জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস বিশ্বের কাছে অনুপ্রেরণা বাংলাদেশ

১৯৮৮ সাল থেকে গৌরবের এক অনন্য অধ্যায়ের যাত্রা শুরু। জাতিসংঘ ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক দলে ১৫ জন সদস্য পাঠায় বাংলাদেশ। এরপর ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ একটি পূর্ণ শান্তিরক্ষী সেনাবাহিনী নিয়োজিত করে জাতিসংঘ শান্তি প্রক্রিয়া ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য। ওই বাহিনীটি নামিবিয়ায় জাতিসংঘ ট্রানজিশন সহায়তা দলে যোগদান করে। এরপর ২৮ বছর ধরে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ সাহস, যোগ্যতা, নির্ভরতা, নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে শান্তিরক্ষায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রাখছে।

শান্তিরক্ষায় বিশ্বব্যাপী ব্লু হেলমেটধারীদের কাছে এখন অনুপ্রেরণার নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ‘মডেল অব পিস কিপারস’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ অবদানকারী তিনটি দেশের একটি হিসেবে স্থান করে নেয়। বর্তমানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সদস্য সংখ্যা ৭ হাজার ২০০ জন। শান্তিরক্ষায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশি নারী সদস্যরাও। জাতিসংঘ সদর দপ্তর ছাড়াও বিশ্বের ১২টি দেশে তারা নিয়োজিত রয়েছেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় এ পর্যন্ত ১৩০ জন শান্তিরক্ষী প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। গত এক বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ছয় শান্তিরক্ষী। এই প্রেক্ষাপটে আজ রোববার বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস। এ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ শান্তি ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সুনাম বেড়েছে। বিশ্বশান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আগামীতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা বিপদসংকুল ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিয়োজিত থাকেন। শান্তিরক্ষীদের দৃষ্টান্তমূলক সেবা, কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থ মনোভাব ও সাহসিকতা বিশ্ব দরবারে শুধু বাংলাদেশকে পরিচয়ই করায়নি; বরং দেশের ভাবমূর্তি অনেক উজ্জ্বল করেছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব তার বাণীতে বলেন, ৫০টি দেশ থেকে যোগ দেওয়া শান্তিরক্ষীরা বিভিন্ন পদে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভেন্ট, জাতিসংঘ স্বেচ্ছাসেবী ও জাতীয় কর্মী হিসেবে নিয়োজিত। ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে এসেও তারা সবাই এমন বীরত্ব ও বিশ্বাসকে ধারণ করে, যা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম কল্যাণের লক্ষ্যে একটি বৈশ্বিক বাহিনী হিসেবে কাজ করছে।

সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমানে কঙ্গোতে এক হাজার ৯৩২, আইভরি কোস্টে ৩৯৭, লাইবেরিয়ায় ২৭৩, লেবাননে ২৮৬, দক্ষিণ সুদানে ৫১৪, সুদানে (দারফুর) ৬৯৫, পশ্চিম সাহারায় ২৮, মালিতে এক হাজার ৫৫৮, কারে এক হাজার ৮৭, হাইতিতে ৪২০, নেপালে এক, সোমালিয়ায় দুই ও জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাতজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশের এক হাজার ৪৭ জন নারী শান্তিরক্ষী জাতিসংঘ মিশনের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সক্রিয়ভাবে অংশহগ্রহণ করেছেন। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ৬৮টি মিশনের মধ্যে ৫৪টিতে এক লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৯ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কাজ করেছেন। বর্তমানে ৮টি দেশে ১১টি মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের এক হাজার ১১১ জন সদস্য কাজ করছেন। তাদের মধ্যে পুলিশের নারী সদস্যের সংখ্যা ২৮০ জন।

শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করার মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের হৃদয় জয় করেছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। সিয়েরালিয়নে বাংলাদেশের নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়। এ ছাড়া বাংলা ভাষাকে তাদের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দক্ষিণ সুদানের জুবায় বাংলাদেশি কন্টিনজেন্ট অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ কর্তৃক আয়োজিত গণভোট সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে, যা দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

কর্মসূচি: শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আজ সকালে ‘পিসকিপার্স রান’-এর মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ শান্তিরক্ষীদের স্বজন ও আহত শান্তিরক্ষীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের মর্যাদা উজ্জ্বল হচ্ছে: শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা উজ্জ্বল করছেন। দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন- সব কিছুতেই তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে বেসরকারি সংগঠন সিএলএনবির আয়োজনে ‘আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সিএলএনবি চেয়ারম্যান হারুনূর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন কর্নেল (অব.) দিদারুল বীরপ্রতীক।