শান্তি মিশনে বাংলাদেশের নারী পুলিশ

লেখক :জয়িতা শিল্পী এডিসি, ক্রাইম কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সেন্টার, ডিএমপি এবং ব্যানএফপিইউ-১, রোটেশন-৭, কিনসাসা, ডিআর কঙ্গো ফেরত

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। শুধু অংশগ্রহণ নয়, প্রথম থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের সাফল্য ও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। গর্বিত এ দলের সদস্য ছিলাম আমিও। নারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে বলছি, একজন নারী যখন পুলিশ হয় তখন তাকে দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে হয়। এর কোনো বিকল্প হয় না। নারীকে তার পরিবার বা সংসার যেমন সামলাতে হয় তেমনি কর্মক্ষেত্রেও ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করতে হয়। নারীকে পরিবার পরিজনসহ সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে সকল দিক ম্যানেজ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটাই সবচেয়ে কঠিন। পুরুষের ক্ষেত্রে যদিওবা একই বিষয় প্রযোজ্য তবু বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে মেয়েদেরকেই সন্তান লালন-পালন এবং তাদের দেখাশুনার বিষয়গুলো প্রায় শতভাগ সামলাতে হয়। সেক্ষেত্রে একজন নারী কর্মকর্তা নয়, একজন মা হিসেবে সন্তানকে সাময়িক বিচ্ছিন্ন করে চাকরি করা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে অনেকগুলো  ফ্যাক্টর জড়িত। প্রথমত, সন্তানের দেখাশুনার ভার, লেখাপড়া এবং স্কুলে পাঠানো। এছাড়া মায়ের অনুপস্থিতিতে শূন্যতা পূরণ, সঠিক ভাবে সন্তানের বেড়ে ওঠা সবকিছু মিলিয়ে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। এরপরও থাকে বাড়তি টেনশন যেমন- স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি তাদের সমর্থন থাকবে কিনা সন্তানকে দেখাশুনার ভার কার উপরে ন্যস্ত করা হবে, এক বছরের খরচাপাতি কে বহন করবে ইত্যাদি। মনে হতে পারে এগুলো খুবই ছোট বিষয় যা ধর্তব্য নয়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এগুলোই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।

 

বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করি। ব্যানএফপিইউ-১ এ আমরা কিনসাসা, ডিআর কঙ্গোতে ছিলাম ১২৫ জনের একটি কন্টিনজেন্ট। তার মধ্যে ৭২ জন মহিলা সদস্য এবং ৫৩ জন পুরুষ সদস্য। এই ৭২ জনের মধ্যে ৯ জন কমান্ডিং স্টাফসহ মোট অফিসার ৩৬ জন এবং বাকি ৩৬ জন মহিলা কনস্টেবল।

 

পর্যালোচনায় দেখা যায়, এদের মধ্যে মাত্র ২% আছে যারা স্বামী এবং অভিভাবকের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশনে এসেছেন। বাকিরা এসেছেন নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে অর্থাত্ নানান প্রতিকূলতা মেনে নিয়ে। এদের মাঝে ৪% সদস্য তাদের সন্তানকে স্বামীর বা শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে রেখে এসেছেন, বাকিরা সন্তানকে মায়ের কাছে (সন্তানের নানা বাড়ি) রেখে এসেছেন। (উল্লেখ্য এই হিসেবের মধ্যে যারা বিবাহিত নন এ রকম ৫% জনও রয়েছে।) একজন নারী কর্মক্ষেত্রে কতটা স্বাধীন তার থেকে বড় প্রশ্ন সে পরিবারে কতটা স্বাধীন ? নারী কি নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে এবং পরিবারিক সমস্যা সমাধানে নারীকে পরিবারের অন্য সদস্যরা কতটুকু সহায়তা করছে ? উল্টো চিত্রটাই বেশি। কিন্তু আশার কথা সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আমাদের নারীরা এগিয়েছে অনেকখানি। নিজের মতামত প্রকাশ করার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার স্বাধীনতা এবং সক্ষমতা তৈরি হয়েছে এটা পজিটিভ বিষয়।

 

অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথায় যদি আসি তাহলে বলতে হয়, নারীরা অর্থ উপার্জন করছে তা কি সে স্বাধীনভাবে খরচ করতে পারছে ? মেয়েরা বিয়ের পর তার বাবা-মাকে আর্থিক ভাবে সহায়তা করতে পারছে কি না ? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা তিক্ত। হয় স্বামীর হাতে বা পরিবারের অন্য কারো হাতে বেতনের পুরোটাই তুলে দিতে হচ্ছে। আর লুকিয়ে বা এদিক-সেদিক করে হয়তো সে নিজের চাহিদা পূরণ করছে। আর্থিক অসচ্ছলতাই কি এর কারণ, নিশ্চয়ই নয়। মানসিকতাই বড় বিষয়। এ সকল প্রতিবন্ধকতার মাঝে যে নারীর পথ পরিক্রমা ‘তার চোখে বিশ্ব দেখা’ …. যতটা শ্রুতিমধুর বাস্তবে ঠিক ততটাই বন্ধুর।

 

প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আগমনের পূর্বপ্রস্তুতি ও পরিকল্পনা আরও গুরুত্ব সহকারে হওয়া উচিত। আমরা কখনই চাইবো না ফিমেল এফপিইউ বন্ধ হয়ে যাক বরং বাংলাদেশ সাফল্যের সঙ্গে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। তবে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির জন্য আরো একটু সময় দেয়া প্রয়োজন। যেমন- প্রশিক্ষণটি যথাযথ ভাবে গ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট এরিয়ার ভাষাজ্ঞান, মিশন চলাকালীন প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ও সরকারি সরঞ্জাম ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া দরকার। মিশন চলাকালে পুলিশ সদস্যদের খুব কম সংখ্যক ছুটিতে দেশে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে এক বছরের জন্য প্রস্তুতি বড় বিষয়। কোনো মিশন এরিয়াতে কি কি বিষয়ে সাবধানতা  অবলম্বন প্রয়োজন বা উক্ত সময়ে কি কি কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে এ বিষয়ে পূর্ব ধারণা থাকলে মানসিক প্রস্তুতি ভালো ভাবে নেয়া সম্ভব। রোটেশন চেঞ্জ এর যুক্তিগ্রাহ্য সময়ের পূর্বেই পরবর্তী রোটেশন এর প্রশিক্ষণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত যাতে নির্ধারিত সময়েই রোটেশন সম্ভব। কারণ সন্তান এবং পরিবারের জন্য কোনো সুযোগ নেই তারপরও সত্যিকার অর্থে সময়ের শেষ সীমায় পৌঁছালে দেশের প্রতি মায়া ও অস্থিরতা দুইই বেড়ে যায়। দেশে ফেরার এই ক্ষণ পিছিয়ে গেলে কর্মচঞ্চলতা কমে যায় অন্য দিকে অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে পারিবারিক সমস্যাগুলো ক্রমশ জটিল  থেকে জটিলতর হয়ে পড়ে। তাই মিশনকালে প্রাসঙ্গিক ও পারিপার্শ্বিক এবং চলমান এ সকল সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ পুলিশকে অধিকতর মনযোগী হতে হবে এবং সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বাধিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের এবং সর্বোচ্চ সাফল্যের দাবিদারও বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এ মুহূর্তে হাইতি এবং ডিআর কঙ্গোতে দুইটি বাংলাদেশ ফিমেল ফরম পুলিশ ইউনিট সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।