শতবর্ষে রংপুর কারমাইকেল কলেজ

সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির বুকে দিগন্তজোড়া মাঠ। মনোরম পরিবেশ। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংগ্রামে সমৃদ্ধ। আছে পড়ালেখার চাপ। কমতি নেই শিক্ষার্থীদের আড্ডার। গানবাজনার সঙ্গে পাখপাখালির কিচিরমিচির। মাঝেমধ্যে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদীদের আওয়াজ ভাসে মিছিল-স্লোগানে। সব মিলিয়ে সারাক্ষণ প্রাণোচ্ছল উত্তরের অক্সফোর্ডখ্যাত প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রংপুর কারমাইকেল কলেজ।

আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার পতন আন্দোলনসহ এ দেশের প্রতিটি ন্যায়সংগত আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস রচনায় যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উঠে আসে, তেমনি কারমাইকেল কলেজ নিজেই একটি ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে বাংলাসহ ভারতবর্ষে। সেই আলো যেন আজও অফুরান।

জীবন্ত ইতিহাস ও গর্বিত ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করা রংপুর কারমাইকেল কলেজ শতবর্ষে পা দিতে যাচ্ছে। ‘শতবর্ষে শত প্রাণ, ঐতিহ্যের জয়গান’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আগামী নভেম্বরে দুই দিনব্যাপী জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই কলেজটির শতবর্ষ উদ্যাপন করা হবে। এ জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। গত ৪ মে সকালে কলেজ মিলনায়তনে শতবর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানের অনলাইন রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর বিনতে হুসাইন নাসরিন বানু।

অবিভক্ত বাংলার যে কটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিল এর মধ্যে কারমাইকেল কলেজ রয়েছে প্রথম সারিতে। ইংরেজ আমলের অবিভক্ত বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার ও প্রচারের জন্য অসামান্য খ্যাতির অধিকারী এই কারমাইকেল কলেজ। তত্কালীন রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলসহ অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়ি, আসাম ও সংলগ্ন এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। তত্কালীন সময়ে রংপুরে উচ্চবিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও কলেজ পর্যায়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না।

কারমাইকেল কলেজের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য মনোরম। ৮০০ বিঘা জমির ওপর কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত। নিভৃত নিরালায় কারমাইকেল কলেজের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ ও সবুজ-শ্যামল মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অভিভূত করে যেকোনো মানুষকে। এই কলেজের মূল ভবন ইন্দোস্যারাসেনিক আদলে নির্মিত স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন। ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কারমাইকেল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রিসহ ২১টি বিষয়ে সম্মান ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২৭ হাজার। দৃষ্টিনন্দন এই কলেজের দেয়াল মাটি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে কত শত ইতিহাস।

১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর তত্কালীন অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল এই ঐতিহাসিক কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আর তাঁর নামানুসারেই কলেজের নামকরণ করা হয় কারমাইকেল কলেজ। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই কলেজে আইএ ও বিএ ক্লাস খোলার অনুমতি দেয়। সেই থেকে প্রায় দুই বছরের জন্য কলেজটির পঠনপাঠনের কাজ চলে রংপুরের বর্তমান জেলা পরিষদ ভবনে। ১৯১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কলেজের মূল ভবনের উদ্বোধন করা হয়।

কারমাইকেল কলেজের ইতিহাস ঘেঁটে পাওয়া যায় ১৯১৩ সালে তত্কালীন অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল রংপুর এলে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেই এ অঞ্চলে একটি প্রথম শ্রেণির কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে সহযোগিতার জন্য অনুরোধ করা হয় গভর্নরকে। তিনি রংপুরের সেই নাগরিক সংবর্ধনায় সবার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং জানিয়ে দেন এই কাজে অর্থাৎ একটি প্রথম শ্রেণির কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে প্রাথমিক পর্যায়ে তিন লাখ টাকার প্রয়োজন হবে। তাঁর অভিমত অনুযায়ী ১৯১৩-১৪ সালে তত্কালীন রংপুর জেলা কালেক্টর জে এন গুপ্ত কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তহবিল সংগ্রহের জন্য তিনি রংপুর অঞ্চলের রাজা, জমিদার, বিত্তবান ব্যক্তি ও শিক্ষানুরাগীদের নিয়ে সভা ডাকেন। তাঁর এই উদ্যোগে সাড়া দিয়ে অর্থ প্রদান করেন শীর্ষস্থানীয় জমিদাররা। অর্থ সংগ্রহের জন্য ডাকা সভায় একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। সভায় তত্কালীন দানশীল জমিদার ও বিত্তবান ব্যক্তিরা কলেজ প্রতিষ্ঠায় কে কত টাকা দেবেন, তা মুখে বলে অঙ্গীকার এবং কাগজে লিপিবদ্ধ করেন। এ ক্ষেত্রে টেপার জমিদার তাঁর মুখে উচ্চারিত ১০ হাজার টাকা লিখতে গিয়ে টাকার অঙ্কের জায়গায় ভুল করে ডান পাশে একটি শূন্য বেশি বসিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে তাঁর টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ টাকা। সভা শেষে সবার লিখিত টাকার অঙ্ক যখন পড়ে শোনানো হচ্ছিল তখন টেপার জমিদার অন্নদা মোহন রায় চৌধুরী বাহাদুর তাঁর অঙ্গীকারকৃত টাকার অঙ্ক শুনে বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। কারো কারো মতে, তিনি মূর্ছা গিয়েছিলেন। তবে তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারকৃত টাকার অঙ্কই দান করেছিলেন।

তাঁর এই দানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই কারমাইকেল কলেজে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন দর্শনীয় মূল ভবনের ঠিক মাঝের হলটি তাঁর নামানুসারে ‘অন্নদা মোহন হল’ নামকরণ করা হয়। সেখানেই কলেজ প্রতিষ্ঠায় যাঁরা অর্থ ও জমি দান করেছিলেন তাঁদের সবার নাম পাথরে খোদাই করে লেখা আছে। ২৮ জন দাতার মধ্যে সর্বপ্রথম নামটিই হলো অন্নদা মোহন রায় চৌধুরী বাহাদুর। আরো উদারহস্তে এই কলেজ প্রতিষ্ঠায় দান করেন কুন্তি, কাশিমবাজার, রাধাবল্লভ, ধর্মপুর, মন্থনা, তুষভাণ্ডার, মহীপুরের পাঙ্গা, কুড়িগ্রাম, খোলাহাটি, রসুলপুর অঞ্চলের জমিদার, জোতদারসহ বিত্তবান ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিরা। কেউ নগদ অর্থ দান করেন আবার কেউবা দান করেন জমি। তবে জমি দান করার দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছেন কুন্তির প্রসিদ্ধ জমিদার ও রংপুরের তত্কালীন সবচেয়ে শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি সুরেন্দ্র নাথ রায় চৌধুরী। তাঁরা দুই ভাইয়ের পক্ষ থেকে প্রায় সাড়ে ৪০০ বিঘা নিষ্কণ্টক জমি দান করেন। ১৯১৩ সালে রংপুরে গণসংবর্ধনায় গভর্নর লর্ড কারমাইকেল তিন লাখ টাকা সংগ্রহের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ১৯১৬ সালের মধ্যেই সংগৃহীত হয় চার লক্ষাধিক টাকা। এরপর ১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল রংপুরে এসে কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

ছায়া সুনিবিড় বিশাল ক্যাম্পাস। বিশাল এই ক্যাম্পাসজুড়ে অজস্র গাছপালায় সুশোভিত সবুজ প্রাঙ্গণ। যেন এক প্রাকৃতিক নিসর্গ। চারদিকে সবুজের সমারোহের মধ্যে যেন গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্য কীর্তি কারমাইকেল কলেজের শ্বেতশুভ্র মূল ভবন। রংপুরের লালবাগ হাট থেকে একটি গেট পেরিয়ে চুন-সুরকি ও সিমেন্টের সড়ক চলে গেছে কলেজের মূল ভবনের দিকে। ক্যাম্পাসের দক্ষিণে রংপুর ক্যাডেট কলেজ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে কারমাইকেল কলেজের জমিতে। কলেজে ঢুকতেই হাতের বাঁয়ে পড়বে শিক্ষকদের আবাসিক ভবন। একটু এগিয়ে গেলে শিক্ষকদের ডরমিটরি, যা ‘হোয়াইট হাউস’ নামে পরিচিত। পাশেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কিউএ মেমোরিয়াল প্রাথমিক বিদ্যালয় (কলেজ প্রাইমারি স্কুল)। আরো সামনের দিকে এগোলে চৌরাস্তা বা জিরো পয়েন্ট। এ ছাড়া রয়েছে একটি সুদৃশ্য মসজিদ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, দ্বিতল ছাত্রী বিশ্রামাগার, বিভিন্ন বিভাগীয় ভবন, ক্যান্টিন, শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল, সাব পোস্ট অফিস, অত্যাধুনিক অডিটরিয়াম (নির্মাণাধীন), একটি টালি ভবন (বিএনসিসি ও স্কাউট), ছাত্র বিশ্রামাগার, পুলিশ ফাঁড়ি, প্রশাসনিক ভবন, বিশাল দুটি খেলার মাঠ। মূল ভবনের পূর্বে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মারক ভাস্কর্য, যা নতুন মাত্রা যোগ করেছে মূল ভবনের নান্দনিকতায়। দক্ষিণে শহীদ মিনার, তিন তলা বিজ্ঞান ভবন (সেকেন্ড বিল্ডিং), তিন তলা কলা ও বাণিজ্য ভবন (থার্ড বিল্ডিং), দ্বিতল রসায়ন ভবন, নানা ফুলে সজ্জিত একটি বাগান। রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার বইয়ের এক বিশাল ভাণ্ডারসমৃদ্ধ লাইব্রেরি, যা কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন রংপুর জেলা গ্রন্থাগার থেকে ২৫০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। কলেজের মূল ভবনের ঠিক মাঝে রয়েছে ‘আনন্দমোহন হল’। উত্তর-পশ্চিম কোণে রয়েছে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ, যা ‘বাংলা মঞ্চ’ নামে পরিচিত। কলেজের সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র এটি।

ক্যাম্পাস ঘুরে কথা হলো বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। কেউ তখন জোট বেঁধে আড্ডায় মগ্ন। চলছে হাসাহাসি, খুনসুটি। কারো আবার ক্লাসের তাড়া। ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম আপন বলেন, ‘অল্প কিছুদিন পরই আমরা প্রিয় এই কলেজের শতবর্ষ পূর্তি পালন করব। সত্যি এই অনুভূতি কত স্মৃতির হবে ভাবা যায় না। আমাদেরও এই ক্যাম্পাস ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে। আশা করি, ভবিষ্যতেও প্রতিদিন এখনকার মতো প্রিয় ক্যাম্পাস উৎসবমুখর থাকবে।’ পড়ালেখার ফাঁকে সংস্কৃতিচর্চাসহ নানামুখী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নতুন শিক্ষার্থীরা মেতে উঠুক এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন কাকাশিসের সভাপতি ও উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী চন্দন সাহা বাপ্পী। ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী খাইরুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘শত বছরের ঐতিহ্যের এই প্রতিষ্ঠান থেকে ভালো মানুষ হয়ে বের হতে চাই। দেশ গড়তে স্বপ্ন দেখতে চাই, দেখাতে চাই।’ সাবেক শিক্ষার্থী চ্যানেল আইয়ের রংপুরের স্টাফ রিপোর্টার সাংবাদিক মেরিনা লাভলী বলেন, ‘আমাদের কলেজ প্রাঙ্গণ সব সময় উৎসবমুখর ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। শত বছরের আয়োজনে সেই উৎসবের রং চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে।’

কারমাইকেল কলেজে পড়েছেন সাহিত্যিক ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনের নেত্রী জাহানারা ইমাম; রাজনীতিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ; সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, কলাম লেখক আনিসুল হক; সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বর্তমানে সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ এ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে নামকরা আরো অনেকে। যাঁদের পদচারণে সেঞ্চুরির আয়োজনকে ইতিহাস হিসেবে বর্ণিল করতে এখন শুধুই অপেক্ষা। শতবর্ষ পূর্তি উদ্যাপনে কলেজ প্রশাসন এরই মধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।