উন্নয়নের নতুন এক দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ

জাতীয় গড় প্রবৃদ্ধি এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রগুলোতে ‘উন্নয়নের বিস্ময়’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে, এবং এমনকি ৮০’র দশকের শুরুর দিকেও, অনেক পর্যবেক্ষক সংশয় প্রকাশ করেছিলেন দেশটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকতে পারবে কি-না। কিন্তু আমরা তাদেরকে ভুল প্রমাণ করেছি। আর এটা বাংলাদেশের মানুষের দৃঢ়তা আর আমাদের নানা সাহসী পদক্ষেপের সমন্বয়- যা ক্রমোন্নতির পথ উন্মোচন করেছে। আমাদেরকে নিয়ে গেছে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। আমাদের দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ভিশন-২০২১ এ বাংলাদেশকে ‘সোনার বাংলা’য় পরিণত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। যেমনটা স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে স্বপ্ন এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

২০০৫-২০০৬ সালে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার। এ বছরের মার্চ অবধি সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৬৬ ডলার। গত ৭ বছরে বাংলাদেশ ৬.৩ শতাংশ জাতীয় গড় প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। আমাদের প্রত্যাশা এ বছরে তা ৭.০৫ শতাংশ হবে। বিদেশি মুদ্রার মজুত ২৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। যা ২০০৫-২০০৬ এ ছিল ৩০০ কোটি ডলার। দেশের দারিদ্র্যতার হার ১৯৯০ সালের ৫৬ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫ সালে ২২.৪ শতাংশ হয়েছে।

আমাদের উন্নয়ন মডেলের ভিত্তি হলো স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগানো এবং বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা। আমাদের বিনিয়োগ ব্যবস্থা এ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম উদারনীতিসম্পন্ন। বিনিয়োগ-বান্ধব নীতিগুলো বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে একটি পছন্দের গন্তব্যে পরিণত করেছে। যা দেশের বেসরকারি খাতকে একটি স্পন্দনশীল ও গতিময় অগ্রযাত্রার দিকে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ন্যূনতম। বাংলাদেশের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর, মুডি এবং ফিচ- এর ক্রেডিট রেটিং যথাক্রমে বিবি-, বিএ৩ এবং বিবি। এর সঙ্গে সুস্থিত গতিপথের কথা বলা হয়েছে। আমরা অবাধ এক্সিট পলিসি-সহ শতভাগ ফরেইন ইকুইটি; মুনাফার সহজ রেমিট্যান্স; বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষা; এবং স্থিতিশীল জ্বালানি মূল্যের সুযোগ দিয়ে থাকি।

বাংলাদেশ একটি সমজাতিক দেশ, যে দেশটি নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি নিয়ে গর্ব করে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আমাদের সরকার শূন্য সহনশীলতার নীতি অবলম্বন করে। আর উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থান ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ালেও সরকার তা কার্যকরভাবে প্রতিহত করেছে।

জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে বোঝার পরিবর্তে সম্পদে পরিণত করেছি। আর আজ যখন আমাদের জনসংখ্যার ১০ কোটি ৫০ লাখ মানুষ (৬৫.৬২ ভাগ) যাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪’র মধ্যে- দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখছে তখন আমরা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা ভোগ করছি। আমাদের উন্নয়ন দৃষ্টান্তে দেশের যুব কর্মশক্তিকে আমি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে দেখি।

বিগত সাত বছরে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ ও বন্দর উন্নয়নে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছি। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তিন গুণ বেড়েছে। আর বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছি। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছি।

দেশের স্বপ্নের অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতু (৩৬০ কোটি ডলার ব্যয়ে) আমাদের নিজস্ব সম্পদ নিয়ে নির্মিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দরের সামর্থ্য বিস্তৃত করা হচ্ছে। আরো দুটো গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করা হবে শিগগিরই। একটা পায়রা এবং অপরটি কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে। দেশজুড়ে আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন (এসইজেড) স্থাপন করতে যাচ্ছি যা ৪০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তা ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে। ৩৩টি এসইজেড নিয়ে কাজ চলছে। আর ২০১৭ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১০টি প্রস্তুত হয়ে যাবে।

তৈরি পোশাক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হলেও, আঞ্চলিক মূল বাজারগুলোকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। জাহাজ থেকে শুরু করে চিপস পর্যন্ত সবকিছুই এখন তৈরি করছে বাংলাদেশ। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা, কারিগরি সামর্থ্য বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের প্রতি লক্ষ্য রেখে গৃহীত সমন্বিত নীতির মাধ্যমে আমরা ভ্যালু চেইনের ওপরের দিকে অগ্রসর হচ্ছি।

সেভেন সামিট-এর ইসে-শিমা গ্রুপে নারীদের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে জেনে আমি আনন্দিত। বাংলাদেশে আমরা দেশের অগ্রগতিতে নারীদের মূলধারায় রাখতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। আমাদের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সাহসী নারী-বান্ধব উন্নয়ন কৌশল রয়েছে যার লক্ষ্য হলো নারীদের জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা।

নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক এবং সামাজিক আত্মনির্ভরশীলতার ওপর আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি। আর এ কৌশল ইতিমধ্যে সুফল বয়ে নিয়ে এসেছে। ২০১৪ সালে বৈশ্বিক লিঙ্গ বৈষম্য প্রতিবেদনে (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট) ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৮তম। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আমরা নারীশিক্ষা বিনামূল্যে করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত তা বিনামূল্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে স্নাতোকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত ১ কোটি ৭২ লাখ শিক্ষার্থী বিভিন্ন বৃত্তি কার্র্যক্রমের আওতায় রয়েছে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা বিনামূল্যে খাবার দিয়ে থাকি যা পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়ার হার কমাতে সহায়তা করেছে। একইসঙ্গে তা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে লিঙ্গ সমতা অর্জনে সহায়ক হয়েছে। নারীশিক্ষায় এসব অগ্রসরমান নীতি ও পদক্ষেপ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় শতভাগ ভর্তির হার এবং লিঙ্গ সমতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছে।

নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে আমাদের অবস্থান সপ্তম। বর্তমান সংসদে ৭০ জন নারী রয়েছেন। স্থানীয় সরকারগুলোতে সাড়ে বারো হাজার নির্বাচিত নারী প্রতিনিধি রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদের উপনেতা ও স্পিকার প্রত্যেকেই নারী। রাজনীতি ও নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সাহসী নানা পদক্ষেপ এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে এটা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

শিক্ষায় উন্নতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সন্তান জন্মদানের সামগ্রিক হার ৩.৪ থেকে কমে ২.২ হয়েছে যা ‘জনসংখ্যা প্রতিস্থাপন মাত্রা’ (রিপ্লেসমেন্ট লেভেল) থেকে সামান্য বেশি। নবজাতক মৃত্যুর হার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমেছে। ১৯৯০ সালের হাজারে ৯৭টি মৃত্যু থেকে কমে তা ২০১৫ সালে ৩১ হয়েছে। একই সময়ের ব্যবধানে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে দুই তৃতীয়াংশ। আর প্রসূতি মৃত্যুর হার কমেছে তিন চতুর্থাংশ, যার পরিমাণ লাখে ১৭৬।

মানুষের গড় আয়ু ১২ বছর বেড়ে ৭১ হয়েছে। ১৯৯০ সালে নারীদের প্রত্যাশিত আয়ু ছিল পুরুষদের চেয়ে এক বছর কম। এখন তাদের প্রত্যাশিত আয়ু দুই বছর বেশি। দেশজুড়ে সাড়ে ষোল হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা দিচ্ছি। পুষ্টিগত মান বৃদ্ধি পেয়েছে। আর আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। যেসব উন্নয়নশীল দেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বেশিরভাগ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।

বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে সম্ভাবনার দেশ। আমাদের উন্নয়নের গল্পই তা বলে দেয়। আমরা অমঙ্গলদ্রষ্টাদের ভুল প্রমাণ করেছি। আর আমরা এটা করেছি আমাদের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস আর আমাদের উদ্ভাবনী ও অদম্য উদ্যমের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশকে এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আমরা দেখেছি জাপান কিভাবে ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর খুবই কম সময়ের ব্যবধানে নিজেদের পুনর্গঠন করেছে এবং অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থনৈতিক আরেকটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও দৃঢ়সংকল্প এতোটুকু কম নয়।
আমি জনগণের ক্ষমতার শক্তিতে বিশ্বাস করি। আর আমরা ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্‌যাপনের বছরের মধ্যে মধ্যআয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পথে রয়েছি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের তালিকায় উত্থান হওয়ার প্রত্যাশা রাখি আমরা। একটি উন্নততর বিশ্ব, আরো উন্নত একটি গ্রহ এবং শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী বিশ্বব্যবস্থার জন্য জনগণের জীবনকে রূপান্তর করতে আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আমরা এই অঞ্চলের বাকিদের এবং বিশ্বের সঙ্গে হাত মেলাতে চাই।

[জাপানের দৈনিক দ্য জাপান টাইমসে প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘বাংলাদেশ: এ নিউ ডেভেলপমেন্ট প্যারাডাইম’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ।]