বাংলাদেশের সম্ভাবনা উন্নয়ন

প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশ সফরে দেশটির বেশ কিছু অর্থনৈতিক উন্নয়ন আমার চোখে পড়েছে। ঢাকার অভিজাত এলাকায় অনেক বিপণিবিতান ও বুটিকের অসাধারণ ডিজাইন দেখেছি, একটি হিজাব বুটিকও দেখা গেছে। সড়কগুলো বড় গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ও ছোট গাড়িতে পরিপূর্ণ, যেগুলোতে প্রস্ফুটিত হচ্ছে বিভাজনের চিত্র। হয়তো কেউ উচ্চবিত্ত আবার কেউ নিম্নমধ্যবিত্ত। রিয়েল স্টেটের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বাড়ি মালিকরা রাতারাতি ধনী হয়ে যাচ্ছে, এতে আয় বৈষম্যও বাড়ছে। জায়গা-জমিহীন মানুষ গরিবই থাকছে। পুরনো অনেক বাড়ি চোখ ধাঁধানো আধুনিক গ্গ্নাস ও স্টিলের শপিংমলে রূপান্তরিত হয়েছে। ভালো দাম পেয়ে অনেক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর কাছে জমি বিক্রি করে দিচ্ছে।

প্রায় ১৬ কোটি মানুষের নদীমাতৃক ব-দ্বীপ বাংলাদেশের মাটি উর্বর, যদিও সাইক্লোন ও বন্যা এখানকার নিত্যদিনের ব্যাপার। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও কর্মঠ মানুষ বিশেষত নারীর কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬.৫-এ দাঁড়িয়েছে। আগের চেয়ে রাস্তাঘাটে অধিক পরিমাণে নারী হিজাব ও বোরকা পরিধান করে। তবে সালোয়ার-কামিজ পরিধান করে একাকী কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার চিত্রও দৃশ্যমান। তারা বিপণিবিতান, ব্যাংক, অফিস, হোটেল ইত্যাদিতে কাজ করে। বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি ৫৮ শতাংশ। ভারতে যা ২৭ শতাংশ। পুরুষের তুলনায় আয় কম হলেও নিজস্ব আয় তাদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করছে।

পোশাক শিল্পে নারীদের বিপুল প্রাধান্য। বিদ্যুতের কারণে এ শিল্প আরও ভালো অবস্থানে রয়েছে। দেশে উৎপাদন বেড়েছে। কলঙ্কিত রানা প্লাজা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ার ফলে জেনারেটরের ভাইব্রেশনের কারণেই ধসে গেছে। এখন ভারত থেকেও যাচ্ছে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

পোশাক খাতসহ বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প খুব দ্রুত বর্ধিত হচ্ছে। চীনের পর এটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার মসলিন ছিল বিশ্ববিখ্যাত। কিন্তু মসলিন উৎপাদন ধ্বংসের জন্য ব্রিটিশরা ল্যাঙ্কাশায়ার ও ম্যানচেস্টার থেকে নিম্নমানের মেশিনে তৈরি পোশাক এনে ভারতের বাজার প্লাবিত করে। আজ বাংলাদেশের টেক্সটাইল আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জিএসপির আওতায় ইউরোপের বাজারে প্রবেশে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনে অগি্নকাণ্ডের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৩ সালে জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। যদিও তারা এখনও জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দেয়নি। কিন্তু রফতানি বাড়ছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টে রফতানির পরিমাণ ২০১৫ সালের হিসাবে ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ভারতের চেয়েও বেশি।

ইপিজেডে বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশ নানা সুবিধা দিয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে ১০ বছরের কর অবকাশ, বিদেশি শ্রমিককে বেতন দিতে বেতনের ওপর তিন বছরের জন্য আয়কর অব্যাহতি এবং কর অবকাশকালীন সময়ে ডিভিডেন্ড ট্যাক্স হতে অব্যাহতি। বিদেশি বিনিয়োগ আসছে (২০১৫ সালে যার পরিমাণ ১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), বিশেষত সৌদি আরব গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ ও যানবাহনে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। আর আরব আমিরাত (ইউএই) শিপ বিল্ডিংয়ে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী।

শিপ বিল্ডিং ও শিপ ব্রেকিং শিল্পে ভালো উন্নতি ঘটছে। বাংলাদেশের রয়েছে সবচেয়ে বড় শিপ ব্রেকিং শিল্প। কেবল চট্টগ্রামে দুই লাখের ওপর কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছে। শিপ ব্রেকিংয়ের একটি পার্শ্ব পণ্য হচ্ছে ক্ষুদ্র ইস্পাত। যেখান থেকে বাংলাদেশের শিল্পে প্রয়োজনীয় স্টিলের প্রায় অর্ধেকই সরবরাহ করা হয়।

বিমানবন্দরে আগের মতোই আমি দেখতে পেলাম শত শত বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত সৌদি আরব যাচ্ছে (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান সৌদি সফরে জানা যাচ্ছে, তারা আরও ৫ লাখ শ্রমিক নিতে আগ্রহী)। বাংলাদেশি পাচক বিশ্বব্যাপী পাওয়া যাচ্ছে। কারণ তারা ইতালিয়ান, আমেরিকান, চাইনিজ বা ফ্রেন্স ডিশ সহজেই তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হওয়া থেকে কিছুই বাধা দিয়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ মানব উন্নয়ন সূচকে উন্নতি করেছে। একটি ছোট দেশ হিসেবে এবং ভারতের তুলনায় ভাষা ও ধর্মের দিক থেকে অধিক সমপ্রকৃতির হওয়ায় এখানে সামাজিক কর্মসূচিগুলো সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। অনেক শিক্ষিত নারী করপোরেট জব করার চেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা ও নারীর স্বাস্থ্যের জন্য গ্রামে এনজিওতে কাজ করছেন। বাংলাদেশে মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও দরদি মনোভাব ভারতের চেয়েও বেশি। এর কারণ হয়তো ভারতের মতো জাতি-বর্ণগতভাবে বাংলাদেশ বিভক্ত নয়।

মোবাইল ফোন সেখানে ক্ষুদ্রঋণে সহায়তা করছে। ফলে গ্রামাঞ্চলে অনেক উদ্যোগ গড়ে উঠছে। ইসলামী ব্যাংকের মতো বেসরকারি ব্যাংক অন্য পাবলিক ব্যাংকের তুলনায় অধিক পরিমাণে ছোট ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে।

তবে অবশ্যই অন্যদিকে ঢাকায় রয়েছে অস্বস্তিকর ট্যাফিক জ্যাম, যা যে কারও মাথা ধরিয়ে দিতে পারে। জ্যাম শেষ হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টাও লেগে যায়। বড় শহরগুলোতে জ্যাম দম বন্ধ করে দেয়। সেখানে উদার ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে অসহনশীলতাও বাড়ছে।

বাংলাদেশে অবকাঠামোতে গণবিনিয়োগ বাড়ানো খুব দরকার, যদিও তা বাড়ছে। অধিকসংখ্যক ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল ও হাইওয়ের ঢাকা হতে পারে আরেক ব্যাংকক। ভারতের মতো দুর্নীতি সেখান একটা সমস্যা। তা কমছে বটে। তার সুফল গরিবই পাবে।

বাংলাদেশের সমৃদ্ধি কেবল ভারতের পণ্য ও কাজের চাহিদার জন্য সহায়ক হবে। কাজ বাড়লে শ্রমিকদের বাইরে যাওয়াও কমবে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আসিয়ানের অংশ হতে পারে। ভারতেরও ব্যাপারটি মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ দ্রুতই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে। আমাদের একেবারে প্রতিবেশী দেশটিকে একটি সম্ভাব্য অভিবাসী দেশ হিসেবে আচরণ না করে তাকে ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে নিতে হবে। ভারতের বিনিয়োগকারীরা এর কম খরচে শ্রমের সুবিধাও নিতে পারেন।