জাপানে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

১৯৭৫ সালে উন্নত পুঁজিবাদী ৭টি দেশকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল জি-৭। দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান এবং ইতালি। তবে এটি কোনো মামুলি সংস্থা ছিল না। জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন এই ৭টি দেশের সরকার প্রধানদের বছরে একবার মিলিত হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে কৌশল গ্রহণ করার প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তখন পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া বেশ প্রভাবশালী ছিল। মূলত সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার বিপরীতে পুঁজিবাদী দুনিয়ার নেতৃত্ব ধরে রাখার কৌশলই ছিল জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের অর্থনৈতিক সংস্থা কমিকনকে প্রতিহত করা এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কমিকন ভেঙে যায়, থেকে যায় জি-৭, পৃথিবীর আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। জি-৭ শুরুতে যতটা অর্থনেতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে মনে করা হয়েছিল, তারচেয়ে অনেক বেশি ছিল রাজনৈতিক। সমাজতন্ত্রের পতনের পর এর রাজনৈতিক এজেন্ডাতে পরিবর্তন এলেও উদীয়মান শক্তিসঞ্চয়কারী রাষ্ট্রগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি দূরে সরে যায়নি, বরং দৃষ্টিটা ওই দিকেই বেশি নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। বিশ্ব অর্থনীতিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কর্তৃত্ব অনেক দেশের উন্নয়নে মস্তবড় বাধা হয়ে দেখা দেয়। এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে ২০০১ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন মিলিতভাবে ব্রিক গঠন করে, ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হলে সংস্থাটির নাম ব্রিকস হয়।

পুঁজিবাদী দুনিয়ায় নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য জি-৭-এর শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতি বছর এক এক দেশে মিলিত হন, তাতে আমন্ত্রণ জানানো হয় তাদের কাছে আবেদন রয়েছে এমন কোনো কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকেও। এবার জাপানে জি-৭-এর শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শাদের প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস ইতানো, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো ওইদোদো, লাওসের প্রধানমন্ত্রী ড. সিসোলিথ, পাপুয়া নিউগিনির প্রধানমন্ত্রী পিটার ও নেইল, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট শ্রীসেনা, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী জুয়ান ফুক, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, আইএমএফের এমডি লাগারদে, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম এবং এডিবির প্রেসিডেন্ট তাকেহিস্কো নাকাও। জি-৭ শীর্ষ প্রধানরা মূলত একসঙ্গে বসেন, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এখানে একান্তই ৭ দেশের সরকার প্রধানরাই বিশেষ সেশনে যুক্ত হন। এর বাইরে আমন্ত্রিত নেতাদের নিয়ে তারা স¤প্রসারিত অধিবেশনও করে থাকেন। সেখানে ওইসব সরকার প্রধান এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বক্তব্যও শোনা যায়। এর মাধ্যমে জি-৭-এর প্রভাব বৃদ্ধির কৌশল হয়তো বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে জি-৭-এর কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের বলয়ে রাখার কৌশল ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থাই এতে হয়তো বিশেষভাবে নিহিত রয়েছে। আমাদের মতো দেশগুলো ৭টি শীর্ষ ধনী দেশকে তো এড়িয়ে চলতে পারে না? চলবেই বা কেন? নিজের দেশকে ভালো হোক মন্দ হোক পুঁজিবাদী ধারায় হলেও উন্নয়ন তো দিতে হবে, খাইয়ে-পরিয়ে রাখতে তো হবেই।

জাপানে অনুষ্ঠিত গত তিনদিনের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের স¤প্রসারিত অধিবেশনে সব অতিথি সরকার প্রধানই নিজ নিজ দেশের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তবে সংবাদ মাধ্যম মারফত যতটুকু জানা গেছে, তাতে দেখা গেছে যে, আমাদের বাংলাদেশের সরকার প্রধান শেখ হাসিনা স¤প্রসারিত অধিবেশনে জি-৭ শীর্ষ নেতাদের নজর কেড়েছেন খুব সঙ্গত কারণেই। শেখ হাসিনা এরই মধ্যে বিশ্বপরিসরে নিজের একটি আসন প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা এটি যেমন তার মৌলিক পরিচয়, একই সঙ্গে তিন তিনবার সরকার প্রধানের দায়িত্ব পেয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নানাভাবেই পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন, উন্নয়ন সামাজিক নানা সূচকে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে অতীতের তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদকে একেবারেই ঝেটিয়ে বিদায় করতে পেরেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি দেশপ্রেম, দেশের স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও ছেড়ে কথা বলেন না। তিনি একজন নির্ভীক দৃঢ়চেতা শাসক, কোমল প্রাণের নারীও; মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতে জানেন, আবার অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদও করতে জানেন। বিশ্ব ব্যাংককে তিনি যে সত্যটি বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন তা বিশ্বের কম সরকার প্রধানই পেরেছেন। সে কারণেই শেখ হাসিনার প্রতি জি-৭ সরকার প্রধান এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের আগ্রহ ছিল। নির্দ্বিধায় বলতে হচ্ছে, জি-৭-এর স¤প্রসারিত অধিবেশনে শেখ হাসিনা সেই বর্ণনাই তথ্য-উপাত্তসহকারে করেছেন, যেখানে আগ্রহভরে জি-৭ শীর্ষ নেতা এবং উপস্থিত অতিথিরা শুনেছেন, জানার চেষ্টা করেছেন। এটি তো ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশেরই গল্প যেখানে এখন প্রবৃদ্ধি অব্যাহতভাবে ৬-এর ঊর্ধ্বে থেকে থেকে এখন ৭ শতাংশে উন্নীত হতে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাস মিলছে। এখানে দারিদ্র্য দ্রুতই হ্রাস পাচ্ছে- ২০ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসছে, নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে, শিশু মৃত্যুর হার কমছে, খাদ্য উৎপাদন বেড়েই চলছে, রেমিটেন্সও অব্যাহতভাবে বেড়ে চলছে, মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমেই বাড়ছে, এত বিশাল জনবসতিপূর্ণ দেশে মানুষ একেবারে না খেয়ে নেই, কর্মসংস্থানও হচ্ছে- যদিও বেকারত্ব রয়েছে। তারপরও নানা সূচকেই দেশটা এগিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা দেশটাকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বলেও পরিচিতি দিতে পেরেছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন যেখানে মস্তবড় দুঃস্বপ্ন ছিল, সেখানেও দেশটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, শিক্ষায় গতিবেগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশটার জন্য মস্তবড় বাধা সা¤প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিস্তার। সেটিকেও সরকার প্রাণপণে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। এসবই শেখ হাসিনার শাসনামলের মস্তবড় অর্জন- যা বিশ্ব নেতাদের আন্দোলিত করে। তথ্যগুলো জি-৭ নেতারা জানেন না, শোনেননি- এমন কিছু নয়। ওইসব দেশের নিজস্ব চ্যানেল থেকেই তথ্য-উপাত্ত সংগৃহীত হয়, দেখা হয়, যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়। কারো মুখ থেকে শোনা কথায় বিশ্বাস স্থাপনকারী দেশ এগুলো নয়, তারা তাদের নিজস্ব উৎস থেকেই উন্নয়নের ধারায় বাংলাদেশ কতটা এগুচ্ছে, কতটা পিছিয়ে আছে- তা জানেন এবং বোঝেনও। তারপরও সরকার প্রধানের মুখ থেকে সেই গল্প শোনা একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সেটি শোনার জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানো। শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে জাপানে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের স¤প্রসারিত অধিবেশনে যোগ দিতে জাপান গেছেন। সেই সুযোগ তিনি পুরোপুরি সদ্ব্যবহারও করেছেন। এটি বাংলাদেশের জন্যই শ্লাঘার খবর, আনন্দ ও গর্বের খবর।

শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশেষভাবে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ নিয়ে সাক্ষাতে মিলিত হয়েছেন জি-৭-এর দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্রের সরকার প্রধান। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের ফিরিস্তি বিস্তারিতভাবে শুনেছেন, একই সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় শেখ হাসিনার সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। ব্রিটেন বাংলাদেশকে শেখ হাসিনার সরকারকে সহযোগিতা প্রদানের ধারা অব্যাহতই শুধু নয়, জোরদার করারও আশ্বাস দিয়েছেন। ডেভিড ক্যামেরুন বাংলাদেশের সাফল্যের এবং উন্নয়নে অংশীদার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ডেভিড ক্যামেরুনের বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য কতখানি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে তা বলাই বাহুল্য।

সবচেয়ে দৃষ্টি কাড়া সাক্ষাৎ হয়েছে শেখ হাসিনার সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার রূপকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পাশে জাপান থাকার প্রতিশ্রæতি প্রদান করেন।

জাপান ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনের সম্মতি দিয়েছে, একই সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানের নতুন বিমানবন্দর স্থাপনে সাহায্য করার প্রতিশ্রæতি দিয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

বৈঠকে শেখ হাসিনা জাপানকে একটি নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রদান করলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তা যাচাই বাছাই করতে জাইকাকে পরামর্শ দিয়েছেন। জাপান এবং বাংলাদেশ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক বৃদ্ধিকে কতখানি গুরুত্ব দেয় তা বিভিন্ন চুক্তি, প্রটোকল স্বাক্ষর এবং বিনিয়োগবান্ধব গতির পরিমাপ করলেই সহজে দেখা যায় এবং বোঝাও যায়। বলা চলে উভয় দেশ সম্পর্কের নতুন উচ্চতায় অবস্থান করছে।

বস্তুত, শেখ হাসিনার জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে- এটি যেমন স্পষ্ট বোঝা গেল, একইভাবে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সত্যি সত্যিই ঘুরে দাঁড়িয়েছে, বিশ্ব পরিসরে মর্যাদার একটি নির্ভরযোগ্য আসন লাভ করেছে- এটিও স্বীকার করতে হবে। বাংলাদেশের সেটিই তো বিশেষভাবে প্রয়োজন। আমাদের ১৬-১৭ কোটি মানুষের জন্য উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সেই উন্নয়ন কারো কাছে মাথা নত করে অর্জিত হবে- এটি মোটেও ভাবার কোনো কারণ নেই। আবার স্বাধীন ও মর্যাদার অবস্থান নিলেই আমরা পরাশক্তির রোষানলে পড়ব- এমনটিও ভাবার কোনো কারণ নেই। পৃথিবী ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, আমরাও হচ্ছি। তবে সেই পরিবর্তন হয় কেবল দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নেতৃত্বের হাতেই- এটি সবাইকে বুঝতে হবে।