সেনপাড়ার ডালের বড়ি

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চল ফলগাছা বা সেনপাড়া গ্রামের ৫ শতাধিক পরিবার মাষ কলাইয়ের বড়ি তৈরি করছেন। বংশপরম্পরায় মাষ কলাইয়ের বড়ি তৈরি করে আসছেন সেন পরিবারের সদস্যরা। এই ডালের বড়ি মাছ, মাংস, আলু, লাউ, ফুলকপিসহ রান্না করলে তরকারির স্বাদই বদলে যায়।

শীতকালে নতুন তরকারির সঙ্গে ডালের বড়ির তরকারির স্বাদ যেন অমৃত। ডালের বড়ির তরকারি দিয়ে পেট ভরে ভাত খাওয়া যায়। তাই গ্রামসহ শহরাঞ্চলের মানুষও এ বড়ির স্বাদ নিতে ভোলেন না। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলা-উপজেলা, গ্রামগঞ্জের হাটবাজারসহ রাজধানী ঢাকায়ও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

উৎকৃষ্ট বড়ি তৈরির সময় পৌষ থেকে ফাল্গুন মাস হলেও অভাবের তাড়নায় কার্তিক মাস থেকেই বড়ি তৈরি করা শুরু করেন তারা। ডালের বড়ি তৈরির প্রধান উপাদান খোসা ছাড়ানো মাষ কলাই। অতীতে চাল কুমড়া ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে এ পরিবারগুলো তা আর ব্যবহার করেন না। ফলগাছা গ্রামের সেন পরিবারের নারীরা পূর্বপুরুষের বড়ি তৈরির পেশায় জড়িত।

কিন্তু চাহিদা বেশি থাকায় ও জীবিকার প্রয়োজনে বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়েই বড়ি তৈরি করেন। তবে শীতকালে এ বড়ির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলগাছা বা সেনপাড়া গ্রামকে বলা যায় ডালের বড়ির গ্রাম। এ গ্রামের নারীদের ঘুম ভাঙে কাকডাকা ভোরে। এ সময় পাশের বাড়ির ঢেঁকির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় শান্তনার।

এ সময়টা গ্রামাঞ্চলের নারীদের সকালের রান্নার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। শান্তনা ঘুম থেকে উঠেই মাটির চারায় ভর্তি মাষ কলাই নিয়ে বসেছেন। ফেনিয়ে চলছেন একের পর এক। এখনও অনেক কাজ বাকি। তাকে সূর্য ওঠার আগেই মাষ কলাই ফেনিয়ে বড়ি তৈরি করে ঢেউটিনে সাজাতে হবে। সূর্য উঠলেই তা শুকাতে দিতে হবে।

ঝটপট হাত চালায় শান্তনা। এক এক করে আরো কয়েকজন এসে তাকে সহযোগিতা করতে থাকে। মাষ কলাই দিয়ে তৈরি বড়ির অর্থই শান্তনার পরিবারের জীবন ধারণের প্রধান অবলম্বন। বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত পরিবারের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বৃদ্ধরাও।

কেউ ঢেঁকিতে কলাই ভানেন, কেউ ফেনিয়ে তুলেন। আবার কেউ বড়ি রোদে শুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বড়ি তৈরি করে শুধু শান্তনাই নয়, অভাব ঘুচিয়েছেন ওই গ্রামের রূপসী বালা, পূর্ণিমা রানী, সন্ধ্যা রানী, মালতী রানী, নীলা রানী, সাবিত্রী, পলী বালা, মনিকা রানী ও লিপি রানীসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নারী।

এছাড়া স্কুল-কলেজে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে বড়ি তৈরি করে পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে সংসারে যোগান দিচ্ছেন ওই গ্রামের সুমী রানী (১৮), মায়া রানী (১৭), হেমন্ত বালাসহ (১৬) আরো অনেক স্কুল শিক্ষার্থী। ফলগাছা গ্রামের প্রায় সব পরিবারের বাড়িতে ঝকঝকে টিনের ঘর। বাড়িতে গরু-ছাগলের পাশাপাশি হাঁস-মুরগিও পালছেন গৃহিণীরা। এক সময় ওই গ্রামের মানুষের জীবিকার অভাব ছিল, এখন আর তা নেই। ডালের বড়ি তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দিয়েছে।

বর্তমানে পরিবারগুলোর মধ্যে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ডালের বড়ি ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে পাইকাররা এসে এসব ডালের বড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাজারে বড়ির প্রচুর চাহিদা থাকলেও সেন পরিবারগুলো পুঁজির অভাবে ঠিকমতো বড়ি সরবরাহ করতে পারছেন না।

ডালের বড়ি বিক্রেতা আতিয়ার রহমান জানান, ডালের বড়ির চাহিদা রয়েছে অনেক। তাই বাজারে বড়ি নিয়ে গেলে বিক্রি করতে সময় লাগে না। কান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের সুজা জানান, আগে ওই গ্রামের মানুষের দুঃখ-কষ্টের শেষ ছিল না। বর্তমানে তারা ডালের বড়ি বিক্রি করে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছের। তবে তারা সরকারিভাবে সুযোগ সুবিধা পেলে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারতেন।