ডাল ও তেলবীজের উৎপাদন বেড়েছে

ডাল ও তেলবীজের উৎপাদন বেড়েছেদেলোয়ার জাহান: চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় দেশে ডাল ও তেল জাতীয় শস্যের উত্পাদন বেড়েছে। গত ৭ বছরে ডালের উত্পাদন বেড়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার টন এবং তেলবীজের উত্পাদন বেড়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ৬ লাখ ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে ৫ লাখ ৮৪ হাজার টন মসুর, ছোলা, মাষকলাই, খেসারি, মুগ ও ফেলন ডাল উত্পাদিত হয়। গত ৭ বছরে চাষের জমি ও উত্পাদন দুই-ই বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ৭ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে ডাল উত্পাদিত হয় ৮ লাখ ৯০ হাজার টন।
অন্যদিকে তেলবীজের উত্পাদনও বেড়েছে। ৭ বছর আগে ৭ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষাসহ তেল জাতীয় শস্য চিনাবাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী, তিল ও তিসিসহ মোট তেলবীজ উত্পাদিত হয় ৮ লাখ ৪০ হাজার টন, যা চলতি অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার টনে।
ডাল চাষে সরকারি নানা উদ্যোগের পাশাপাশি গত কয়েক বছরে চাষিরাও ডাল চাষে ঝুঁকেছে। ডাল চাষ লাভজনক হওয়ায় নিজে চাষের পাশাপাশি পাশের গ্রামগুলোতে ডাল চাষ ছড়িয়ে দিয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীর সলিমপুর ইউনিয়নের চরমিরকামালী গ্রামের ডাল চাষি আবু তাহের।
তিনি জানান, কম সময়ে বেশি লাভ। খরচ নেই। সার, বিষ ও নিড়ানির তেমন প্রয়োজন হয় না। বাজারে দামও বেশি। কলাই, মটর, খেসারি ও মসুর ডাল চাষ করি।
একই তথ্য জানান দেশের দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের ডাল চাষিরা। তারা জানান, ডাল চাষ করতে মাত্র ২ মাস সময় লাগে। উত্পাদন ব্যয়ও কম। বাজারে দাম বেশি থাকায় একবিঘা জমিতে মসুর চাষ করে ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।
ডিএইর তথ্যে দেখা গেছে, দেশের দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, যশোর, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়াসহ উত্তরবঙ্গের জেলা রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁসহ প্রায় প্রতিটি জেলায় ডাল জাতীয় ফসলের আবাদ বেশি হয়ে থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের চাষি পর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও পেঁয়াজ বীজ উত্পাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্পের পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম জানান, দেশে ডাল ও তেল জাতীয় ফসলের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ দানা জাতীয় শস্য উত্পাদনে অনেক এগিয়ে আছে। কিন্তু প্রোটিন ও স্নেহজাতীয় পুষ্টির ফসল উত্পাদন বাড়াতে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ২০০৮ সাল থেকে সরকার কৃষক পর্যায়ে উন্নত ডাল ও তেলবীজ উত্পাদন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ফলে কৃষকদের মধ্যে ডাল ও তেলবীজ উত্পাদনে একধরনের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান যুক্ত হয়েছে। ফলে সঠিক মানের বীজ পাওয়ায় ডাল ও তেলবীজের উত্পাদন বেড়েছে। আগের তুলনায় বর্তমানে উন্নতমানের ডাল ফসলের বীজ সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বারি ও বিনা থেকে গত কয়েক বছরে উন্নতমানের ডাল ফসলের বীজ ছাড় করা হয়েছে, যা চাষ করে ফলন বেশি হচ্ছে। কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। ডিএই থেকে উন্নতমানের বীজ সংরক্ষণ, বিতরণ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে ডাল জাতীয় ফসল উত্পাদন ভালো হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে জনপ্রতি প্রতিদিন ৫০-৬০ গ্রাম ডাল ও ২৫-৩০ মিলিগ্রাম তেলের চাহিদা রয়েছে। চাহিদার তুলনায় দেশে উত্পাদন কম। আমদানি করে পুষ্টিপূরণ করতে হয়। তাই ডাল ও তেল জাতীয় শস্য উত্পাদনের জন্য আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রকল্পটির হিসাবে, জনপ্রতি ৬০ গ্রাম ডাল ও ৩০ মিলিগ্রাম তেল হিসাব করলে দেশে এখনও ডালের ঘাটতি রয়েছে ২৬ লাখ ৫৮ টন, তেল বীজের ঘাটতি ১৩ লাখ ৭৮৬ টন।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক ডাল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ওমর আলী বলেন, জমির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হেক্টরপ্রতি ডালের ফলনও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি হেক্টরে ডাল উত্পাদিত হয় ১ দশমিক ১১ টন। কয়েক বছর আগেও দশমিক ৯০ টন ছিল। উন্নতমানের জাত ও কৃষকদের আগ্রহের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। এছাড়া কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে একাধিক মসুর, মুগ ও ছোলাসহ অন্য ডালের উফশী জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এসব জাতের উত্পাদন ও অণু পুষ্টি বেশি রয়েছে। বিশেষ করে বারি মসুর ৬-এ আয়রনের পরিমাণ ৮৭ পিপিএম ও জিঙ্ক ৬৩ পিপিএম রয়েছে।
তিনি বলেন, ডিএইর পক্ষ থেকে চাষিদের বোরো ও আমন মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে স্বল্পমেয়াদি ডাল ফসল উত্পাদনে উত্সাহিত করে ডাল উত্পাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমন ও বোরো মৌসুমের মাঝে মাত্র ২ মাসের মধ্যে একবিঘা জমিতে একজন কৃষক মটরশুঁটি চাষ করে লক্ষাধিক টাকা আয় করতে পারে। অনেক কৃষক বাড়তি আয় করতে ডাল চাষকে বেছে নিয়েছে।
ডিএইর হিসাবে, ২০১৩-১৪ বছরে ৭ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে ডাল জাতীয় ফসল মসুর, ছোলা, মাষকলাই, খেসারি, মুগ ও ফেলন মোট ডাল উত্পাদন হয়েছে ৮ লাখ ২৪ হাজার টন। এই সময়ের মধ্যে হেক্টরপ্রতি দশমিক ৯৬ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ১১ টন। একই বছরে ১ লাখ ৮২ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার টন মসুর উত্পাদিত হয়। একই বছর খেসারি উত্পাদিত হয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার টন।
অন্যদিকে সরিষাসহ তেলজাতীয় শস্য চিনাবাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী, তিল ও তিসি উত্পাদনে কৃষকদের আগ্রহ দেখা গেছে গত কয়েক বছরে।
ডিএইর হিসাবে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ৭ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে ৮ লাখ ৪০ হাজার টন তেলবীজ উত্পাদিত হয়, যা চলতি অর্থবছরে বেড়ে ৮ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে উত্পাদিত হয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার টন।
তেলজাতীয় শস্যের মধ্যে সরিষার জনপ্রিয়তা, চাহিদা ও উত্পাদন বেড়েছে। আবার কেউ কেউ ধান চাষে লোকসান কমাতে তেলবীজ চাষে মনোযোগী হয়েছে।
জেলা পর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) কর্মকর্তারা জানান, নদী তীরবর্তী জেলাগুলোতে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বেড়েছে। কয়েক বছর আগে আমন ধান কেটে নেওয়ার পর থেকে বোরো আবাদের জন্য জমি ফেলে রাখার কারণে কৃষকরা সরিষা উত্পাদন থেকে সরে আসতে শুরু করে। গত কয়েক বছরে সরিষা তেলের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে দামও বেড়ে যায়। সরিষার দাম বাড়ার পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে সরিষা খলের ব্যবহার বাড়ায় অনেক কৃষক সরিষা চাষ করছে।
একাধিক কৃষিবিদ জানান, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, রংপুর, শেরপুর, কুমিল্লা ও নওগাঁয় প্রচুর পরিমাণে সরিষার চাষ হয়েছে।
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার আমতলী গ্রামের কৃষক মো. আলমগীর হোসেন জানান, সরিষা আবাদে তেমন কোনো খরচ হয় না। প্রতিবিঘায় ৪-৫ মণ সরিষা উত্পাদিত হয়। মৌসুমে প্রতি মণ সরিষা ২ হাজার টাকা বিক্রি হয়ে থাকে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ সরিষার দাম প্রায় ২৪০০ টাকা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আবদুল লতিফ আকন্দ জানান, খুব কম খরচে অল্প সময়ে তেলবীজ উত্পাদন করে চাষিরা লাভবান হতে পারেন। বারি উদ্ভাবিত স্বল্প সময়ে উত্পাদিত ও দেড় থেকে দুই গুণ ফলন বেশি জাত ‘বারি সরিষা-১৪’, ‘বারি সরিষা-১৫’ জাত দুটি কৃষক পর্যায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। জাত দুটির হলুদ বীজে অন্য বীজের চেয়ে তুলনামূূলকভাবে ৩-৪ শতাংশ বেশি তেল পাওয়া যায়।’
আমন ও বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি ৮০-৮৫ দিন সময় পাওয়া যায়, সে সময়ে জাত দুটি চাষ করা সম্ভব হওয়ায় কৃষকরা আবার সরিষা চাষে ফিরে এসেছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ভোজ্য তেলের বিদেশ নির্ভরতা কমতে অবশ্যই সরিষাসহ অন্য তেলবীজের উত্পাদন বাড়াতে হবে।