এক প্রকৃতিপ্রেমীর আদর্শ খামার

উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একটি চমৎকার কৃষিখামার। কি নেই এখানে! মাছ, গাভী, হাঁস-মুরগি, সবজি, সুস্বাদু ফল আর বাহারি ফুলের অপূর্ব সমাহারে গড়ে উঠেছে এ খামার।

এটি জেলার একটি আদর্শ কৃষিখামার। নিজ উদ্যোগে তিলে তিলে গড়ে তোলা ওই খামার দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। নয়ন জুড়ানো এ খামারটি কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার জয়মনিরহাট ইউপির ৬নং ওয়ার্ডের মধ্য বড় খাটামারী গ্রামে অবস্থিত।

বসতবাড়িসহ প্রায় পাঁচ একর পৈতৃক জমিতে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবদুল হামিদ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তুলেছেন এ খামার। ২০০৭ সালে তিনি অবসর নেন। আবদুল হামিদ তাঁর স্বপ্নের খামার গড়ার পরিকল্পনা করতে থাকেন ১৯৯৫ সাল থেকে আর কাজ শুরু করেন ১৯৯৭ সালে।

প্রায় ১৮ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন ধরনের ফলদ, বনজ, মশলা, ঔষধি গাছ ও বাহারি ফুলের বিশাল সম্ভার। দুধ ও ডিমের চাহিদা মেটাতে খামারে রয়েছে ৪টি গাভী আর শতাধিক হাঁস-মুরগি। তিনি ৪ বিঘা জমির খ- খ- পুকুরে বছরজুড়ে মিশ্র প্রজাতির মাছের চাষ করেন।

জমিতে ব্যবহারের জন্য তৈরি করছেন পরিবেশবান্ধব কম্পোস্ট সার। ৪টি গাভীর গোবর ব্যবহারে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বায়োগ্যাস প্লান্ট। খামারের কিছু কিছু অংশে মৌসুমি শাকসবজি চাষ এবং অন্য অংশে কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন। খামারের প্রবেশপথে রয়েছে মাধবীলতা, রঙ্গন, বসুন্ডা, কৃষ্ণচূড়া, বকুল, রাজকণ্ঠ, গাঁদা, দোলনচাঁপা, গোলাপ আর নানা রঙের পাতাবাহারসহ ১২ প্রজাতির ফুলের বাগান।

২৮ ধরনের ফল গাছের মধ্যে রয়েছে কমলা ২০, মাল্টা ২, বিভিন্ন জাতের আম ২০, জামরুল ৩ (২টি আপেল ও ১টি সাদা জাত), লিচু ১৫, লটকন ৭৮৯, সফেদা ২, নারকেল ১৫, করাইচ ফল ১, পেয়ারা ১৫, কাঁঠাল ১৫, তাল ১, আনারস ১৫০০, খেজুর ৫, দুর্লভ প্রজাতির মিষ্টি তেঁতুল ১, ডালিম ৫, গোলাপজাম ১, বিভিন্ন জাতের লেবু ৩৮৪, আমলকী ২, জাম্বুরা ১০, জলপাই ৫, আতাফল ৭, কামরাঙ্গা ৪, চালতা ১০, কুল ৫ এবং ২৫০০টি সুপারি গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য কলাগাছ।

৯ রকমের ঔষধি গাছের তালিকায় আছে শতমূলী, নিশিন্দা, নিম, উলোটকমল, তুলশী, পান, হারবক্স, আমলকী ও পুঁদিনা। রয়েছে মশলা জাতীয় তেজপাতা, দারুচিনি ও লবঙ্গ গাছ। বনজ গাছের তালিকায় আছে শাল, মেহগনি, শিমুল, লম্বু ও পাহাড়ি গামা। খামারে বিভিন্ন গাছের ওপর ঝুলে থাকা গাছ আলু নামক এক ধরনের সবজির দৃশ্য চোখে পড়ার মতো।

গাছে গাছে ঝুলে থাকা অসংখ্য কমলা ও মাল্টা সবার নজর কাড়ে। সুপারি গাছগুলোতে জড়িয়ে থাকা প্রচুর পানপাতা কৌতূহলীদের নজর এড়ায় না। ঘরের চালে ও গাছের ডালে কবুতরের গুম গুম শব্দ আর পুকুরের পানিতে ভেসে বেড়ানো রাজহাঁসের কোলাহল মনকে আন্দোলিত করে। খামারে প্রায় সব ধরনের মৌসুমি শাকসবজির চাষ হয়।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে লাউ, কুমড়া, দুধকচু, বেগুন, শিম, বরবটি, ঝিঙ্গা, বাঁধাকপি, লালশাক, বাটিশাক, ডাঁটাশাক ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে মশলা জাতীয় হলুদ, রসুন, আদা ও পেঁয়াজসহ নানা জাতের মরিচের চাষ। গড়ে বছরের যে কোনো সময় এ খামারে ১২ থেকে ১৫ ধরনের শাকসবজি ও মশলার চাষ হয়।

খামারের হাঁস-মুরগিগুলোকে রোগবালাইমুক্ত রাখতে ভ্যাকসিন প্রয়োগের কাজটি তিনি নিজেই করে থাকেন। দুধেল গাভীগুলোর সঠিক যত্ন ও দুধ দোহনের কাজও তিনিই করেন। এছাড়া অন্য সব কাজ খামারে নিযুক্ত লোকজন করেন। খামার প্রসঙ্গে প্রকৃতিপ্রেমী আবদুল হামিদ বলেন, ‘গাছপালা ঘেরা সবুজ মায়ায় পশুপাখির কলরব আমার ভালো খুব লাগে।

প্রকৃতির প্রতি আজন্ম দুর্বলতা আর অবসর জীবনে কাজের মধ্যে থাকার বাসনা থেকেই আমি খামারটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলাম। শুরু থেকে দুজন লোক বছরজুড়ে এ খামারে কাজ করছেন। এছাড়া সময় সময় ১০-১৫ জন এখানে কাজ করেন। খামারের কবুতর ও রাজহাঁসগুলো বিক্রি করে নতুন ঘর নির্মাণের পর এখানে বেশি কবুতর ও রাজহাঁস আনা হবে।

এছাড়া গাভী, মাছ ও হাঁস-মুরগির সংখ্যা বাড়িয়ে বিরল প্রজাতির আরও কিছু ফলদ, মশলা, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আর তখন সবদিক থেকে লাভজনক এই খামারে আরও কিছু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এভাবেই ধীরে ধীরে আমার শখের খামারটি নানা বৈচিত্র্যময়তার মধ্য দিয়ে এক সময় পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।’

তিনি আরও জানান, ‘সংবাদপত্রের পাশাপাশি আমি ঢাকার কৃষি তথ্য সার্ভিসের ‘মাসিক কৃষিকথা’ নিয়মিত পড়ি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এ খামারটির প্রতি সুদৃষ্টি দিয়ে আসছে। বর্তমান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবদুল আলীম ও শহিদুল ইসলামের সার্বক্ষণিক তৎপরতাও প্রশংসার দাবি রাখে।