মাতৃমৃত্যু রোধে বিশ্বে উদাহরণ বাংলাদেশ

প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু রোধে চমক সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। গত এক দশকে (২০০১ থেকে ২০১০) মাতৃমৃত্যু ৪০ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। যা বিশ্বের অনেক দেশের কাছে উদাহরণ। দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখন অনেকটাই এগিয়ে আছে। বিশ্বের যে কয়েকটি দেশ জাতিসংঘ ঘোষিত মাতৃমৃত্যু হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। এমডিজি অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যুর হার ২০০০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ কমাতে হবে। যা বাংলাদেশ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাতৃমৃত্যু হার কমে আসার অর্থ হলো, গর্ভধারণকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে নারীর যে চিকিৎসাসেবা, যত্ন ও পরিচর্যা প্রয়োজন হয়, তার মান এখন আগের তুলনায় অনেকটা বেড়েছে। তবে এখনও অধিকাংশ প্রসব অদক্ষ ধাত্রীর হাতে বাড়িতে হচ্ছে। যার ফলে অনেক শিশু ও মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। সর্বশেষ স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণীর মায়েদের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ মা কোন সেবা প্রতিষ্ঠানে সন্তান প্রসব করেন। সবচেয়ে ধনী শ্রেণীর মধ্যে এ হার ৭০ শতাংশ।যা বলছে জরিপ১৯৯০ সালে দেশে প্রতি লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হতো ৫৭০ জন মায়ের। জাতীয়ভাবে মাতৃমৃত্যু হ্রাসের ওপর করা বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু জরিপ (বিএমএমএস) ২০১০ অনুযায়ী, এ সংখ্যা ১৭০-এ নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণায়ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। যা আমাদের পার্শ্ববর্তী অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সর্বশেষ জাতিসংঘ প্রকাশিত ইন্টার এজেন্সি প্রজেকশন-২০১৩-এর তথ্যমতে প্রতি লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৭০ জন মা মারা যাচ্ছেন। সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড মাদার ২০১৫’ এর জরিপে বিশ্বের ১৭৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের মায়েদের স্বাস্থ্যগত অবস্থান ১৩০। এই তালিকায় ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, চীন, জাপানসহ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেছনে ফেলেছে।সরকারের পদক্ষেপমাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যু রোধে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপিত সরকার পরিচালিত স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে গর্ভকালীন নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার সেবা দেয়া হচ্ছে। গ্রাম পর্যায়ে আছে কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রতি ছয় হাজার জনের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিকেও গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা পরীক্ষা দেয়া হয়। আরও আছে সরকারের স্যাটেলাইট ক্লিনিক, যেগুলো গ্রাম পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনার পরামর্শ ও গর্ভকালীন চেকআপ সেবা দিচ্ছে। ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের ৪২১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ এবং ১ হাজার ৩১২টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার পর্যায়ের জন্য আপাতত মোট ২ হাজার ৯৯৬টি পদে মিডওয়াইফ নিয়োগ করা হবে। গ্রামীণ জনপদে মা ও নবজাতকের মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। এ কারণে মূলত সৃষ্টি করা ২ হাজার ৯৯৬টি মিডওয়াইফ পদে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন করা হচ্ছে। দ্রুত মিডওয়াইফের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আপৎকালীন ঘাটতি মোকাবিলা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।যা বলছেন বিশেষজ্ঞরানিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা দক্ষ প্রশিক্ষিত কর্মীর মাধ্যমে সন্তান প্রসব, প্রসূতির সঠিক যত্ন নেয়া, বাল্যবিয়ে ও অল্প বয়সে গর্ভধারণ রোধ, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেন।সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক (হেলথ নিউট্রিশন এন্ড এইচআইভি/এইডস) ডা. ইশতিয়াক মান্নান সংবাদ’কে বলেন, গত এক দশকে আমরা মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে আনতে পেরেছি। কিন্তু সারা পৃথিবীর কথা চিন্তা করলে এই সংখ্যা এখনও অনেক বেশি। ভারতের কেরালায় মাতৃমৃত্যু ৬০-এর কাছাকাছি। শ্রীলঙ্কাতে এই সংখ্যা ৩০-এর কোঠায়। সেই তুলনায় ১৯৪ বা ১৭০ অনেক বেশি। এছাড়া বাংলাদেশে অঞ্চলভেদেও বৈষম্য রয়েছে। সিলেটে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা ৪২৫। যা আফ্রিকার অনেক দেশের তুলনায় ভয়াবহ।মায়েদের গর্ভধারণকালীন নূ্যনতম চার বার সেবা নেয়ার উপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এই সেবা গ্রহণে গর্ভবতী মায়ের একলামশিয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা কিংবা গর্ভের সন্তানের কোন সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান সম্ভব।প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী বলেন, দেশের মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে হলে সবার আগে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হবে। এছাড়া অল্প বয়সে গর্ভধারণ মা ও শিশু দুজনের জন্যই বিপদ ঘটাতে পারে। অন্যদিকে সন্তান প্রসবের জন্য দক্ষ দাই ও সন্তান প্রসব কালে হাসপাতালমুখী হওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে অনেক ভ্রান্ত ধারণা। অনেকে বলেন, হাসপাতালে নিলেই সিজারিয়ানের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসব করানো হবে তাই তারা গর্ভবতী মাকে বাড়িতে রেখে সন্তান প্রসব করাচ্ছেন, এতে প্রসব পরবর্তী সংক্রমণ ও প্রসবকালে মাতৃমৃত্যু ঘটছে। অথবা জীবনব্যাপী সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। দক্ষ সেবাদাতার অভাব ও অসচেতনতা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ। অসচেতনতা ও অশিক্ষার কারণে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশুরাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।নিরাপদ মাতৃমৃত্যু কমাতে পরিবার পরিকল্পনার উপর গুরুত্ব দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী ইসলাম। তিনি সংবাদ’কে বলেন, মাতৃমৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে গর্ভপাত, অপুষ্টি। সঠিকভাবে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করলে দেশে প্রসবকালে যেসংখ্যক মা মারা যায় এর ৩০ শতাংশ এবং যেসংখ্যক নবজাতক মারা যায় এর ১০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব। সরকারি হিসাব মতে দেশের মোট গর্ভধারণের ৩৩ শতাংশই অপরিকল্পিত। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বাংলাদেশে ১৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর কারণ অনিরাপদ গর্ভপাত।গর্ভকালীন কিছু জটিলতার কারণে এখনও মাতৃমৃত্যুর হার আশানুরূপ হারে কমানো সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন এই প্রসূতি চিকিৎসক। তিনি বলেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এক্লামশিয়া, প্রসব পরবর্তী সময়ে রক্তক্ষরণ, খিচুনি এবং মায়ের আয়রনের অভাব।