খাতে খাতে উন্নয়নের ছোঁয়া

মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাকসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে সম্ভাবনাময় ১১টি দেশের তালিকায় এখন বাংলাদেশ। ক্রমান্বয়ে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে দেশ। অর্থনীতির উন্নয়ন সূচকেও ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হবে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র মতে, দেশে পুঁজি বিনিয়োগে বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে ব্যাপক উদ্যেগ নিয়েছে সরকার। পদ্মা সেতু প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক, মহমনসিংহ ও দিনাজপুর চার লেন প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, পানগাঁও নৌ টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, গ্যাস সংকট নিরসনে এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রাজধানীর চারপাশে সুয়ারেজ ট্যানেল নির্মাণের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। সম্প্রতি উন্নয়নের এ কর্মযজ্ঞে যোগ হয়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প এবং দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুমধুম প্রকল্প। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের কাজ চলছে। এরই মধ্যে কয়েকটি অঞ্চলের কাজের উদ্বোধনও করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে আরও কয়েকটি কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীর উন্নয়ন, ঢাকা শহরের চারপাশে নৌপথ রেলপথ ও সড়কপথ নির্মাণ, হাইটেক পার্ক নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, ট্যানারি স্থনান্তর, গার্মেন্ট পল্লী স্থাপন, ওষুধ শিল্প পার্ক স্থাপন, ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও সুন্দরবন সুরক্ষাসহ দৃশ্যমান অনেক কাজ। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টি করে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অর্থায়নে ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কাজের উদ্বোধনও করা হয়েছে। বাকি অঞ্চলগুলোও প্রক্রিয়াধীন। এতে চীন, জাপান, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সঙ্গে এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিরাপদ এবং পণ্য পরিবহন ও খালাস সহজীকরণ করতে নেয়া আরও কিছু অবকাঠামোর সংস্কার হচ্ছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও এগিয়েছে দেশ। ১৬ কোটি মানুষের দেশে কয়েক বছরে সক্রিয় মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি, আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ৫ কোটি। উন্নয়নে আরও একটি মাইলফলক তৈরি করতে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ মহাকাশে উৎক্ষেপণের কাজ এগিয়ে চলছে। এর মাধ্যমে দেশের সব মানুষকে যোগাযোগ ও সম্প্রচার সুবিধার আওতায় আনার পাশাপাশি দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগসেবা নিশ্চিত হবে। এমনকি স্যাটেলাইটের বর্ধিত ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাও উপার্জন করা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব মোঃ আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প পর্যবেক্ষণ করছেন। এরই মধ্যে চীন, জাপান, জার্মানি, ইতালির মতো দেশ বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে। নতুন নতুন এসব অবকাঠামো অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করবে বিনিয়োগে। বিদেশি বিনিয়োগ এলে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে; পাল্টে যাবে দেশের অর্থনীতির চিত্র। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রিজার্ভ এবং মাথাপিছু আয় বেড়েছে। জিডিপি সন্তোষজনক। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে এসব অবকাঠামো গড়ে উঠলে দেশ হবে অপার সম্ভাবনার; পেছনে তাকানোর সময় থাকবে না। অর্থনৈতিকভাবে পাল্টে যাবে দেশ। উন্নয়নের সেই সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৬ ডলারে, যা গেল অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ১৯০ ডলার। মাথাপিছু আয় বাড়ায় বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান এখন ৪৪তম স্থানে, যা গেল বছরও ছিল ৫৮তম অবস্থানে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় আয় বাড়ার পাশাপাশি মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ও গড় আয়ু বেড়েছে। বর্তমান গড় আয়ু ৭০ দশমিক ৭ মাস। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অর্জিত হবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা ছাড়িয়ে ৭ দশমিক শূন্য ৫ হওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করতে ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোয় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসংবলিত পৃথক ইকোনমিক জোন গড়ে তোলার কথা বললেন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্যাক্স হলিডে, কম সুদে ঋণ দেয়াসহ আকর্ষণীয় আলাদা কিছু অফারের বিষয়টি উল্লেখ করেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে প্রথমেই দরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। যার প্রধান হাতিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যে আমাদের এখনও দরকার। এছাড়া উন্নয়ন যে গতিতে চলছে, তার জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা, কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলে বিনিয়োগ আসবেই। এজন্য সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। এদিকে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে, যা ১ হাজার ৩১৬ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৪৬৬ ডলারে উপনীত হওয়ার কথা। আশাবাদী হওয়ার মতো এ তথ্য গেল ৫ এপ্রিল ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলকে উপস্থাপন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স (বিবিএস) থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, কৃষি খাতে প্রায় ২ দশমিক ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি খাতের উন্নয়ন ও রফতানি খাত থেকে কাক্সিক্ষত আয় অর্থনীতিকে প্রণোদিত করেছে নিঃসন্দেহে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এর বাইরে আরও কিছু বিষয় শনাক্ত করেছে, যা থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৭৩ শতাংশ প্রকল্পই পূর্বানুমানকৃত পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, দেশ অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের একটি লোকও বেকার থাকবে না। মালয়েশিয়ার উপরে উঠে আসবে বাংলাদেশ। এটা ভেবে আমার অনেক ভালো লাগে। এটা সম্ভব হবে দেশের শ্রমিক-কৃষক, প্রবাসী বাঙালি ও সবার অদম্য চেষ্টায়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের উপরে রয়েছে। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ অর্জনের স্বপ্ন পূরণ হবে। আর এজন্য দক্ষ মানবসম্পদের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সরকার হাজারো পরিকল্পনা করতে পারে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে হবে মানুষকে। দেশের মানুষকে বহুমুখী জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।