পরিকল্পিত শিল্পায়নের পথে দেশ

পরিকল্পিত শিল্পায়নের পথে দেশএসএম আলমগীর: দেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়নে বিভিন্ন স্থানে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল, যাতে কর্মসংস্থান হবে দক্ষ-অদক্ষ মিলে প্রায় এক কোটি লোকের। বিশাল এই কর্মযজ্ঞে সরকারের পাশাপাশি অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ডিএফআইডি ও জাইকা। সে সঙ্গে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারাও শামিল হয়েছেন। বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, সবার চেষ্টায় ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ।
অর্থনীতিতে আধুনিক সুবিধা সংবলিত বহুমুখী বিনিয়োগের ধারা সৃষ্টির লক্ষ্যেই এই ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এখানে ব্যাপক শিল্পায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উত্পাদন বৃদ্ধি ও রফতানি আয় বাড়ানো হবে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বহুপণ্যভিত্তিক, বহুমাত্রিক, একক পণ্য, সেবামূলক পণ্য ও পর্যটনভিত্তিক সেবা বা পণ্য উত্পাদন হবে। এসব পণ্য দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সারা বিশ্বে রফতানিও করা হবে। বেজার তথ্য মতে, এই ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হলে এখান থেকে বাড়তি আয় হবে প্রায় চার হাজার কোটি ডলার।
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের খাস
জমি অগ্রাধিকার পাবে। যেখানে খাস জমি নেই সেখানে জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। জোন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য যেসব অনুমতিপত্র প্রয়োজন সেসব সেবা ওয়ানস্টপ সেবা কার্যক্রমের আওতায় প্রদান করা হবে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সার্বক্ষণিকভাবে গ্যাস-বিদ্যুত্সহ অন্যান্য সুবিধা মিলবে।
সরকারের এই উদ্যোগ সম্পর্কে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সকালের খবরকে জানান, দ্রুত শিল্পায়ন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও দেশের সর্বত্র আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানোর উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে সবকিছু যেন সুষ্ঠুভাবে হয় এবং উন্নয়ন কাজ যাতে দুর্নীতিমুক্তভাবে করা যায় সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন-অনেক এলাকায় জমি সংগ্রহে সমস্যায় পড়তে হবে। স্থানীয়দের বাধার সম্মুখীন হতে হবে। এ ছাড়া অধিকাংশ এলাকায় কৃষিজমি অধিগ্রহণ করতে হতে পারে। এক্ষেত্রে কৃষি বনাম শিল্প-এই দ্বন্দ্বের মুখে পড়তে হবে। সরকার কীভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সেটাই দেখার বিষয়।
সার্বিক বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী সকালের খবরকে জানান, সরকারের মূল লক্ষ্য দেশে সুষম উন্নয়ন, পরিকল্পিত শিল্পায়ন আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যেসব জেলা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে সেসব জেলায় উন্নয়ন ঘটানো হবে শিল্পায়নের মাধ্যমে। কোনো জেলা আর পিছিয়ে থাকবে না। সব জেলায়ই একটি করে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে। উন্নত এলাকার পাশাপাশি অনগ্রসর এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলে সুষম ও ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে চাই।
বেজা সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারী নয়, বিদেশি বিনিয়োগকারী টানতে নানা ধরনের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার। কর অবকাশ সুবিধা, আয়ের ওপর কর মওকুফ ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে তাইওয়ান, চীন, জাপান, ফিলিপাইন ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আর দেশের শীর্ষ পর্যায়ের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন।
ইতোমধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে রয়েছে চারটি আর বাকি ছয়টি বেসরকারি উদ্যোগে।
সরকারি উদ্যোগে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল হল-চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, মৌলভীবাজারের শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাগেরহাটের মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও টেকনাফের সাবরাং পর্যটন অঞ্চল। আর বেসরকারিভাবে ছয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চল হল-নরসিংদীর পলাশে এ কে খান গ্রুপ, মুন্সীগঞ্জে আবদুল মোনেম লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় মেঘনা গ্রুপের দুটি, গাজীপুরে বে গ্রুপ ও নারায়ণগঞ্জে আমান গ্রুপ। অঞ্চলগুলোর উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য দেশের উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা মিলবে।
বেজা সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের মধ্যে উদ্বোধনের জন্য সরকারি উদ্যোগে-চট্টগ্রামের আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল, আনোয়ারা-২ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ঢাকা আইটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, জালিয়ারদ্বীপ অর্থনৈতিক অঞ্চল, নারায়ণগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ফেনী অর্থনৈতিক অঞ্চলকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই ছয়টি হচ্ছে-সরকারি উদ্যোগের অর্থনৈতিক অঞ্চল। বেসরকারি উদ্যোগে ঢাকা-আরিচা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে তৈরি করা হচ্ছে।