কৃষিতে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য কমেছে

কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। একই সঙ্গে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্যও ১০ শতাংশ হারে কমছে। নারী শ্রমিকরা পুরুষের অর্ধেকেরও কম মজুরি পেতেন। চলতি বছরের মে মাসের মজুরির হিসাবে এ পার্থক্য ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ কৃষি মজুরি হিসেবে পুরুষ যদি ১০০ টাকা পান, সেখানে নারী পান ৭৫ টাকা। ৭ বছর আগে একই কাজের জন্য নারী পেতেন ৪৮ টাকা। আর ১০ বছরের ব্যবধানে কৃষি কাজে যুক্ত হয়েছেন ৬৭ লাখ নারী, যা ১০ বছর আগে ছিল ৩৮ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ কৃষি মজুরিবিষয়ক জরিপে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
গ্রামীণ পুরুষের একটি বড় অংশ বর্তমানে প্রবাসী শ্রমিক এবং দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে ও শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। এতে কৃষি কাজে নারীদের অংশগ্রহণ ও মজুরি দুটিই বাড়ছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্যের এ ইতিবাচক দিকটি মেনে নেয়া হয় না।
বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, কৃষি খাতে পুরুষের গড় মজুরি দিনের খাবার ছাড়া ৩২২ টাকা ও খাবারসহ ৩০০ টাকা। আর নারীদের মজুরি খাবার ছাড়া ২৪৪ টাকা ও খাবারসহ ২২৫ টাকা। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের (এফপিএমইউ) ২০১৫ সালের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনেও কৃষিতে নারীদের মজুরি বেড়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির ‘জাতীয় খাদ্যনীতি ও কর্মপরিকল্পনা এবং দেশীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনা পর্যবেক্ষণ’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে একজন পুরুষ দৈনিক মজুরি দিয়ে ৯ কেজি এবং নারীরা ৬ কেজি চাল কিনতে পারেন।
এফপিএমইউর রিপোর্ট ২০১৫ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গেল কয়েক বছরে নারী শ্রমিকের দক্ষতা ও চাহিদা বেড়ে যাওয়া ও গ্রামীণ পুরুষের বড় অংশ প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে রূপান্তর এবং পুরুষ শ্রমিকদের অন্য খাতে স্থানান্তরের কারণে গ্রামে কৃষি-মজুরের সংকট দেখা দিচ্ছে। ওই শ্রমের ঘাটতি নারীরা পূরণ করে কৃষিকে এগিয়ে নিচ্ছেন।
নারী শ্রমের ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, কৃষিতে নারী শ্রমের সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত বদলের সম্পর্ক আছে। গ্রামে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, ক্যাশ ফর ওয়ার্কসহ নানা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় নারীদের সংখ্যাই বেশি। এতে কৃষি কাজে মজুরি নিয়ে দরদাম করার সুযোগ পাচ্ছেন নারীরা। এতে মজুরি বৈষম্য কমে আসছে বলে মনে হচ্ছে।
বিবিএসের হিসাবে দেশে কৃষি কাজে নিয়োজিত শ্রমশক্তির সংখ্যা ২ কোটি ৫৬ লাখ। এর মধ্যে নারী প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ। এক দশক আগেও নারীর এ সংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে কৃষি কাজে যুক্ত হয়েছেন ৬৭ লাখ নারী। তবে এক দশক ধরে প্রতি বছর কৃষি কাজে ৪ শতাংশ হারে কৃষিশ্রমিক বাড়লেও তা মূলত নারীনির্ভর। আর পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে সাড়ে ৩ শতাংশ।
বিবিএসের মজুরি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে পুরুষরা সবচেয়ে বেশি মজুরি পান কক্সবাজার জেলায়Ñ দিনে ৪২৮ টাকা। ওই জেলার নারীরা পান ৩২৫ টাকা। নারীরা সবচেয়ে কম মজুরি পান নীলফামারী জেলায়Ñ ১৬৩ টাকা। আর পুরুষরা সবচেয়ে কম মজুরি পান চুয়াডাঙ্গায়Ñ ২১৩ টাকা।
এ বিষয়ে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফাবাহ কবীর বলেন, ২০টির বেশি কৃষি কাজে নারীর অবদান থাকা সত্ত্বেও তাদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। এতে একজন পুরুষ যেসব সুবিধা ভোগ করছেন, কিষানি তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য কমলেও বাংলাদেশে এখনও মজুরি বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকরা। বিশেষ করে অপ্রান্তিক খাতগুলোয় নারী শ্রমিকরা এখনও পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে কম মজুরি পাচ্ছেন। আবার নারী শ্রমিকদের সব কাজে নিয়োগ করতে চায় না মালিকপক্ষ। করলেও মজুরি কম দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক এরপর পৃষ্ঠা খাতেও চুক্তিভিত্তিক কাজে নারীরা কম মজুরি পাচ্ছেন। জাতিসংঘের বিধান অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের সমান মজুরি দেয়ারও বিধান রয়েছে। যোগ্যতা সমান থাকলে কাজ ও মজুরির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ রাখা যাবে না। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলেছে, গ্রামীণ ৪১ শতাংশ নারী আলু চাষের সঙ্গে জড়িত, ৪৮ শতাংশ মাছ চাষে। এছাড়া সরকারি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প থেকে ঋণ নিয়েও অনেক নারী এখন কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। অথচ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে পুরুষ কৃষকের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ডাটাবেজ’ থাকলেও নারী কৃষকের সেটা নেই। এ কারণে ১ কোটি ৩৯ লাখ কৃষক কার্ড বিতরণ করা হলেও নারীরা কত অংশ পেয়েছে, তা কেউ জানে না। অধিকাংশ নারী শ্রমিকের কাজের জন্য কোনো সুষ্ঠু পরিবেশও নেই। রোদ ও বৃষ্টিতে বসার মতো কোনো জায়গাও নেই তাদের। নেই টয়লেটের ব্যবস্থা। এমন নারী শ্রমিকদের ছোট ছোট সন্তানেরও বিশ্রামের কোনো সুব্যবস্থা নেই। ফলে মায়ের কোলে ঘুমালেও মাকে কাজ করতেই হয়।
এদিকে কর্মজীবী নারী সংগঠনের নেতারা কৃষি শ্রম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি শ্রম কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের হিসাব কৃষি খাতের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টিতেই নারী অংশগ্রহণ করছে। এ সম্পর্কে কর্মজীবী নারীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সংসদ সদস্য শিরিন আখতার বলেন, শ্রম কমিশন গঠনের কাজ চলছে। কমিশন থাকলে শুধু মজুরি নয়, সব ধরনের বৈষম্যই কমবে। নারী নেত্রী ফরিদা আখতার বলেছেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে নারীকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। এজন্য প্রয়োজন নীতি প্রণয়ন। একই সঙ্গে নারী কৃষক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নারীকে আরও দক্ষ কৃষক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহযোগিতা করতে হবে।