বাজেটে থাকছে ত্রিবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা

প্রথমবারের মতো তিন বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার আলোকে আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আগামী বছর ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ২০২১ সালের আগেই দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জনকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখছেন অর্থমন্ত্রী। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ বছরে অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তিনি ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে যেতে চান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের মাঝে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে সফল আত্মপ্রকাশ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এ সময়ের মধ্যে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। এবং মানুষের গড় আয় দাঁড়াবে দুই হাজার ডলারের কাছাকাছি। অবশ্য সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যেই মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নাম লেখাবে বাংলাদেশ। অর্থমন্ত্রীর এসব স্বপ্ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সংবলিত বাজেট বক্তৃতা প্রণয়নের কাজ চলছে। বাজেটের খুঁটিনাটি বিষয় ঠিক করতে অর্থবিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করছেন। আগামী ২ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট ২০১৬-১৭ উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে সুষম উন্নয়নের পথ দেখাতে চান অর্থমন্ত্রী। আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে আয় বৈষম্যে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চান তিনি। মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়াতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চান গ্রামগঞ্জে। এ জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে প্রান্তিক পর্যায়ের রাস্তাঘাট, অবকাঠামোর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে আগামী বাজেটে। সেই সঙ্গে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে কারিগরি শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে চান দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আর মানবসম্পদ, শিক্ষা ও স্বাস্ব্য খাত ঢেলে সাজাতে চান এবারের বাজেটের মাধ্যমে। সূত্র জানায়, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও আয়ের সুষম বণ্টন এই স্লোগান সামনে রেখে নতুন বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী। আয় বৈষম্য কমিয়ে সম্পদের সুষম বণ্টনকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনা থাকছে কয়েকটি খাতে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির সহায়তায় বিশেষ ব্যবস্থা এবং জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নের দিক-নির্দেশনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বাজেটে। পাশাপাশি ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১’, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) এবং সরকারের নীতি-অগ্রাধিকার বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আসছে বাজেটে ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধশীল রাষ্ট্রে পৌঁছানোর জন্যও একটি রূপরেখা দেওয়া হবে। এ জন্য জিডিপিসহ মাথাপিছু আয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবসম্পদের উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের কথা বলা হবে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়।

আসছে বাজেটে মোট ব্যয়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০০ থেকে ৭৩৫ কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে অনুন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ২৯ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যয় হবে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, সেবা ও সরবরাহ খাতে। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মূল আকার হবে ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৭০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা হচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে এনবিআরের করের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। নন-এনবিআর করের লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, কর ছাড়া প্রাপ্তি আয় হচ্ছে ৩২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। আসছে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হচ্ছে ৯৭ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। যা জিডিপির ৫ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৬০ হাজার ৭৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে শুধু ব্যাংক থেকে নেওয়া হবে ৩৭ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র খাত থেকে নেওয়া হতে পারে ২২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের লক্ষ্য ঠিক করা হতে পারে ৩৯ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। এর বাইরে অনুদান ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ও বিদেশি ঋণ পরিশোধের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকা।