মুড়িতে সরগরম ঝাউগড়া

মুড়ি ছাড়া ইফতারি? ভাবাই যেন যায় না! আর হাতেভাজা মুড়ি হলে কথাই নেই। তাই পুরো বছরের চেয়ে রমজান মাসে হাতেভাজা মুড়ির চাহিদা থাকে কয়েকগুণ বেশি। এ চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার ঝাউগড়া গ্রামের নারী-পুরুষ; এমনকি শিশুরাও। তাদের যেন নাওয়া-খাওয়ারও সময় নেই। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মুড়ি ভাজার ধুম। প্রতিদিন এই গ্রাম থেকে বিক্রি হচ্ছে শত মণ হাতেভাজা মুড়ি। যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
জানা গেছে, প্রায় ৪০ বছর আগে শ্রী বিকাশ চন্দ্র দাস নামে এক ব্যক্তি এই গাঁয়ে প্রথম ঘরোয়াভাবে হাতেভাজা মুড়ির ব্যবসা শুরু করেন। স্থানীয় পর্যায়ে এর চাহিদা থাকায় তার দেখাদেখি অনেকেই ধীরে ধীরে এ পেশায় জড়িত হন। এ এলাকার মুড়ি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন ট্রাকে ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছেন মুড়ির পাইকাররা। মুড়ি ভাজার কাজ করে এ গ্রামের প্রায় শতাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। এ পেশা বদলে দিয়েছে গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর ভাগ্য। একসময়ের অভাবের সংসারে উঁকি দিয়েছে সুখের সূর্য। মুড়ি ভেজে পুরুষের পাশাপাশি প্রত্যন্ত এ গ্রামাঞ্চলের অবহেলিত নারীরাও খোঁজে পেয়েছেন পথ চলার নতুন প্রেরণা। এ কাজ করে তাদের সংসারে সচ্ছলতার ভিত গড়েছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত ঝাউগড়া গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মুড়ি ভাজার ধুম। নারীরা মুড়ি ভাজছেন, সাহায্য করছেন গৃহকর্তারা। ছোট্টরাও বসে নেই। বড়দের পাশাপাশি তারাও কাজে হাত লাগাচ্ছেন। আয় করছেন বাড়তি টাকা। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন চাল, লাকড়ি নিয়ে মুড়ি ভাজার জন্য এ গ্রামে ভিড় করছেন। দেখা গেছে, কেউ মুড়ির চাল পানি দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছেন, কেউ গরম বালিতে চাল ঢেলে দিচ্ছেন, কেউ কাঠি দিয়ে নাড়াচাড়া করে চালনিতে ঢালচ্ছেন। এইভাবে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে মুড়ি ভাজার মহাকর্মযজ্ঞ।
শ্রী বিকাশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমি প্রায় ৪০ বছর ধইরা মুড়ি ভাজার কাজ করতাছি। এই কাজে বেশি টেহ্যার দরকার হয় না। বিভিন্ন গেরামের মানুষ চাইল, খড়ি নিয়ে আসেন, আমি ও আমার পরিবারের লোকজন মুড়ি ভাইজ্জা দেই।’ তিনি আরও বলেন, ৫০ কেজির এক বস্তা মুড়ি ভাজতে তাকে খরচ দিতে হয় ৩৫০ টাকা। তিনি দিনে ২০০ কেজি চালের মুড়ি ভাজতে পারেন। এ আয় দিয়েই তার ৯ সদস্যের পরিবার বেশ ভালো চলছে। এরই মধ্যে তিনি দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন।বাড়িতে পিড়া পাকা একটি ঘর দিয়েছেন। ভবিষ্যতের জন্য তিনি কিছু সঞ্চয়ও করছেন। তাপসি নারী দাস বলেন, আগে স্বামীর আয়ের ওপর তাদের নির্ভর করতে হলেও বর্তমানে তারা নিজেরাই বাড়িতে মুড়ি ভাজার কাজ করে বাড়তি আয় করছেন। একটা সময় ছিল গৃহস্থালি কাজের বাইরে তাদের তেমন কোনো কাজ ছিল না। অনেকটা অসল সময় কাটাতে হতো তাদের। রোজার মাসে হাতেভাজা মুড়ির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কাজের ব্যস্ততায় এখন যেন তাদের নাওয়া-খাওয়ারও সময় নেই।
শ্রী লক্ষ্মণ চন্দ্র দাস বলেন, তাদের মুড়িতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। স্বাদ বাড়াতে রসুন ও লবণ মিশ্রিত পানির ব্যবহার হয়ে থাকে। ১ কেজি চালে ৭ গ্রাম মুড়ি হয়ে থাকে। ১ কেজি মুড়ি ভাজায় খরচ পড়ে ৬০ টাকা। দুইজন কারিগর প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ কেজি মুড়ি ভাজতে পারেন। বর্তমানে এ গ্রামের প্রায় শতাধিক সনাতন পরিবার মুড়ি ভাজার কাজে জড়িয়ে পড়েছে। পাইকারি মুড়ি বিক্রেতা শ্রী কালিদাস বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। গ্রাম ঘুরে ঘুরে মুড়ি কিনে কালিদাস বিভিন্ন স্থানে ফেরি করে বিক্রি করেন। বাজারে প্রতি কেজি মুড়ি খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১২০ টাকায়। এ মুড়ির চাহিদাও বেশি।