বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা

স্বাধীনতা অর্জনের ৪৫ বছরের পথ পরিক্রমায় তলাবিহীন ঝুড়ি খ্যাত বাংলাদেশ এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপের জন্য বিশ্বে বাংলাদেশ এখন নতুন পরিচিতি পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ আজ আর বেশি দূরে নয়; সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে যথেষ্ট উন্নয়নের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া এ দেশকে আজকের অবস্থানে আসতে অতিক্রম করতে হয়েছে হাজারো প্রতিবন্ধকতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৮টি লক্ষ্যের মধ্যে শিক্ষা, শিশুমৃত্যুহার কমানো এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মতো সাফল্য আছে বাংলাদেশের। বিবিএসের হিসাবে, প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৬ ডলারে, যা গত অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৩১৬ ডলার। শেখ হাসিনা সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলারে নিয়ে যাওয়া। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), পিউ রিসার্চ সেন্টার, গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন, কোফেস, ফরচুন সাময়িকীসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রভাবশালী গবেষণা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জরিপে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সঠিক পথে এগিয়ে চলছে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। বর্তমান সরকার কৃষির উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কার্যকর সেবা কৃষি খাতে যুগান্তকারী সাফল্য এনে দিয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে চাল উত্পাদনের গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্র ধান উত্পাদনের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নতি, কম উত্পাদনশীল ধানের পরিবর্তে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধানের চাষ এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত পুরনো উত্পাদন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ব্যবহার প্রবর্তনের জন্য কাজ করছে। কৃষি খাতে অভূতপূর্ব কিছু সাফল্যের জন্য বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ বারবার আলোচিত হয়েছে। প্রায় ১৬ কোটি জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিগত বছরগুলোতে ধানের উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ টন। প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম আবিষ্কার করেছেন পাটের জিনোম সিকুয়েন্সিং। সারা বিশ্বে আজ পর্যন্ত মাত্র ১৭টি উদ্ভিদের জিনোম সিকুয়েন্সিং হয়েছে, এর মধ্যে ড. মাকসুদ করেছেন ৩টি। তাঁর এই অনন্য অর্জন বাংলাদেশের মানুষকে করেছে গর্বিত।
অবকাঠামোগত খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করছে সরকার। মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, যমুনা টানেল-যা আমাদের স্বপ্ন ছিল, সেসবের আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ ছাড়াও গভীর সমুদ্রবন্দর, রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। মানুষের যোগাযোগ নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের অন্যতম উপাদান যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার দেশের সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করে। দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল প্রকল্প, রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভার, মিরপুর-বনানী ফ্লাইওভার ও ওভারপাস, গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী-পলাশী ফ্লাইওভার নির্মাণ সম্পন্ন করার পাশাপাশি উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সরকারের চলতি মেয়াদেও মগবাজার-মৌচাক-তেজগাঁও ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
আমাদের বৈদেশিক রেমিট্যান্সের অন্যতম উত্স জনশক্তি রফতানির ওপর নির্ভরশীলতা। বর্তমানে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে বাংলাদেশের ৮৬ লাখেরও অধিক শ্রমিক কর্মরত আছে। বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ স্থাপন করেছে অনন্য দৃষ্টান্ত। তাদের পাঠানো টাকায় পাল্টে গেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। তারা এখন উন্নত জীবনযাপন করতে পারছে। সেই সঙ্গে লাভবান হচ্ছে পুরো দেশ। স্বল্প সুদে অভিবাসন ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক স্থাপন করে দেশের ৭টি বিভাগীয় শহরে এর শাখা স্থাপন করা হয়েছে। এই ব্যাংকের মাধ্যমে এপ্রিল ২০১৪ পর্যন্ত ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা অভিবাসন ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিনটি রফতানিমুখী খাতে পোশাক শিল্পই অন্যতম। যেকোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিল্পনির্ভর। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এখানে শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এক্ষেত্রে গার্মেন্টস শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। গোটা বিশ্বে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। বেকার সমস্যার সমাধান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ শিল্পের অবদান উত্সাহজনক। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এই শিল্পের হাত ধরে বিশ্ববাজারে একটি ব্র্যান্ড সৃষ্টি করেছে। যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমাদের দেশ বিশ্বদরবারে নতুন পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করছে। বাংলাদেশের নারীদের হাতের তৈরি পোশাক আজ বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলোয়াড়দের পরনে, যা আমাদের গর্বের বিষয়। দেশের উন্নয়নে এই গার্মেন্টস শিল্পের এত অবদান থাকা সত্ত্বেও বিগত সরকারের আমলে যথেষ্ট সদিচ্ছার অভাব ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে এই শিল্প এগিয়ে চলছে ত্বরিতগতিতে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পাশাপাশি প্রসার ঘটেছে আবাসন, জাহাজ, ওষুধ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যশিল্পের। বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় যোগ হয়েছে জাহাজ, ওষুধ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী। বাংলাদেশের আইটি শিল্প বহির্বিশ্বে অভূতপূর্ব সুনাম কুড়িয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের আইটি শিল্পের রফতানি আয় ১০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
উন্নত জাতিতে পরিণত হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষা। বর্তমান সরকার শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হচ্ছে। নারীশিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তি ব্যবস্থা। ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নতুন করে জাতীয়করণ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বেড়ে চলছে শিক্ষার হার, যা বাংলাদেশকে নতুন মাত্রায় উপনীত করেছে।
স্বাস্থ্য খাতে অভাবনীয় উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষ আজ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম আদর্শ দেশ হিসেবে তার স্থান করে নিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতকে যুগোপযোগী করতে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালা-২০১১’। তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গড়ে তোলা হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন মেডিক্যাল কলেজ, নিয়োগ দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার জনশক্তি।
বর্তমানে নারী ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই। সরকার সবসময়ই নারীদের অনুকূলে নানা ব্যবস্থা গ্রহণে করেছে। নারীর সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১’। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে গৃহীত হয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ। প্রযুক্তি জগতে নারীদের প্রবেশকে সহজ করতে ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্রের মতো ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যসেবায় উদ্যোক্তা হিসেবে একজন পুরুষের পাশাপাশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন নারী উদ্যোক্তাকেও। দুস্থ, এতিম, অসহায় পথশিশুদের সার্বিক বিকাশের জন্য স্থাপন করা হয়েছে শিশু বিকাশ কেন্দ্র।
ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে বাংলাদেশ সরকার নিয়েছে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়ে দেশের ৪৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এ পোর্টালের সংখ্যা প্রায় ২৫০০০। দেশের সবক’টি উপজেলাকে আনা হয়েছে ইন্টারনেটের আওতায়। সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে চালু করা হয়েছে ই-পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পাদন করার বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। ৩-জি প্রযুক্তির মোবাইল নেটওয়ার্কের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনে শেখ হাসিনার সরকার কাজ করে যাচ্ছে। সমাজের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এ সরকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমানে নিজেদের দলীয় ব্যক্তির অপরাধ দমনে যেমন আইনি প্রক্রিয়া নিজস্ব গতিতে চলছে, তেমনি চাঞ্চল্যকর অপরাধ দমনে কঠোর হয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে শিশুর পায়ে গুলি করার অপরাধে সরকারদলীয় এমপি মঞ্জুরুল লিটনের গ্রেফতার এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়া শিশু রাজন হত্যার আসামি কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খুলনায় শিশু রাকিব হত্যা ও বরগুনায় শিশু রবিউল হত্যাকাণ্ডে আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সেভেন মার্ডার মামলার পলাতক আসামি নূর হোসেন ঘটনার পর ভারতে পালিয়ে গেলেও সেখানকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করেছে। প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে মানুষের মঙ্গলে কাজ করে যাচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সরকার তা কঠোর হস্তে দমন করছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগদানের পর এ পর্যন্ত বিশ্বের ৩৯টি দেশের ৬৪ শান্তি মিশনে খ্যাতি ও সফলতার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ যাবত্কালে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী ১১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বাগ্রে।
হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বিস্তৃত করতে বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত ও দুস্থ মহিলা ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ ভাতার হার ও আওতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে ৫৫টি জেলায় বিদ্যমান মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান কম্পিউটারাইজেশনের কাজ সম্পন্ন করার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ এখন আর্থসামাজিক সব সূচকে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন সূচকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় ও সম্পদ সংস্থান, সামাজিক বৈষম্যনিরোধ, লিঙ্গসমতা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, জননিরাপত্তা, জনমিতি প্রভৃতি সূচকে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে পড়েছে পাকিস্তান। সার্বিক মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪২তম। অন্যদিকে পাকিস্তান পাঁচ ধাপ পিছিয়ে ১৪৭তম। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে পাকিস্তানের তুলনায়। বাংলাদেশের চরম বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ; অন্যদিকে পাকিস্তানে এই হার ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্মসংস্থানেও বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে। এর মধ্য দিয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল প্রবৃদ্ধির অর্জন। চলতি অর্থবছরে প্রাথমিক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা গত অর্থবছর ছিল ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। দেশ যে দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এটি তারই লক্ষণ। প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের মানুষকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিরসনে অসাধারণ অগ্রগতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন, অবকাঠামো উন্নয়ন বিশেষত বিদ্যুত্ সম্প্রসারণ, মানব উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসকরণে বাংলাদেশ জাতিসংঘের পুরস্কার লাভ করেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির সফল প্রয়োগের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘সাউথ সাউথ’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশিত জরিপে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আগের বছরের চেয়ে নতুন বছর নিয়ে বিশ্বের ৬৮ দেশের মধ্যে সবচেয়ে আশাবাদী দেশ বাংলাদেশ। আর নতুন বছর নিয়ে আসবে অফুরন্ত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, এমন বিশ্বাসেও বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আমরা উন্নয়নে বিশ্বাসী। বাঙালি জানে বিজয় ছিনিয়ে আনতে। বাংলাদেশে আইএস আছে-এমন কথা বলে বাঙালির উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতাকে কেউ রুখতে পারবে না। উন্নয়নের মহাসড়ক থেকে দেশকে আর কেউ পিছিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। শত বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবেই।

লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়