জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ কাতারেই বাংলাদেশ

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী পাঠানো চারটি দেশের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত ১২ মের তথ্যানুসারে বিশ্বের ১৩টি সংকটাপন্ন দেশে মোট সাত হাজার ২০০ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর চার হাজার ৯২৬, নৌবাহিনীর ৫২৪, বিমানবাহিনীর ৬৩৯ ও পুলিশের এক হাজার ১১১ সদস্য রয়েছেন। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ‘রোল মডেল’ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের ৫৪টি দেশে শান্তিরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রেখে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা দেশের গৌরব বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক অবদান রেখেছেন তাঁরা। ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে জীবন হারাতে হয়েছে ১৩০ জনকে। আহত হয়েছেন ২০০ জন। আজ ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসে তাঁদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্যানুসারে গত ছয় বছরের বেশির ভাগ সময় সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল শীর্ষে। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থান ছিল পাকিস্তান ও ভারতের। তবে গত চার মাস শীর্ষে রয়েছে ইথিওপিয়া। এ ক্ষেত্রে গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। এপ্রিলে ভারতের অবস্থান হয় দ্বিতীয়, পাকিস্তান তৃতীয় ও বাংলাদেশ চতুর্থ। অবশ্য নারী শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও পাকিস্তানের ওপরে। গত এপ্রিল মাসে জাতিসংঘের তথ্যানুসারে বাংলাদেশর ২০৩, ভারতের ৪২ ও পাকিস্তানের ৩১ জন নারী শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছিলেন।

নারী শান্তিরক্ষী : এদিকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সূত্রের তথ্যানুসারে গত ১২ মে জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশের ২০৭ জন নারী শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ২৪, নৌবাহিনীর তিন, বিমানবাহিনীর ৯ ও পুলিশের ১৭১ জন। শান্তিরক্ষা মিশনে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট এক হাজার ৪৭ জন নারী শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ২২১, নৌবাহিনীর ছয়, বিমানবাহিনীর ৪৬ ও পুলিশের ৭৭৪ জন।

আহত ও নিহত : সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য, শান্তিরক্ষায় যে ১৩০ জন জীবন হারিয়েছেন এবং যে ২০০ জন আহত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যের সংখ্যাই বেশি। এ বাহিনীর মোট ১০৩ জন জীবন হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১৮৪ জন। এ

ছাড়া নৌবাহিনীর তিন, বিমানবাহিনীর চার ও পুলিশের ২০ জন জীবন হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন নৌবাহিনীর এক, বিমানবাহিনীর পাঁচ ও পুলিশের ১০ জন।

যে ১৩টি দেশে বাংলাদেশিরা কর্মরত : বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বর্তমানে যে ১৩টি দেশে দায়িত্ব পালন করছেন সেগুলো হচ্ছে—কঙ্গো, আইভরি কোস্ট, লাইবেরিয়া, লেবানন, দক্ষিণ সুদান, সুদান (দারফুর), পশ্চিম সাহারা, মালি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, হাইতি, নেপাল, সোমালিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে। এর মধ্যে আফ্রিকার কঙ্গোতে সর্বোচ্চ এক হাজার ৯৩২ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া মালিতে এক হাজার ৫৫৮ এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে এক হাজার ৮৭ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন।

কর্মসূচি : গতকাল আইএসপিআর জানায়, ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হবে। এদিন সকালে ‘পিসকিপার্স রান’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে এবং বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শহীদ শান্তিরক্ষীদের নিকটাত্মীয় এবং আহত শান্তিরক্ষীদের জন্য সংবর্ধনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ উপস্থাপনার আয়োজন করা হবে। ‘পিসকিপার্স রান’ অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ শান্তিরক্ষীদের নিকটাত্মীয় এবং আহত শান্তিরক্ষীদের জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিটিভি ওয়ার্ল্ড সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরার লক্ষ্যে বিশেষ জার্নাল ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে বিশেষ টক শো প্রচারিত হবে। শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের কার্যক্রমের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি চ্যানেলে ইতিমধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, তিন বাহিনী প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও), পুলিশের মহাপরিদর্শক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সফলতা অনেক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে গতকাল এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সফলতা অনেক, অগাধ সম্ভাবনাও রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করতে হবে। শান্তিরক্ষা মিশনের বৈদেশিক মুদ্রা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

গতকাল দুপুর ১২টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সফলতা’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে কোয়ালিশন অব লোকাল এনজিওস বাংলাদেশ (সিএলএনবি)। সংগঠনটির চেয়্যারমান হারুনুর রশিদের সভাপতিত্বে কর্নেল (অব.) দিদারুল (বীরপ্রতীক) অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা হারুনার রশিদ ভুঁইয়া, বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোকাদ্দেম হোসেন, প্রশিকার পরিচালক নার্গিস জাহান বানু, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন প্রমুখ।