খেলতে খেলতে পড়ি

ইয়ের পাতা উল্টালেই যে রঙের বর্ণছটা, চোখ ধাঁধানো মজার মজার ছবি আর দিদিমণির গল্প বলার নিখুঁত গাঁথুনি যে কাউকে নিয়ে যেতে পারে কোনো পাতালপুরীর রূপকথার কল্পরাজ্যে। সেই কল্পরাজ্য ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার হায়দ্রারাবাইদ গ্রামে আলোঘর শিশু শিক্ষাকেন্দ্র। সৃজনশীল ক্লাসে বসে শিক্ষিকা মন্দিরা দিদির কণ্ঠে ভালুক ও দুই বন্ধুর মজার গল্পে আপনিও হয়তো যাবেন হারিয়ে। নানা রকম অঙ্গ ভঙ্গিমায় ছন্দের তালে তালে মন্দিরাদির এমন গল্প বলার ধরন দেখে নিজেকে আলোঘরের শিশু শ্রেণীর একজন ছাত্র হিসেবে মনে করলে খুব একটা ভুল হবে না। এ উপজেলায় পাহাড়ি আদিবাসী শিশুসহ সমাজের হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের মানসম্মত শিক্ষার আদলে এনে মন্দিরার মতো শিক্ষিকাদের সমন্বয়ে অজপাড়াগাঁয়ে গড়ে তোলা ছোট ছোট এসব আলোঘরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে হতদরিদ্র ছিন্নমূল শিশুদের মধ্যে ।

সুযোগ বঞ্চিত ও সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিশুদের ক্ষমতায়ন, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরশীলতা ও সামাজিক সংযোগের উন্নয়ন করা এবং সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিশুদের প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ে মানসম্মত মৌলিক শিক্ষার অধিকার লাভ নিশ্চিত করা এবং তাদের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মূল স্রোতধারায় সংযুক্ত করার জন্য সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে এখানে। এই স্কুল প্রকল্পটি ২০১১ সালে ফুলবাড়িয়াসহ সারাদেশে প্রায় ১১ হাজার স্কুল প্রতিষ্ঠা করে যাত্রা শুরু করে। আলোঘর প্রকল্পটি মূলত ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ অবস্থায় বসবাসকারী, অত্যন্ত গরিব, আদিবাসী শিশু এবং যারা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু তাদের শিক্ষার জন্য মনোপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করার মূল লক্ষ্য অর্জন করে যাচ্ছে।

প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে শুরু হয় আলোঘরের শিশু শ্রেণীর ক্লাস, এরপর বেলা ১১টা থেকে প্রথম শ্রেণীর। একটি আলোঘর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে একজন করে শিক্ষিকা থাকেন। আলোঘর প্রকল্পে আলোঘরের প্রতিদিনকার ক্লাসের চিত্রই যে এমন। বইয়ের পাতা উল্টালেই যে রঙের বর্ণছটা, চোখ ধাঁধানো মজার মজার ছবি আর দিদিমণির গল্প বলার নিখুঁত গাঁথুনি যে কাউকে নিয়ে যেতে পারে কোনো পাতালপুরীর রূপকথার কল্পরাজ্যে। সূচনা থেকে হায়দ্রাবাইদ শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষকতা করে আসা মন্দিরা চাম্বু গং জানান, এই গ্রামেই আমার বাড়ি, প্রতিদিন সকালে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেকে শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসি। আসার পর আমি ক্লাসরুম ঝাড়ূ দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে শিশুদের জন্য বসার উপযোগী করে তুলি। এরপর কার বাড়িতে আজ কী খবর আছে এ নিয়ে আমাদের ১০ মিনিটের প্রতিদিনের পর্ব ‘খবর বলা পর্ব’ বা কুশল খবর পর্ব দিয়ে শুরু হয় আলোঘরের সুপ্রভাত কার্যক্রম। খবর পর্বে আমি শিশুদের জিজ্ঞেস করি, আজ তোমাদের কার কী খবর আছে আমাকে বলো তো, তখন কেউ বলে, ‘আপা আইজ না আমি আওনের সময় দেহি একটা বেডা ছাগল টাইনা টাইনা লইয়া যাইতাছে, আবার কেউ বলে আমার আব্বা সকালে আমার লাইগা নতুন জুতা কিন্না আনছে। এমন অদ্ভুত অদ্ভুত খবরের মুক্ত খই ফুটে উঠে প্রভাতের কচি কচি মুখ থেকে ।

ভাষাভিত্তিক ক্লাস, ফ্লাস কার্ড আর লাঠি, কাঠি, বিচি, ফুল ইত্যাদি বাস্তবধর্মী উপকরণের মাধ্যমে গণিত শিক্ষণ সর্বশেষ টেবিল কাজ যাকে আবার বাংলা টেবিল, গণিত টেবিল, সৃজনশীল এ তিন ভাগে ভাগ করার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলে পাঠদান। প্রতিটি আলোঘরে শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে দুই শিফটে ৩০ জন করে শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। কাক, শিয়াল, দুই বন্ধু, কাঁঠাল খাব, রাজা-রানী, পুতুলের বিয়ে ইত্যাদি গল্পের বই থেকে গল্প বলার ছলে চলে শিশুদের মধ্যে আনন্দময় পাঠদান। এসব বই থেকে শিশুদের শোনানো হয় মজার মজার গল্প। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার যে যার মতো গল্প আর ছবি আঁকার পর ছবিগুলো শিক্ষিকা টানিয়ে দেন সাপ্তাহিক দেয়ালিকায়, যা টানানো থাকে পুরো সপ্তাহজুড়ে। প্রচলিত শিক্ষার বাইরে এভাবেই চলে আলোঘরের আধুনিক উপায়ে পাঠদান কার্যক্রম।

হায়দ্রাবাইদ ঘর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষিকা মন্দিরা চাম্বু গং, এই গাঁয়েরই মেয়ে । স্কুলের গণিত শিক্ষিকা রিতা দিদি ছিলেন তার সব আদর্শ-অনুপ্রেরণার উৎস। একবার রিতা দি অসুস্থ হয়ে পড়লে চরম শিক্ষক সংকটে পড়ে স্কুলটি। তখন ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী মন্দিরার কাঁধে দায়িত্ব পড়ে তার স্কুলের ছোট ছোট ভাই-বোনদের পাঠদান পরিচালনার। সে সময় মন্দিরা ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী, তাই নিজেই হয়েছে নিজের ক্লাসের গণিত শিক্ষিকা। হয়তো সেই থেকেই শিক্ষকতা বিষয়টা কী, সমাজে একজন শিক্ষকের কী মর্যাদা, সামাজিক দায়িত্ব থাকতে পারে- এ ছাড়াও তিনি নিজের ভাবনাগুলোকে যখন সব ছাত্রছাত্রীর ভেতর ছড়িয়ে দিতে পারছেন, তখন থেকেই সেই মেধাবী মেয়েটি মনে মনে স্থির করে নেয় বড় হয়ে শিক্ষিকা হবে। তারপর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবে গ্রামের অবহেলিত শিশুদের মধ্যে। সব সময় এ গ্রামের মানুষ উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটায়, আমি দেখেছি বিভিন্ন সময় সরকারের বনবিভাগ ছুটে আসে সীমানা পিলার আর কাঁটাতার নিয়ে, ভিটে-মাটি রক্ষার্থে দফায় দফায় হয়েছে আন্দোলন-সংগ্রাম, লাশ পড়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালীরাও সুযোগ কম নেয়নি। যার দরুন অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বেশকিছু সম্প্রদায়। তবুও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে কিছু কিছু অধ্যায়। তাই নিজের কথা না ভেবে, নিজের সংসার, পরিবার-পরিজনদের দায়িত্ব পালন শেষে বরাবরই সুযোগ খুঁজে বেড়িয়েছি মানুষগুলোর পাশে থাকার, হয়তো লাঠিসোটা নিয়ে নয়, কারিতাসের হাত ধরে গড়ে ওঠা আমার ছোট্ট এই আলোঘর নিয়ে। কেননা শিক্ষার আলোই পারে এই আঁধার থেকে মানুষকে মুক্ত করতে।

মন্দিরা আরও বলেন, যেহেতু এই শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের প্রতিটা শিশুই অতি দরিদ্র, তাই তাদের পড়াশোনার জন্য কারিতাস সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাদের নিজস্ব বই-খাতাসহ সব সরঞ্জাম প্রদান করে থাকে। শুধু তাই নয়, আলোঘরের যে কোনো শিশুর সাধারণ রোগ-শোকে কারিতাসের নিজস্ব ডিসপেনসারিতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিশুদের ওষুধ প্রদান করা হয়। স্থানীয় বাবুলের বাজারে কারিতাস সুইজারল্যান্ডের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় তথ্যসেবা কেন্দ্রে। যার মাধ্যমে জনগণকে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গ্রামের শিক্ষিত ছাত্রছাত্রী তথা বেকার যুবকদের চাকরির আবেদনসহ সব সরকারি-বেসরকারি বিষয়ে তথ্যসেবা প্রদান করে দারিদ্র্য হ্রাসের উদ্দেশ্যে ইপিএসপিপিআর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও মেধা বিকাশে শিশুদের পরিচিতি ঘটাতে উপজেলার আলোঘরের শিশুদের মাসে অন্তত তিনদিন এই আইসিটি কেন্দ্রে এনে মজার মজার ছবি, শিক্ষামূলক কার্টুন, মুভিসহ শিক্ষামূলক নানা দিক শিশুদের সামনে তুলে ধরে বলে জানান মন্দিরা। সারাদেশে কারিতাসের এমন আলোঘর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ১০০৫টি, যার মধ্যে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, টাঙ্গাইলের ১৫টি উপজেলার ৫৩টি ইউনিয়নে প্রায় ১৬৯টি স্কুল, যার মধ্যে ফুলবাড়িয়ার ৪টিতে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।