স্বপ্নের দেশ

আমি খুব আশাবাদী মানুষ। আমার আশাবাদ কোন পর্যায়ের সেটা বোঝানোর জন্য আমি সব সময় একটা বাচ্চা ছেলের গল্প বলে থাকি। সেই বাচ্চাটাও খুব আশাবাদী ছিল এবং এ কারণে তার কখনোই মন খারাপ হতো না। সব সময়ই সে হাসিখুশি থাকত, নতুন নতুন বিষয় নিয়ে স্বপ্ন দেখত। তার বাবা-মা সেটা নিয়ে এক ধরনের দুশ্চিন্তায় ভুগতেন। তারা ভাবতেন, বাচ্চাটার জীবনে খানিকটা দুর্ভোগ আছে। সে যখন বড় হবে তখন সে আবিষ্কার করবে যে জীবনের সবকিছুই আনন্দময় নয়। সেখানে হতাশা আছে, ব্যর্থতা আছে; তখন তার নিশ্চয় খুব আশাভঙ্গ হবে। তাই তারা ঠিক করলেন, এখনই তাকে সে সম্পর্কে ধারণা দেবেন। তাই একদিন বাচ্চাটা যখন স্কুলে যায়, বাবা-মা তখন রাস্তা থেকে ঘোড়ার গোবর এনে তার ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য খুবই সহজ- বাচ্চাটা যখন ঘরে আসবে, সেখানে গোবর দেখে তার পিলে চমকে উঠবে। সেই গোবর পরিষ্কার করতে করতে তার জীবনটা বের হয়ে যাবে এবং সত্যিকার জীবন যে কত কঠিন হতে পারে, সে সম্পর্কে একটা ধারণা হবে। বাবা-মা বাচ্চাটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন। সত্যি সত্যি ছোট বাচ্চাটা স্কুল থেকে ফিরে এলো, নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল এবং তার ঘরের মধ্যে ঘোড়ার গোবর দেখে সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। বলল, ‘আমার ঘরে ঘোড়ার গোবর! তার মানে ঘোড়াটা নিশ্চয় আশপাশে আছে! কী মজা!’

আমিও ছোট বাচ্চার মতো জীবনের অনেক সময়ই আনন্দে চিৎকার করে ঘোড়ার খোঁজ করেছি এবং বলতে দ্বিধা নেই, অনেক সময় সত্যি সত্যি ঘোড়া খুঁজে পেয়েছি। যখন পাইনি, তখনও খুব ক্ষতি হয়নি; খুঁজে পাব- সেই আনন্দেই সময়টা বেশ কেটে গেছে।

আমার ধারণা, শুধু আমি নই; আমার প্রজন্মের প্রায় সবাই এ রকম আশাবাদী মানুষ। তার একটা কারণ রয়েছে। সেটা হচ্ছে ১৯৭১। আমরা এ সময়টার ভেতর দিয়ে এসেছি। যারা এ সময়টার ভেতর দিয়ে এসেছে, তারা অন্য রকম মানুষ হতে বাধ্য। তার কারণটা খুব সহজ।

আমরা ঊনসত্তরে একটা গণ-আন্দোলনকে দানা বাঁধতে দেখেছি; তখন দেশটা ছিল পাকিস্তান। আমরা যে অংশে থাকতাম, সেটার নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে বৈষম্য থেকে উদ্ধার করার জন্য বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ইতিহাসে সেই স্বপ্নটার নাম হচ্ছে ‘ছয় দফা’। সেই ছয় দফার স্বপ্ন দেখে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তাকে এমনভাবে জয়ী করেছিল যে, তার সারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কখনও সেটা হতে দিতে প্রস্তুত ছিল না। যখন তারা সেটা প্রকাশ করে ফেলল, তখন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা এমন একটা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল, যার কোনো তুলনা নেই। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে সারা পূর্ব পাকিস্তান অচল হয়ে পড়েছিল। ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ দেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তারা এ দেশে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল তার কোনো তুলনা নেই।

আমাদের প্রজন্ম সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ দেখেছে; কী অচিন্তনীয় নিষ্ঠুরতায় মানুষকে হত্যা করা যায়, আমরা সেটা জানি। আমাদের প্রজন্মের একটি মানুষও নেই- ১৯৭১ সালে যার কোনো প্রিয়জন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে মারা যায়নি। তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি। সেই সাত কোটির এক কোটি মানুষই শরণার্থী হয়ে পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই এক কোটি মানুষকে যে কী অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, তা কল্পনাও করা সম্ভব নয়!

সেই ভয়ঙ্কর দুঃসময়ে কিন্তু এ দেশের মানুষ ছিল সোনার মতো খাঁটি। দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য এ দেশের সোনার ছেলেরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, আর তাদের বুক আগলে রক্ষা করেছে এ দেশের মানুষ। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে এ দেশের তরুণরা অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। ৯ মাসের মধ্যে দিশেহারা পাকিস্তান কী করবে বুঝতে পারছিল না। তাই ডিসেম্বরের চূড়ান্ত আঘাতের সময় তারা কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করেছিল।

আমাদের প্রজন্ম স্বাধিকারের জন্য আন্দোলন দেখেছে, নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেখেছে, স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ দেখেছে, বীরত্ব দেখেছে এবং সবশেষে বিজয় অর্জন করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে দেখেছে। এই জীবনে যারা এত কিছু দেখতে পারে, তাদের মতো সৌভাগ্যবান আর কে আছে? তাই আমাদের প্রজন্ম কখনও আশাহত হয় না, কখনও স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায় না। আমাদের প্রজন্ম জানে- এই বাঙালির মতো অসাধারণ জাতি পৃথিবীতে দ্বিতীয়টা নেই। যখন প্রয়োজন হয়েছিল, তখন তারা এ দেশের জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগটি করেছে। আমাদের প্রজন্ম তাই এত আশাবাদী; আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে এত নিশ্চিতভাবে স্বপ্ন দেখতে পারি।

আমাদের নতুন প্রজন্ম একাত্তরের সেই ভয়াবহ দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে যায়নি। এ দেশের মানুষ তাদের ভেতর যে অসাধারণ একটা ভালোবাসা লুকিয়ে রাখতে পারে- তারা সেটা জানার সুযোগ পায়নি। দেশকে তীব্রভাবে ভালোবাসার মধ্যে যে একটা অভূতপূর্ব আনন্দ লুকিয়ে আছে- তারা সেটাও জানে না। সে জন্য আমি যখনই সুযোগ পাই, আমাদের এ নতুন প্রজন্মকে অনুরোধ করি, তারা যেন বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসটুকু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। তারা যখন জানবে যে তারা কত বড় একটা জাতির অংশ, তখন শুধু যে তাদের বুক গর্বে ফুলে উঠবে, তা নয়; দেশের জন্য গভীর মমতায় তাদের বুক ভরে উঠবে।

কয়েক বছর আগে আমি একবার বাসে করে বগুড়া যাচ্ছি। আমি বগুড়া জিলা স্কুলের ছাত্র। এ স্কুলের ১৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সেখানে বিশাল আয়োজন করা হচ্ছে। আমি সেই আনন্দে অংশ নিতে রওনা দিয়েছি। মাঝপথে এক জায়গায় বাস থেমেছে। তখন একজন মা আমার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, “আমার ছোট মেয়ে আপনাকে দেখিয়ে বলেছে, ‘ওই যে পাকা চুলের বুড়ো মানুষটি দেখছ, সে হচ্ছে মুহম্মদ জাফর ইকবাল’!” আমি শিশু-কিশোরদের জন্য একটু লেখালেখি করি, সে জন্য অনেক সময় পথেঘাটে তারা আমাকে চিনে ফেলে, সেটা সত্যি; কিন্তু এর আগে কেউ ‘পাকা চুলের বুড়ো মানুষ’ বলে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। পরিচয়টা নিয়ে আমি আহ্লাদিত না হতে পারি, কিন্তু কেমন করে অস্বীকার করি- আমার বয়স অর্ধশত বছর পার হয়েছে এবং আমার চুলে আসলেই পাক ধরেছে?

যা-ই হোক, আমি সময়মতো বগুড়া জিলা স্কুলে পেঁৗছেছি। সেখানকার বিশাল আয়োজন আমি ঘুরে ঘুরে দেখছি। তখন চোখে পড়ল মাঠের এক কোনায় একটা ছোট প্যান্ডেলের মতো করা হয়েছে। সেখানে লেখা ‘বগুড়া জিলা স্কুলের শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা।’ আমি সেদিকে এগিয়ে গিয়ে ভেতরে ঢুকেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম। ভেতরের দেয়ালে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে এবং আমার মনে হচ্ছে, তারা সবাই সেই দেয়ালের ছবি হয়ে আমার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তারা সবাই আমার স্কুলজীবনের বন্ধু; আমার সমবয়সী। আমি মাসুদকে দেখলাম, পাইকারকে দেখলাম, টিটুকে দেখলাম। আমরা একসঙ্গে গল্প করেছি, খেলাধুলা করেছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, স্কুলের বারান্দায় বসে কিংবা শুয়ে আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনা করেছি। বড় হয়ে কী করব আমরা, তার কল্পনা করেছি। আমি এই পূর্ণ বয়সে সেই কল্পনায় যা চেয়েছিলাম, তার সবকিছু অর্জন করে ফেলেছি। আমার এখন বয়স হয়েছে, চুলে পাক ধরেছে; কিন্তু আমার শৈশবের বন্ধুদের কারও বয়স বাড়েনি। কৈশোরে এসে তাদের বয়স থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। তারা আর কোনোদিন সেই বয়স থেকে বড় হতে পারবে না। আমার মনে হলো, আমার বন্ধুরা সবাই তীব্র দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হলো, তারা আমাকে বলছে- ‘যে দেশটার জন্য সেই কৈশোরে আমরা প্রাণ দিয়েছি, তোমরা কি সেই দেশটাকে আমাদের স্বপ্নের দেশ তৈরি করতে পেরেছ?’

আমি জানি, আমরা এখনও আমার সেই বন্ধুদের স্বপ্নের দেশ তৈরি করতে পারিনি। কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই পারব। কারণ, তা না হলে আমাদের সেই রক্তের ঋণ শোধ হবে না।

আমি নতুন প্রজন্মকে শুধু সেই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।