বছরে আম রফতানি ৯০০ মেট্রিক টন

বছরে আম রফতানি ৯০০ মেট্রিক টনব্যাগিং পদ্ধতিতে আম রফতানির প্রক্রিয়া চলছে -যুগান্তর
আম উৎপাদনে নীরব বিপ্লব ঘটছে। চার বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বেড়েছে এই উৎপাদন। গত দু’বছরে আম উৎপাদন হয়েছে ৪০ লাখ টন। একই সময়ে রফতানি হয়েছে প্রায় দু’হাজার টন। ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে রফতানি হচ্ছে এসব আম।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে জানান, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, উন্নত প্যাকিং ও বিপণন ব্যবস্থায় আম রফতানির এই সুযোগটি বাংলাদেশ পুরোপুরি অর্জনে সক্ষমতার পথে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের আমবাগানগুলোকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনের আওতায় আনা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ভোক্তা চাহিদা এখন শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বিশ্ববাজারে এর নতুন ভোক্তা তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিকমান অনুসরণ করে বিদেশে রফতানির পথ খুলে গেছে বাংলাদেশের জন্য।

এদিকে আম রফতানির জন্য তোড়জোড় পড়ে গেছে রফতানিকারকদের মাঝে। বাংলাদেশের কীটনাশক, ফরমালিন ও বিষমুক্ত আম চাহিদা মিটিয়ে রফতানিকারকরা এখন লন্ডন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানির চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। এক্ষেত্রে তারা ফাইটোস্যানেটারি সার্টিফিকেট অর্জনে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী পোকাদমনে সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহারসহ সরকারের দেয়া অ্যাকশন প্ল্যান মেনে কাজ শুরু করেছেন।

জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই দেশ থেকে আম রফতানি শুরু হয়েছে। তবে এই উদ্যোগ ছিল অনেকটা ব্যক্তিপর্যায়ে, সীমিত পরিসরে ও মূলত প্রবাসী বাংলাদেশীদের ঘিরে। এখন সেসব দেশে স্থায়ী বাজার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। দেশে উৎপাদিত ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি ও ক্ষিরসাপাতি জাতের আম রফতানি হয়ে থাকে। কিছু কিছু ফজলি আমও বিদেশে রফতানি হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৯০০ টন আম রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজার মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে ৮২১ টন আম রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে ৫২০ টন টন আম গিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয়। তবে বাংলাদেশ আম উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী সমিতির দাবি, এ বছর তারা তিন হাজার টন আম রফতানির আশা করছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ বলছে, উৎপাদিত আম দেশে চাহিদা মেটানোর পরও প্রতি বছর ৭০ শতাংশ উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে, যার সঠিক ব্যবহার ও ভোগব্যয় হচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ এই আম রফতানির সুযোগ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব আম রফতানি করে খুব সহজেই ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডের মতো আম রফতানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, বর্তমানে আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে উঠে এসেছে। তবে বিশ্ববাজারে আম রফতানিকারক অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে- বাংলাদেশের আম যখন পাকে কিংবা রফতানিমুখী হয়, তখন বিশ্বের আম উৎপাদন ও রফতানিকারী অন্য দেশগুলোর তখন এই সক্ষমতা থাকে না। অর্থাৎ আম বাজারজাতের একটা দীর্ঘসময় বাংলাদেশ একক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে।

ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রজাতির আম। প্রাথমিকভাবে রফতানির এই চালানটি গেছে আম উৎপাদনকারী জেলা সাতক্ষীরা থেকে। এ বছরও রফতানির জন্য নতুন অঅরও সাতটি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। যেখান থেকে মৌসুম চলাকালে সপ্তাহে গড়ে ৪ মন আম যুক্তরাজ্যের বাজারে যাবে। দেশটির আম আমদানিকারক চেইনশপ ওয়ালমার্ট দাবি করেছে- আন্তর্জাতিকমান বজায় রেখে যদি বাংলাদেশ আম উৎপাদন করতে পারে, তাহলে শুধু যুক্তরাজ্যেই প্রতি বছর ১ হাজার টন আম রফতানি করার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। এছাড়া চলতি মৌসুমেই বাংলাদেশ থেকে এই আম পর্যায়ক্রমে ইউরোপের অন্য দেশসহ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও নিয়মিত বাণিজ্যিকভিত্তিতে সরবরাহ করা হবে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক হামিদুর রহমান বলেন, এখন দেশের আমচাষীদের বেশিরভাগই একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনে আম উৎপাদন, আহরণ, কেমিক্যাল প্রয়োগ, আহরণ, সংরক্ষণ, প্যাকিং, বাজারজাত ও রফতানি করছে। এর লক্ষ্যে চাষীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে চলতি আমের মৌসুমের প্রথম থেকে বর্তমান বাজারজাত পর্যন্ত সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলকার আমবাগানগুলো সরকারের কঠোর নজরদারির মধ্যে পরিচালিত হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ বিভাগের পরিচালক সৌমেন সাহা যুগান্তরকে বলেন, চলতি মৌসুমে আম রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯০০ টনের মতো।

কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ বিভাগের উপপরিচালক (রফতানি) আনোয়ার হোসেন খান বলেন, দেশে উন্নতজাতের আম উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাত, প্যাকেজিং ও রফতানির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই নীতিমালার আলোকে অ্যাকশন প্ল্যানও গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় দেশের নিবন্ধিত কয়েকটি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে আম উৎপাদন করছে।

জানা গেছে, নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত আম উৎপাদনের সবক্ষেত্রে জিএপি (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস) ও এমআরএল (ম্যাক্সিমাম রেজিডিউয়্যাল লেভেল) পরীক্ষা করাসহ নানা সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১৩৪টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান আম রফতানির উদ্দেশ্যে কৃষি বিভাগের কাছে নিবন্ধন নিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হর্টিকালচার উইং সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে দেশে প্রায় ২০ লাখ টন আম উৎপন্ন হবে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত বছরের মতো এ বছর আম উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।