প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন মডেল

সোনার বাংলার উন্নয়ন-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বিনিয়োগ সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়ন করে স্থায়ী উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্বর্ণালি অধ্যায় রচনা করলেন। ফলে ‘ভিক্ষার ঝুলি তত্ত্বের’ ভিত্তিতে পরিচালিত যে উন্নয়নতত্ত্ব এত দিন ধরে চলে আসছিল তার স্থলে ‘বিনিয়োগকেন্দ্রিক উন্নয়ন’ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। এদিক থেকে বিবেচনা করলে সদ্য সমাপ্ত বিনিয়োগ সম্মেলনটিকে কেবল ব্যবসা-সম্মেলন হিসেবে অভিহিত না করে একে এমন একটি উন্নয়ন ধারণা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যার জন্য জাতি ও দেশ এত বছর অপেক্ষা করেছে; কিন্তু তা কেবল উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছিল। ওই বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের স্বরূপ, কাঠামো এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করে বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। প্রথমে একটু অর্থনৈতিক তত্ত্বের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। একটি দেশের বা সমাজের উন্নয়নের জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায় উদ্যোগের গুরুত্ব অর্থনীতিতে কোনো নতুন কথা নয়। এ ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ওই দেশ বা সমাজের নাগরিকদের ব্যক্তিগত সঞ্চয় (Private savings) এবং ওই দেশের সামষ্টিক সঞ্চয় (Public savings) থেকে আহরিত অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ-ভিত্তি তৈরি করতে হয়। সে কারণে কোনো দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ প্রত্যয়গুলোকে উন্নয়নের সমীকরণে সমান্তরালে রাখা হয়েছে। ম্যাক্সিম বয়কো (Maxim Boyako), আন্দ্রে শ্লেফার (Andrei Spleifer) ও রবার্ট ভিশনিসহ (Robert Vishny) প্রথম সারির উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা-বাণিজ্যের ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন হয় এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। মনোবিজ্ঞানীরাও ব্যক্তির প্রণোদনার (incentive) বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে এমন ব্যবসা-মডেলের গুরুত্ব আলোচনা করেছেন। তবে বল্গাহীন স্বাধীনতা অনেক সময় স্বেচ্ছাচারিতায় রূপান্তরিত হয় বলে এ ক্ষেত্রে কেনসীয় অর্থনীতি (Keynesian economy) সীমিত পরিসরে রাষ্ট্রিক নিয়ন্ত্রণের (limited state control) পরামর্শ দিয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন মডেলকে তাই সেকেলে পুঁজিবাদ (steriotyped capitalism) হিসেবে ভাবা ঠিক হবে না, আবার একে ক্লাসিক্যাল সমাজতন্ত্র (classical socialism) হিসেবেও এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন মডেলটিকে এ দুই ধারার পরস্পরবিরোধী উন্নয়নতত্ত্বের সংমিশ্রণে তৈরীকৃত একটি সৃজনশীল, স্বচ্ছ ও সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত করতে হবে। সদ্য অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলনে উপর্যুক্ত অর্থনৈতিক তত্ত্বের নিরিখে বিনিয়োগবান্ধব উন্নয়নের নীতি-কৌশল উপস্থাপিত হয়েছে। এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে বিনিয়োগ বোর্ড, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (BUILD) ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর (PMO)—এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে। এ স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানত্রয় দেশ-বিদেশের শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে জমায়েত করে বিনিয়োগ বৃদ্ধির রূপফলক তৈরি করার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএফসিসহ অন্যান্য সংস্থা বাংলাদেশের উন্নয়নে বৈশ্বিক বিনিয়োগের অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরেছে। ভারতের আদানি গ্রুপ, রিলায়েন্স গ্রুপসহ চীন ও জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলো ওই সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে অভ্যন্তরীণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বয় ঘটিয়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি তৈরিতে নীতি প্রণয়ন করেছে। বিল্ডের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ‘বিনিয়োগ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ব্যক্তি-বিনিয়োগের সুযোগগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সবার সহযোগিতা, সমন্বয় ও অংশগ্রহণে পরিশীলিত উন্নয়নের প্রয়োজনীয় নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।’ এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জননেত্রী শেখ হাসিনা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে বৈশ্বিক বিনিয়োগের নীতি, ধারা ও সম্ভাবনাকে চুলচেরা অধ্যয়নের প্রতিও গুরুত্বারোপ করেছেন। বিনিয়োগ সম্মেলনটিকে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে বিনিয়োগ করার গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তবে বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়নের এ মডেল বাস্তবায়ন করতে হলে সম্মেলনের বক্তব্য-বিবৃতিকে কেবল রাজনৈতিক বাক-চাতুর্যের মোড়কে আচ্ছাদিত রাখলে চলবে না। অতি শিগগিরই বিনিয়োগক্ষেত্রের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো গড়ে না তোলা। দেশের আনাচকানাচ ঘিরে যে ছোট-বড় রাস্তা রয়েছে তার যুগান্তকারী উত্কর্ষ সাধন করতে হবে এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে। আমাদের মতো ছোট্ট একটি দেশের প্রতিটি অঞ্চল—গ্রাম, ইউনিয়ন, মহল্লা, থানা, জেলার রাস্তাঘাট এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে অতিদ্রুত দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করা যায়। সাগরের মধ্যে স্থাপিত একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ-ভূখণ্ডকে সিঙ্গাপুর ব্যবহার করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটিয়ে সিঙ্গাপুরের উন্নয়নে যে ভূমিকা রেখেছে এবং জাপান, চীন, হংকং যেভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে—আমাদেরও সেভাবে নীতি গ্রহণ করতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ত্বরিতগতির যানবাহন, অর্থনৈতিক এলাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে হবে। এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে জননেত্রী বলেছেন, ‘সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় অবকাঠামোগত বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উত্পাদনের জন্য রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা (Special economic zone) সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এবং হবে।’ বিনিয়োগ সম্মেলনে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ সহজ করতে প্রধানমন্ত্রী সত্বর বাংলাদেশ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (Bangladesh Development Authority) প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকার করেছেন। ইতিমধ্যে অন্যূন ১০০টি অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠার সাফল্যও তিনি তুলে ধরেন, যা উন্নয়নবান্ধব পরিবেশের উজ্জ্বল চিত্র। বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়নের জন্য দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো আমাদের আইনশৃঙ্খলার ক্রমাবনতি। প্রতিদিনকার খবরের কাগজের প্রথম পাতায় চোখ রাখলেই আঁতকে উঠতে হয় মৃত্যু, খুন, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, বোমাবর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, হরতাল, বিক্ষোভ, রাস্তা আটকিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির মোচ্ছবের খবরে। তিলোত্তমা ঢাকার মতিঝিল থেকে শাহবাগের পাঁচ মিনিটের রাস্তা পার হতে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ঢাকার মানুষগুলো অব্যক্ত মর্মবেদনায় চোখ বুজে গাড়িতে বসে ঝিমাতে থাকে। গণপ্রশাসন ব্যবস্থাপনা (POM), পুলিশ প্রশাসন, গোয়েন্দা তত্পরতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে না তুলতে পারলে বৈশ্বিক বিনিয়োগের অবারিত সম্ভাবনা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরাও নিরুৎসাহ হবে। বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হলো এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য। প্রায় সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিভিন্নরূপ প্রক্রিয়া চালু আছে এবং সবার চোখের সামনেই তা ঘটছে। ব্যবসায়ের লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গঠন, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ, ব্যবসা পরিচালনা, বাজারজাতকরণ—সব পর্যায়েই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ফায়দা লুটার ধান্দাবাজি সর্বজনবিদিত। অচিরেই এ ঘৃণ্য কাজগুলো বন্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ সৃষ্টি করলেই শুধু চলবে না, বিদেশেও বাংলাদেশি বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। সত্তরের দশকের অন্তর্মুখী উন্নয়ন কর্মসূচিকে এখন বহির্মুখী রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি সম্প্রসারণে প্রতিস্থাপিত করতে হবে। সর্বোপরি উন্নয়ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগকে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের স্বচ্ছ-সাবলীল ধারায় যুক্ত করতে হলে ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে গবেষণা, অধ্যয়ন ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। আমাদের দেশের বার্ষিক বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়নে কতটুকু বরাদ্দ থাকে এবং তা কিভাবে কাজে লাগানো হয়, তা কি নীতিনির্ধারকরা খোঁজ রাখেন? এ ব্যাপারে নির্মোহ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কেবল ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার উন্নয়ননীতির সমন্বয় কমিটি (PSDPCC) গঠন করলে চলবে না। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে হবে। বিনিয়োগের খাত চিহ্নিত করা, বিনিয়োগ-পরবর্তী পারিবেশিক প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি সমাজের উন্নয়নে ব্যবসার কর্তব্য, নিষ্ঠা ও অবদান (social commitment of business organization) প্রভৃতি বিষয়ে কারিগরি, বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করে এ ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে তা সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশমাতৃকার তলাবিহীন ঝুড়ির অভিশাপ মোচন করে ভিক্ষার ঝুলির পরিবর্তে বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন মডেলের যে নতুন ধারা প্রধানমন্ত্রী সূচনা করেছেন এর জন্য তাঁকে রইল সোনালি সংবর্ধনা।