পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬৫% উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা

অর্থায়ন জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে সহসাই উৎপাদনে আসতে পারছে না পাইপলাইনে থাকা নতুন বিদ্যুেকন্দ্র। ফলে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পেতে অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। এ অবস্থায় পুরনো ও অদক্ষ বিদ্যুেকন্দ্র সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে সরকার।

জানা গেছে, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বাড়বে প্রায় ৬৫ শতাংশ। বর্তমানে এসব কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, যা সংস্কার-পরবর্তীতে বেড়ে দাঁড়াবে ২ হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াটে।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জমি অধিগ্রহণ জটিলতা। এতে অনেক সময় এক-দুই বছর লেগে যায়। এছাড়া অর্থায়নও আরেকটি চ্যালেঞ্জ। ফলে বড় কেন্দ্রগুলোয় উৎপাদন শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। এ কারণে পুরনো বিদ্যুেকন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

সংস্কার পরিকল্পনার মধ্যে থাকা বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর একটি হলো ঘোড়াশাল এসটি, পঞ্চম ইউনিট। বর্তমানে বিদ্যুেকন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা ১৯০ মেগাওয়াট। সংস্কারের পর তা ২১০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। আগামী মাসে কেন্দ্রটি ওভারহলিং করা হবে বলে জানা গেছে।

উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনায় থাকা আরেক বিদ্যুেকন্দ্র হলো চট্টগ্রাম (রাউজান) এসটির দ্বিতীয় ইউনিট। কেন্দ্রটির বর্তমান উৎপাদনক্ষমতা ১৮০ মেগাওয়াট, যা সংস্কারের পর ২১০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। এরই মধ্যে বিদ্যুেকন্দ্রটির ওভারহলিং সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে ২১০ মেগাওয়াট সিদ্ধিরগঞ্জ এসটির ওভারহলিং ও নতুন জেনারেটর স্থাপনকাজের দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্রটির বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ১৫০ মেগাওয়াট, যা সংস্কারের পর হবে ২০০ মেগাওয়াট।

একইভাবে বড়পুকুরিয়া এসটির কয়লাভিত্তিক প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের ওভারহলিং কাজের দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদনও অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যুেকন্দ্র দুটির প্রত্যেকটির বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ মেগাওয়াট, যা সংস্কারের পর ১২০ মেগাওয়াটে পৌঁছবে।

ঘোড়াশাল এসটির তৃতীয় ইউনিটের (রি-পাওয়ারিং) বর্তমান ক্ষমতা ১৮০ মেগাওয়াট, যা সংস্কারের পর হবে ৪১৬ মেগাওয়াট। এটি মেরামতের জন্য ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলা প্রক্রিয়াধীন।

ঘোড়াশাল এসটির চতুর্থ ইউনিটের (রি-পাওয়ারিং) বর্তমান ক্ষমতা ১৮০ মেগাওয়াট। সংস্কারের পর এটিও ৪১৬ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। কেন্দ্রটি মেরামতের জন্য নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড ইস্যু করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়াধীন।

বিশ্ববাংকের অর্থায়নে পরামর্শক নিয়োগের মূল্যায়ন চলছে ঘোড়াশাল এসটির ষষ্ঠ ইউনিটের (রি-পাওয়ারিং) জন্য। কেন্দ্রটির বর্তমান ক্ষমতা ১৯০ মেগাওয়াট, যা সংস্কারের পর হবে ৪১৬ মেগাওয়াট।

বাঘাবাড়ী ১০০ মেগাওয়াট জিটি (সিম্পল সাইকেল) কেন্দ্রটির কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তরে এরই মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে। কেন্দ্রটির বর্তমান উৎপাদনক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট, যা সংস্কারের পর হবে ১৫০ মেগাওয়াট।

শাহজিবাজার ৭০ মেগাওয়াট জিটি (সিম্পল সাইকেল) কেন্দ্রটিকে কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর করা হবে। এক্ষেত্রেও ঋণ দিচ্ছে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এজন্য চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। কেন্দ্রটির বর্তমান ক্ষমতা ৭০ মেগাওয়াট, যা সংস্কারের পর হবে ১০৫ মেগাওয়াট।

একইভাবে কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর করা হবে সিলেট ১৫০ মেগাওয়াট জিটি (সিম্পল সাইকেল) কেন্দ্রটি। এ কাজে অর্থায়নের জন্য আইডিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কেন্দ্রটির বর্তমান ক্ষমতা ১৫০ মেগাওয়াট, যা সংস্কারের পর হবে ২২৫ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে ৯ হাজার ৩৬১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩১টি বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণাধীন এবং ৫ হাজার ৮৯২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন। নির্মাণাধীন বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের কাজ একেবারেই প্রাথমিক অবস্থায় আছে। বাকিগুলোর অগ্রগতিও ধীর। ফলে নির্ধারিত সময়ে এসব কেন্দ্রের কোনোটিই উৎপাদনে আসতে পারছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি পুরনো ও অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতাসম্পন্ন বিদ্যুেকন্দ্রগুলোকে চালু রাখা হয়েছে। এছাড়া বাস্তবতার নিরিখে লোড কেন্দ্র বিবেচনায় গুণগত ভোল্টেজ অথবা ফ্রিকোয়েন্সি বজায় রাখার তাগিদে কিছু-সংখ্যক পুরনো বিদ্যুেকন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

অত্যধিক ব্যয়সম্পন্ন বিদ্যুেকন্দ্রগুলোকে আধুনিক করে রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে বেশকিছু কার্যক্রম নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এর মধ্যে আছে পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় ধরনের ওভারহলিং। এছাড়া কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে রি-পাওয়ারিং কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে বিদ্যমান দক্ষতা ২৯ থেকে প্রায় ৫৪ শতাংশে উন্নীত করা যাবে। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে গ্যাস টারবাইন প্রযুক্তির বিদ্যুেকন্দ্রকে কম্বাইন্ড সাইকেল কেন্দ্রে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদ্যমান দক্ষতা ৩৪-৩৫ থেকে ৪৮-৪৯ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আধুনিকায়নের লক্ষ্যে পরিচালন পদ্ধতির আপগ্রেডেশন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যুেকন্দ্রগুলো সংরক্ষণের জন্য যথাযথ অনুসূচি প্রণয়ন করে তা অনুসরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগও রয়েছে।