সম্ভাবনার পথে এক ধাপ

১৪ মে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে চলছিল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি পরিবেশিত বাংলাদেশ ইয়ুথ ফেস্টের চূড়ান্ত পর্ব। প্রায় তিন মাস আগে শুরু হওয়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ৪২টি দলের মধ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছে সাতটি দল। এবার তাদের গন্তব্য সিঙ্গাপুর। সেখানে স্পাইকস এশিয়া ২০১৬ উৎসবে অংশ নেবে তারা।

প্রতি দলে ছিলেন দু’জন সদস্য। সামাজিক সংকট, প্রযুক্তিতে নতুন পণ্য, নতুন প্রযুক্তি-বিষয়ক ভাবনা, প্রযুক্তিভিত্তিক বাণিজ্যিক ভাবনা, যে কোনো বাণিজ্যিক উদ্ভাবনী ভাবনা, নারী উদ্যোক্তা এবং পেপার উপস্থাপন- এই সাত ক্যাটাগরিতে দারুণ সব প্রস্তাবনা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

অ্যাকুয়ামাইজ সিকে দলের শাহরিয়ার শরিফ প্রতিযোগিতায় নেমে ভাবছিলেন, ‘সবকিছু ঠিকঠাক হবে তো!’ মাত্র একদিনের প্রস্তুতি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তিনি আর দলের অন্য সদস্য সৈয়দ শামীম। বলছিলেন, ‘আগের দিনই আমি জার্মানি থেকে ফিরেছি। তাই খুব ক্লান্ত ছিলাম। সামাজিক সংকট নিরসনে আমাদের ভাবনা ছিল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘খাবার’। নারীরা হবেন এই প্রতিষ্ঠানের কর্মী। কর্মসংস্থানে বৈষম্য দূরীকরণ আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’ দলটির দুই সদস্যই ঢাবির ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে বিবিএ পড়ছেন।

ইডিআরইউ মাস্টারমাইন্ডস দলের দুই সদস্য মো. আশিকুর রহমান ও মুয়ীদ বিন মিজান। পড়ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষে। তাদের ইডিআরইউ মাস্টারমাইন্ডস দল ব্যাটারির আয়ু দীর্ঘায়িত করবে, এমন একটি প্রযুক্তিপণ্য বাজারজাত করার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল। আশিকুর বললেন, তাদের পরিকল্পনা, ‘এই ডিভাইসটি ব্যাটারি অথবা চার্জারের সঙ্গে সংযুক্ত করলে ব্যাটারি দীর্ঘায়ু পাবে। অনেকটা রেফ্রিজারেটর ও ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার সম্পর্কের মতো।’ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গোলাম রব্বানী ও মেহজাবীন মোস্তফার তৈরি যন্ত্রটির নাম টাইডেল পাওয়ার। রব্বানী বলছিলেন, ‘আমাদের ডিভাইস ফ্যানের ঘূর্ণায়ন শক্তিকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। একেকটি ডিভাইসের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের সাহায্যে তিন থেকে চারটা লাইট ও একটি ফ্যান চালানো যাবে।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বিজয়ী দলের নাম স্টিডি ফিউচার। তাদের প্রকল্পের মাধ্যমে আপনার পড়া একটি বই আরেকজন পাঠকের হাতে তুলে দিয়ে পছন্দমতো একটা ‘না পড়া’ বই পেতে পারেন আপনি। স্টিডি ফিউচারের সদস্য মো. ইমরুল আহসান একটু বুঝিয়ে বললেন, ‘ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে আমরা এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি।’ দলটির অন্য সদস্য শাকিলউজ্জামান শামীম। দু’জনেই বিবিএ পড়ছেন। আরেক বিজয়ী রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর লক্ষ্য একটি ‘সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান’ গড়ে তোলা। যেখানে ইলেকট্রনিক্স পণ্য মেরামত করা যাবে। আবু সাঈদ জানালেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তারা কাজের সুযোগ পাবে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এমন একটা সেবা মানুষের খুব দরকার।’

‘পেপার উপস্থাপন’ বিভাগে প্রতিযোগীদের দেখাতে হয়েছিল ২০২৫ সালে আঞ্চলিক অর্থনীতি কেমন হবে তার সম্ভাব্য ধারণা। বিজয়ী দল দ্য নেটিভস দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের (খুলনা) অর্থনীতির বর্তমান অবস্থান ও ২০২৫ সালে কেমন হবে তা দেখিয়ে বাজিমাত করেছেন। অর্থনীতিতে খুলনা অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে কী করণীয়, সেটিও ছিল তাদের প্রস্তাবনায়। দলের সদস্যরা হলেন- বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের বিবিএ অনুষদের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী মুকিত মোরশেদ ও জারিফ তাজওয়ার। রংপুরে আঞ্চলিক পর্ব শেষে চারটি বিভাগের চ্যাম্পিয়ন দলকে সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেখানে ছিল না ‘নারী উদ্যোক্তা’ বিভাগ। রংপুর বিভাগের সমন্বয়কদের অনুরোধে নারী উদ্যোক্তা বিভাগটি যোগ করা হয়। আর সেই সুবাদেই ঢাকার টিকিট পেয়েছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মর্জিনা মাসুদ এবং শারমিন জাহানের দল স্বপ্ন। তখনো সিঙ্গাপুর যাওয়ার স্বপ্ন তাদের ছিল না। অবশেষে নারী উদ্যোক্তা বিভাগে তারাই হলেন চ্যাম্পিয়ন! প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে খাবারের দোকান বসানোর উদ্যোগের খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন মর্জিনা ও শারমিন। দেশের ঐতিহ্যবাহী সব খাবারের পসরা সাজিয়ে এই দোকান পরিচালনা করবেন দু’জন করে নারীকর্মী। বিজয়ী মাস্টারমাইন্ডস দলের দুই সদস্য মো. আশিকুর রহমান ও মুয়ীদ বিন মিজান বলেন, আশা করি চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা দেশের জন্য সাফল্য বয়ে আনবে। যে সাফল্য ভবিষ্যতে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করবে। আর সে লক্ষ্যে আমরা এখন কাজ করে যাচ্ছি। সে সঙ্গে এ পথ চলায় যারা আমাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। হ