেন তাহলে কী হতেন? সেদিন উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘একজন সংগীতজ্ঞ’। অবশ্য পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের একটা সম্পর্ক রয়েছে। আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকবার দেখা হয়েছিল। প্রথম দেখা হয় ১৯৩০ সালে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে আর আলবার্ট আইনস্টাইন পান ১৯২১ সালে। প্রথম যখন তাদের মধ্যে দেখা হয়, তখন ভাষাগত সমস্যা তো ছিলই। এ ছাড়া একজন শিল্প-সাহিত্য তথা নান্দনিকতার লোক, অন্যজন ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী। তাদের মধ্যে এই বন্ধুত্বের সূত্র ধরে শিল্প-সাহিত্য ও পদার্থবিজ্ঞান একাকার হয়ে যায়। একপর্যায়ে আলবার্ট আইনস্টাইন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ জয়যাত্রা নিয়ে অবহিত করেন। বর্তমানের বেতার, টেলিযোগাযোগসহ অনেক প্রযুক্তির কথাই সেদিন আলবার্ট আইনস্টাইন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে তুলে ধরেন। এতে মানুষের জীবনযাপন এবং সভ্যতার নানা পরিবর্তন হবে ও জীবন অনেক আরামপ্রদ হবে। তখন এসব কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ চুপচাপ ছিলেন। একপর্যায়ে আক্ষেপ করেই বলেছিলেন, ‘এতে আমার কী হবে? কারণ তখন তো আমি থাকব না।’ অনেক আশার বাণীই তাকে শুনিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন।

আমাদের সময় আমরা ‘কবি ও বিজ্ঞানী’ নামক প্রবন্ধ পড়েছি। এখন এগুলো পড়ানো হয় কিনা জানি না। তবে পড়ে নেওয়াটাই ভালো। হোমারের ‘ওডিসি’ পড়লে দেখা যাবে, গ্রিক কবি হোমার জন্মান্ধ ছিলেন। তিনি বিশ্বব্রমা-ে চলমান কিছু বস্তুর কথা উল্লেখ করেছিলেন। এগুলো আসলে উপলব্ধির বিষয়। পরবর্তী পর্যায়ে পদার্থবিজ্ঞান তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে এসট্রোনোমি, কসমোলজি বিষয়গুলো মানুষের কাছে উপস্থাপন করে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দূর করে। তবে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এখনো রয়েছে। বর্তমানে কম্পিউটার শব্দের আগে সায়েন্স শব্দটি লাগানো ঠিক নয়, কারণ কম্পিউটার কোনো বিজ্ঞান নয়, এটি একটি প্রযুক্তি। এর নাম হওয়া উচিত কম্পিউটার টেকনোলজি। যে জ্ঞান-বিজ্ঞান বোঝে না, সে সৃষ্টিকর্তাকে বোঝার ক্ষমতা রাখে না। আমাদের সৃষ্টিকর্তা অনেক বড়। প্রশ্ন হলো, বড় মানে কত বড়? আজকাল বলা হয় অনেকগুলো ইউনিভার্সের কথা। বলা হয় কয়েক মিলিয়ন গ্যালাক্সি রয়েছে। একটি গ্যালাক্সি থেকে আরেক গ্যালাক্সির দূরত্ব কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষ। সে রকম একটি গ্যালাক্সি অংশ হচ্ছে সৌরজগৎ। এর ক্ষুদ্র একটি অংশ পৃথিবী। আর সেই ক্ষুদ্র একটি অংশে আমাদের অবস্থা। কাজেই এই বিশ্বব্রমা- বোঝার জন্য বিজ্ঞান চর্চার দরকার। সৃষ্টিকর্তার ব্যাপকতা সম্পর্কে জানতে হলে এই বিশ্বব্রমা- সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে।

আমাদের এই পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে। আর ডাইনোসর ছিল ৩০ কোটি বছর আগে। ফুলবিশিষ্ট গাছের অস্তিত্ব ১০ কোটি বছর। আর হাত-পাওয়ালা মানুষের বয়স ১০ লাখ বছর এবং সভ্য জগতের কাপড় পরা মানুষের বয়স ৩৬ হাজার বছর।

বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া কঠিন বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আমরা যেটিকে সত্য বলে জানি, সেটি পুরো সত্য নয়। একসময় সত্য ছিল পৃথিবী নামক গ্রহটি স্থির এবং এর চারপাশে সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহ, নক্ষত্রাদি ঘুরছে। এর বাইরে কথা ংবলা মানেই গলা কেটে ফেলা হতো। সে সময় এটাই সত্য। কিন্তু পরে প্রমাণিত হলো এটি সত্য নয়, বরং পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। কাজেই এতে প্রমাণিত হয়, আমি যা জানি সেটিই পুরো সত্য হিসেবে ধরে নিলে বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। বিজ্ঞানমনস্ক হলো এমন, আমি যে সত্য জানি তা আপাতত সত্য, পরবর্তী পর্যায়ে এটি পরিবর্তন হতে পারে। এমন চিন্তা-চেতনাই হলো বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া। সেদিনও মানুষ জানত না, আপেল পাকার পর উপরে দিকে না গিয়ে নিচের দিকে যায় কেন? ১৬৬৫ সালে আইজ্যাক নিউটন আবিষ্কার করেন আপেল কেন নিচের দিকে আসে। এর আগেও কিন্তু মাধ্যকর্ষণ শক্তি ছিল। কিন্তু মানুষ জানত না। এটা জানার জন্য ১৬৬৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

মুসলমানদের একসময় বিজ্ঞানে ব্যাপক সাফল্য ছিল। সেই সময়কালকে বলা হয় মুসলমান বা ইসলামের স্বর্ণযুগ। এটি হুমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগ। তখন মধ্য আফ্রিকা থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত মুসলমানদের আয়ত্তে ছিল, সেটা কিন্তু তরবারি কিংবা এখন যেটাকে বলা হচ্ছে চাপাতি সেগুলো দিয়ে হয়নি। এটা করা হয়েছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি দিয়ে। আজকের মডার্ন যে ক্যামেরা আমরা দেখি, এগুলো কিন্তু মুসলমানদের আবিষ্কার। এখন সমস্যা হচ্ছে, মুসলমানরা আবিষ্কারের ইতিহাস পড়ে কিন্তু আবিষ্কার করে না। একসময় মুলমানদের বিজ্ঞানে বড় অবদান ছিল। এখন তারা বিজ্ঞান চর্চা করে না। একটি সভ্যতা ধ্বংসের আলামত তখনই দেখা দেয়, যখন বিজ্ঞান থেকে মানুষ দূরে সরে যায়। এখন সে সমস্যাটিই মুসলমানদের মধ্যে দেখা দিয়েছে। গত ৫০ বছরে মুসলমানদের কোনো আবিষ্কার নেই। আর দু-একটি আবিষ্কার যদি হয়েও থাকে সেটা বলা হয় ইসলামিয়া, আহমাদিয়া, শিয়াদের দ্বারা। মুসলমানদের মধ্যে অনেক ভাগ রয়েছে। মুসলমানরা যদি একটা কিছু করেও থাকে, তবে তা সেই শ্রেণির মধ্যে ফেলা হয়। এতে বিজ্ঞানের সঙ্গে মুসলমানদের একটি দূরত্ব স্থাপিত হয়ে গেছে। ইসলাম বিজ্ঞানের বিপরীত শব্দে পরিণত হয়েছে। এখন বিজ্ঞানের যত অপআবিষ্কার যেমন অস্ত্র, গোলাবরুদ, চাপাতি, মাইক, সেসব কিছুই মুসলমান ব্যবহার করছে। যে বিজ্ঞান মুসলমানদের এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তা মুসলমানরা চর্চা করে না।

যারা মনে করেন, সারা বিশ্বে ফের অস্ত্রের জোরে ইসলামের ঝা-া উড়বে, তারা ভুল করছেন। কারণ মানবসভ্যতা আর পেছনে যাবে না। আর যদি ইসলামের ঝা-া ওড়েও, তবে তা কেবল বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই সম্ভব। অস্ত্র দিয়ে বিশ্বজয় হবে না। একসময় যেমন হয়েছিল, সেটা ছিল বিজ্ঞানের অবদান। ইসলামের স্বর্ণযুগের নেপথ্যে ছিল বিজ্ঞান। তরবারি বা চাপাতি দিয়ে সেটা করা হয়নি। কাজেই যারা তরবারি বা চাপাতি দিয়ে জয় পেতে চায়, তাদের উচিত তাৎক্ষণিকভাবে সেই পথ থেকে দূরে সরে আসা। সভ্যতাকে যা আলোকিত করবে না, তখন তা গ্রহণযোগ্যও হবে না। এমনকি কেউ যদি অত্যাচার, নিপীড়ন ও বঞ্চনার প্রতিশোধও নিতে চায় সেটাও করতে হবে বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বিশ্বক্ষমতার নেতৃত্ব গ্রহণের মাধ্যমে।

লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়