ঘূর্ণায়মান ঋণ প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন তাঁতিরা

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের আলেফ উদ্দিন ৩০ বছর ধরে বংশীয় পেশা তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। বাজারে তাঁতপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় তাঁদের পরিবার কিছুটা বিপাকে পড়ে যায়। এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা ছিল আর্থিক অনটন। অবশেষে সরকারি তাঁত বোর্ডের দেওয়া ঘূর্ণায়মান কম সুদের ঋণ নিয়ে আলেফ উদ্দিন এখন স্বাবলম্বী। তিন বছর আগে নেওয়া এক লাখ টাকার পুঁজি নিয়ে একটি ছোট ব্যবসা দাঁড় করাতে সক্ষম হন। তিনি শাহজাদপুর থেকেও এখন ঢাকাসহ সারা দেশে তাঁতপণ্য বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। এভাবে দেশের অনেক তাঁতিই সরকারি ঘূর্ণায়মান ঋণ প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করেছেন। তাঁতিদের উন্নয়নে অর্থায়নের পাশাপাশি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে তাঁতিদের।

হস্তচালিত তাঁতে উত্পাদিত কাপড় বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। হস্তচালিত তাঁতশিল্প বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কুটির শিল্প। এই শিল্প রক্ষায় তাঁতিদের সহযোগিতায় ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ করাসহ তাঁতশিল্পের আধুনিকায়ন, অচালু তাঁত চালুকরণ এবং তাঁতিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এসব প্রকল্পে তাঁতপ্রতি ঋণসীমা বৃদ্ধি, গ্রুপ পদ্ধতি সহজীকরণ, বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে ১৯৯৮ সালে পাঁচ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তাঁতিদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের বিতরণ করা টাকায় অর্জিত সুদ থেকে ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে ঋণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত কর্মসূচির আওতায় ৪১ হাজার ৩২৪ জন তাঁতিকে ৫৬ হাজার ৬২৫টি তাঁতের অনুকূলে ৬৪ কোটি ৭১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। সরকার প্রদত্ত টাকার মধ্যে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৩৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের সুরক্ষা ও প্রসারের জন্য ৩৮.৩৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তাঁতবস্ত্রের উন্নয়নে ফ্যাশন ডিজাইন, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও একটি বেসিক সেন্টার স্থাপন প্রকল্প, ৩২.৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদ্যমান বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, মাধবদী, নরসিংদীর বিএমআরইকরণ এবং ৫০.৫৩৯ কোটি টাকা বিনিয়োগে দেশের তাঁত অধ্যুষিত এলাকায় তিনটি সার্ভিস সেন্টার স্থাপনসহ তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সুতা ও রং আমদানির ক্ষেত্রে তাঁতিদের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে দেশের তাঁতি সমিতিগুলোকে তাদের ব্যবহার্য কিছু উপকরণে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত শুল্ক ও সমুদয় মূল্য সংযোজন কর মওকুফ করে আমদানির সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি টেক্সটাইল মিলগুলোর উত্পাদিত সুতা বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের নিবন্ধিত প্রাথমিক তাঁতি সমিতির চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক হাজার ৩৩৬ জন তাঁতিকে তিন হাজার ৪৫৬টি তাঁতের অনুকূলে ৪.৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড় তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড কর্তৃক ৯.৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, ‘তাঁতিসমাজকে পুনর্বাসন করতে এই সরকার বদ্ধপরিকর। তাঁতিদের কল্যাণে আরো যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক।’ তিনি বলেন, ‘তাঁত পেশা হারিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। তাদের সমৃদ্ধ করা হবে, যার মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নপূরণ সম্ভব হবে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৩ সালের তথ্য অনুযায়ী এই শিল্পে নিয়োজিত জনবলের সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। তাঁতশিল্পে বছরে ৬৮.৭ কোটি মিটার কাপড় উত্পাদিত হয়, যা দেশের মোট বস্ত্র চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণ করে।

তাঁতিদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ একটি সফল কর্মসূচি উল্লেখ করে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, বর্তমান ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ করাসহ ‘তাঁতশিল্পের আধুনিকায়ন, অচালু তাঁত চালুকরণ এবং তাঁতিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁতপ্রতি ঋণসীমা বৃদ্ধি, গ্রুপ পদ্ধতি সহজীকরণ, বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এ প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ বস্ত্রের জোগান দিয়ে থাকে হস্তচালিত তাঁতশিল্প। সমাজের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাঁতের উত্পাদিত পণ্যকে খাপ খাইয়ে নিতে পারলে আধুনিক সমাজেও তাঁতবস্ত্রের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ধরে রাখার বিকল্প নেই। সরকার এরই মধ্যে তাঁতিদের শুল্কমুক্তভাবে সুতা, রং ও রাসায়নিক আমদানির সুযোগ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে এই শিল্পের উন্নয়নে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি নতুন প্রকল্প গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় তাঁতি সম্প্রদায়ের ভাগ্য উন্নয়ন, শিল্পের বিকাশ এবং তাঁতশিল্পকে টেকসই করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডে তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে, এডিপির আওতায় অননুমোদিত নতুন প্রকল্প হিসেবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছয়টি এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আটটি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই প্রকল্পগুলো অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হলে তাঁতশিল্পের উন্নয়নের দ্বার আরো উন্মুক্ত ও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।