কাগুজে নয়, সুন্দরবনের বাঘে রূপান্তরিত হবে দুদক

অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সচিব ইকবাল মাহমুদ। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৯৮১ ব্যাচের এ কর্মকর্তার রয়েছে সততা, দৃঢ়তা এবং নিষ্ঠার খ্যাতি। চাকরিজীবনে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ দেশ-বিদেশে ২৪টি দফতরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ ২০১৫ সালে তিনি বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালকের পদ থেকে অবসরোত্তর ছুটিতে যান। ১৩ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান ইকবাল মাহমুদ। চলতি বছরের ১৪ মার্চ এ পদে যোগ দিয়েই বেশকিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন, যাতে দুদক সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে। ‘নখদন্তহীন বাঘ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া দুদকের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে নেয়া তার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করেছেন তিনি। বুধবার দুদক কার্যালয়ে ইকবাল মাহমুদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার সাঈদ আহমেদ।

যুগান্তর : দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের দু’মাস হল। এসে কি দেখলেন, কি পেলেন?

ইকবাল মাহমুদ : হ্যাঁ, দু’মাসতো হলই। যোগদানের পর প্রথমেই যে বিষয়টি আমার নজরে পড়েছে সেটি হচ্ছে, অনুসন্ধানের সময়সীমা। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, অনুসন্ধানের একটি টাইম ফ্রেম রয়েছে। বিধিতে বলা আছে, ৬০ কার্য দিবসের মধ্যে এটি শেষ করতে হবে। এ বিষয়টি অনুসৃত হচ্ছে না। এক-দুই বছর লেগে যাচ্ছে অথচ প্রতিবেদন দাখিল হয় না। এ বিষয়টিতে আমার খুব দুঃখ লেগেছে। ধরুন, যে লোকটি নিরপরাধ, নির্দোষ কিংবা ধরুন অপরাধই করেছেন- তিনি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে জানতে পারছেন না তার অনুসন্ধান কিংবা তদন্তটির কি হল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান-তদন্ত সম্পন্ন না হওয়ায় যাদের ভোগান্তি হয়েছে, তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।

যুগান্তর : কার্যকর দুদক প্রতিষ্ঠায় আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি? ‘নখদন্তহীন বাঘ’ পরিচিতি পাওয়া দুদককে আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে কোনো রোডম্যাপ আছে কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : এটি একটি কঠিন প্রশ্ন। আমরা চেষ্টা করছি। দুদকের কোনো কৌশলপত্র ছিল না। এটি প্রণয়নের চিন্তা আমাদের রয়েছে। এর আগে আপনাদের (গণমাধ্যম) সঙ্গে বসব। পেশাজীবী, বেসরকারি সংস্থা এবং সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসব। তাদের মতামত নেব। আশা করছি কৌশলপত্র প্রণয়নের পর দুদক কাগুজে বাঘ থেকে সুন্দরবনের প্রকৃত বাঘে রূপান্তর হবে। যদিও আমি ‘বাঘ’ বলতে রাজি নই। কারণ, দুদক মানুষের জন্য ভীতিকর কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। যারা দুর্নীতি করে শুধু তাদের জন্য আতংকের। বলা চলে দুদক মানুষের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে উন্নীত হবে।

যুগান্তর : সবার কাছে প্রতিষ্ঠিত অনেক দুর্নীতিবাজ দুদকের অনুসন্ধানে ছাড়া পেয়েছেন। জনমতের বিপক্ষে এ অবস্থানের কারণে দুদকের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বর্তমান কমিশন এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। জনগণের আস্থা অর্জন না করতে পারলে সেটি হবে আমাদের অপরাধ। আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতেই হবে। মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত কোনো দুর্নীতিবাজকে দুদক ছেড়ে দিয়েছে- এমন ঘটনা বোধ করি গত দু’মাসে একটিও ঘটেনি। দুদককে তথ্য-প্রমাণ বা রেকর্ডের ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। অনেক দুর্নীতির খবরই গণমাধ্যমে প্রকাশিত, প্রচারিত হয়। মুখে মুখেও শোনা যায়। কিন্তু এর সপক্ষে কাগজপত্র পাওয়া যায় না। এটি দুদকের জন্য একটি উভয়সংকট। কমিশন আইনের দড়িতে বাঁধা। তবে যা বললেন, এমনটির সংখ্যা সম্ভবত খুব সামান্যই হতে পারে।

যুগান্তর : বলা হয়, সর্ষের মধ্যেই ভূত। দুদক নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত। দুদক কর্মকর্তারা নিজেরা দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এ অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসতে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : কথাটি আমিও মানুষের কাছ থেকে শুনেছি। দুদক কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতিবাজ থাকতে পারেন। তারাও তো এ সমাজেরই মানুষ। তবে আমার তো দু’মাস হল। এর মধ্যে দুর্নীতিবাজ কোনো কর্মকর্তাকে দেখিনি। আমি তো এসেই বলেছি, আগের কোনোকিছু নিয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞাস করব না। তবে নতুন করে কেউ দুর্নীতি করবেন না। যদি করেন তাহলে একবারই শুধু সুযোগ পাবেন- দ্বিতীয়বার নয়। তারা এখন পর্যন্ত কথা রেখেছেন। কোনো কোনো অফিসারের বিরুদ্ধে আগে থেকেই কিছু অভিযোগ ছিল। আমরা সেটি আমলে নিয়ে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। আরও উদ্যোগ অচিরেই দেখবেন। সত্যি বলতে, আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই। অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে চাই। আমরা যদি নিজেরাই ঠিক হতে না পারি তাহলে সেটি হবে আমাদের জন্য ক্ষতিকর। আমরা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত না হই তাহলে অপবাদ নেব কেন? কেউ যদি বলে যে, দুদকের অমুক কর্মকর্তা ঘুষ খান, তাতে এটিই বোঝায় যে- আমিও এর ভাগ পাই। তাহলে কেন এর দায় আমরা নেব? তবে আমি এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা কারও কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন বলে দেখিনি, শুনিনি।

যুগান্তর : দুদক দীর্ঘ সময় নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। মামলা করে। তদন্ত শেষে চার্জশিটও দেয়। পরে মামলাটি চূড়ান্ত বিচার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিকতা দেখা যায় না। এ বিষয়ে বর্তমান কমিশন ব্যতিক্রম কিছু করবে কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : এটি খুব ভালো প্রশ্ন। কারণ ৪০ থেকে ৫০ ভাগ মামলায়ই কোনো সাজা হচ্ছে না। এমনটি হচ্ছে নানা কারণে। আইন শাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এ থেকে উত্তরণে আমরা লিগ্যাল উইংকে রিফর্ম করছি। ইতিমধ্যেই জেলা পর্যায়ে কিছু আইনজীবী বাদ দিয়ে নতুন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছি। কেন্দ্রীয় পর্যায়েও বেশ কয়েকজন আইনজীবীকে নিয়োগ দিয়েছি। আমরা তাদের সঙ্গে মিটিং করছি। বোঝার চেষ্টা করছি, আমাদের ঘাটতি কোথায়। কোন মামলা কোনদিকে যাচ্ছে সেটি দেখার জন্য আইনজীবীদের ওপর মনিটরিং বাড়িয়েছি। পাশাপাশি আইনজীবীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যাদের দিয়ে কাজ চলছে না তাদের বাদ দিয়ে বেশ কয়েকজন নিবেদিত, তরুণ, উদ্যমী এবং প্রতিশ্র“তিশীল আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তবে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন- এমন বেশ ক’জন নিবেদিতপ্রাণ আইনজীবী আমাদের এখনও রয়েছেন।

যুগান্তর : প্রশাসন ক্যাডারে বহু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে দুদকের বেশকিছু মামলা তদন্ত ও অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া চলমান অভিযানে নৈশপ্রহরী, স্কুলশিক্ষক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী গ্রেফতার হয়েছেন। অথচ প্রশাসন ক্যাডারের একজনও এ পর্যন্ত গ্রেফতার হননি। আপনি নিজেও প্রশাসন ক্যাডার থেকে এসেছেন। এ কারণেই কি বৈষম্য?

ইকবাল মাহমুদ : এ প্রশ্নটি সঠিক নয়। আমি এখন যেখানে বসেছি এটিই আমার পরিচয়। প্রশাসন ক্যাডার হলেও এখানে সেই পরিচয়ে নেই। সব ক্যাডারের অনুসন্ধান এখানে রয়েছে। গ্রেফতারের কথা বলছেন? গ্রেফতার কখন করা হয়? যখন কারও বিরুদ্ধে এফআইআর থাকে। যাদের পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। দুদকে তিন হাজার মামলা রয়েছে। অনেক আসামিই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যাদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামি তো এখনও বাইরেই রয়েছেন। এটি আসলে কোনো বৈষম্য নয়।

যুগান্তর : সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপিদের ক্ষমতা বেশি। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও বেশি। তাদের সম্পদ অনুসন্ধান করবেন কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : আগে বলুন, কেন তাদের অনুসন্ধান করা হবে না? কাউকে ছাড় দেয়ার কথা দুদক আইনে নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে অবশ্যই অনুসন্ধান হবে।

যুগান্তর : নোটিশ করে দুদকে ডেকে এনে বেশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন অভিযোগের বিষয়ে তলবি নোটিশ দিলেও গ্রেফতারের ভয়ে অনেকে দুদকে আসছেন না। এতে তদন্ত ও অনুসন্ধানের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : আমার জানা মতে, ডেকে এনে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। অনুসন্ধান পর্যায়ে কাউকে গ্রেফতার করা হয় না। যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে তারাই ভয়ে দুদকে আসতে চান না। এফআইআর থাকলে দুদক কর্মকর্তা কেন, আপনিও এজাহারভুক্ত আসামি ধরে দুদকের হাতে তুলে দিতে পারেন। গ্রেফতারে অনুসন্ধানের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার কোনো কারণ নেই। এ যাবৎ আমরা দুদক কর্মকর্তাদের ৮৪৩টি শোকজ নোটিশ দিয়েছি। এতে তারা সাবধান হবেন। ‘টাইম লাইন’ ঠিক রাখবেন। অভিযোগ সংশ্লিষ্টরা যেন জানতে পারেন যে, নির্ধারিত সময়ে তারা ফলাফল পাবেন। আমি অবাক হচ্ছি, আপনারা (সাংবাদিক) কেন এতদিন এ বিষয়টি নিয়ে লেখেননি? এখানে তো আপনাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে।

যুগান্তর : ঘোষণা দিয়েছিলেন, জামিন ছাড়া দুদকের কোনো আসামি বাইরে থাকতে পারবে না। এর পরপরই শুরু হল গ্রেফতার। কিন্তু এ গ্রেফতারে চুনোপুঁটিদের ধরা হচ্ছে। রাঘব বোয়ালরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বলা হচ্ছে, দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা নাকি তাদের খুঁজে পাচ্ছেন না। বিষয়টি আসলে কী?

ইকবাল মাহমুদ : বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। আইনের চোখে সবাই সমান। চুনোপুঁটি-রাঘব বোয়াল বলে দুদক আইনে কিছু নেই। এ বিষয়ে আমার স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, যারা বিজ্ঞ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন তাদের আমরা ধরতে পারছি না। আইনগত কিছু বিধি-নিষেধও রয়েছে।

যুগান্তর : দুদক একটি স্বশাসিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এটির চেয়ারম্যান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো ধরনের চাপ অনুভব করেন কিনা? কোনোভাবে বিব্রতবোধ করেন কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : গত দুই মাসে আমি কোনো চাপ অনুভব করিনি। তাছাড়া যে চাপই আসুক সেটি সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের রয়েছে। চব্বিশটি চাকরি করেছি। কখনও চাপের মুখে নতি স্বীকার করিনি। আমার কোনো ভয়ও নেই। বিব্রতবোধেরও কারণ নেই। আমার আত্মীয়-স্বজনও যদি দুদকের অনুসন্ধান-তদন্তের মাঝে পড়ে যায় তাতেও বিব্রত হব না। আমি চাকরি করতে আসিনি। এসেছি একটি মিশন নিয়ে। চাপ, ভয় কিংবা বিব্রতবোধ কোনোটিই আমার নেই।

যুগান্তর : বেসিক ব্যাংক দুর্নীতির ৫৬টি মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু এবং পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের আসামি করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন, কমার্শিয়াল অডিট রিপোর্টসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় সংসদেও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রীও একাধিকবার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। দুদকের তদন্তের আওতায় শেষ পর্যন্ত মূলহোতারা আসবে কি?

ইকবাল মাহমুদ : বেসিক ব্যাংক দুর্নীতির বিষয়ে ৫৬টি মামলা হয়েছে। হয়তো আরও মামলা হবে। মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাজের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যার কথা বললেন (শেখ আবদুল হাই বাচ্চু) তাকে তদন্ত প্রতিবেদনে আসামি করা হবে কিনা এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। তদন্ত কর্মকর্তারা যদি তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পান তাহলে চার্জশিটে আসামি করা হবে। এজাহারে নাম না থাকলেও রেকর্ডে প্রমাণ মিললে চার্জশিটে তিনি বা তারা আসামি হবেন।

যুগান্তর : বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণের নামে শুধু অর্থ আত্মসাতের মামলা হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর সময় ব্যাংকটিতে দুর্নীতি হয়েছে জনবল নিয়োগ, ক্রয়সহ নানা ক্ষেত্রে। দুদক সেসবের অনুসন্ধান করবে কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : এ মুহূর্তে আমি এর উত্তর দিতে পারছি না। এখনও ৫৬ মামলার তদন্ত চলছে।

যুগান্তর : হলমার্ক কেলেংকারির ঘটনায় শুধু ফান্ডেড অংশের বিষয়ে দায়ের হওয়া মামলার বিচার চলছে। নন-ফান্ডেড অংশের অনুসন্ধানে হাত দিয়েছিল বিগত কমিশন। এটির অগ্রগতি কী?

ইকবাল মাহমুদ : শুধু সোনালী ব্যাংক নয়, অনেক বেসরকারি ব্যাংকের মামলায় নন-ফান্ডেড ঝামেলাটি রয়েছে। আজও একটি কাগজে দেখলাম, কোন কোন ব্যাংকে কত হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। নন-ফান্ডেড অর্থই খেলাপি হয়। এর পেছনে একটি বিষয় ঘটছে। সেটি হচ্ছে, বন্ধকী সম্পত্তির অতিমূল্যায়ন। ব্যাংকের নিযুক্ত সার্ভে প্রতিষ্ঠান যোগসাজশ করে ঋণগ্রহীতার সম্পত্তিটি অতিরিক্ত মূল্য দেখায়। যেটি বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। আমরা তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছি ব্যাংকগুলোতে কীভাবে, কোন মাপকাঠিতে সার্ভেয়ার নিয়োগ দেয়া হয়। এদের ওপর কোনো মনিটরিং আছে কিনা।

যুগান্তর : পানামা পেপারস কেলেংকারির অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারদলীয় অনেক ব্যক্তি এবং প্রভাবশালীর তথ্য বেরিয়ে আসছে। তাদের বিষয়ে কাজ করতে দুদক বিব্রত কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : পানামা পেপারস কেলেংকারির অনুসন্ধান চলছে। কাউকে কাউকে দুদকে ডাকা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ চলছে। নিচ থেকে উপরে উঠছি। আমরা একটি বিষয় নিশ্চিত করতে চাই যে, একটি যৌক্তিক পরিণতি আপনারা এ অনুসন্ধানে দেখতে পাবেন। হয়তো কিছুটা সময় লাগবে। এটি একটি কার্যকর অনুসন্ধান হবে। সরকারদলীয় ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও আমরা এতে মোটেও বিব্রত নই। কারও দলীয় পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান এখানে মুখ্য নয়।

যুগান্তর ঃ স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনায় দুদকের আইনগত কোনো দুর্বলতা কিংবা ঘাটতি আছে কিনা? করণীয় কী?

ইকবাল মাহমুদ : আমি এখনও দেখছি। মনে হয় আইনের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। কিছুটা পরিবর্তন বোধ হয় আনতে হবে। বুঝতে আরও সময় প্রয়োজন।

যুগান্তর : দুদক আইনে কয়েকটি ধারা ‘কুমারী ধারা’ হিসেবে পরিচিত। এক যুগেও ধারাগুলোর বাস্তবায়ন বা ব্যবহার হয়নি। যেমন ৩৩(১)(২) ধারা (নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠন সংক্রান্ত), ৩৭ ধারা (আইনটির ইংরেজি অনুবাদ সংক্রান্ত), ২৮(গ) (মিথ্যা তথ্য প্রদানের শাস্তি সংক্রান্ত)। ধারাগুলো বাদ দেয়ার কথাও দুদক কখনও বলে না। এসবের বিষয়ে দুদকের বর্তমান অবস্থান কী?

ইকবাল মাহমুদ : নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের বিষয়ে চিন্তা করছি। এটি হওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছি। আইনের ইংরেজি অনুবাদও হয়ে গেছে। অচিরেই হয়তো গেজেট হবে। মিথ্যা তথ্য দেয়া, তথ্য না দেয়া কিংবা অসহযোগিতা সংক্রান্ত ধারাটি আমরা এখন প্রয়োগ শুরু করব। ১৯(৩) ধারায় অপরাধ সংঘটিত হলে এটিরও প্রয়োগ এখন করব আমরা।

যুগান্তর : স্বপ্রণোদিত হয়ে দুদক চেয়ারম্যানের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নজির রয়েছে। একইভাবে আপনিও কি নিজের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করবেন? সেই সঙ্গে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী গ্রহণ, সেগুলো অনুসন্ধান এবং জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : সম্পদ বিবরণী প্রকাশের বিষয়টিকে ‘সিঙ্গেল আউট’ করা ঠিক হবে না। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি ভাবতে হবে। তবে আমার চিন্তায় এটি রয়েছে। যেহেতু এটি নীতিগত বিষয় তাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আলাপ করব।

যুগান্তর : দুদকে যোগ দেয়ার পর এটিই আপনার দেয়া প্রথম সাক্ষাৎকার। এ কারণে যুগান্তরের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

ইকবাল মাহমুদ : যুগান্তর আমার পছন্দের পত্রিকা। এটি বস্তুনিষ্ঠ ও ভালো সংবাদ পরিবেশন করে। দুদক কার্যক্রমের গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করছি। ধন্যবাদ যুগান্তরকেও।