রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাম্পার ফলন বাতাসে আমের ঘ্রাণ

বাজারে আম আসতে এখনও এক সপ্তাহ বাকি। বাতাসে পাওয়া যাচ্ছে পাকা আমের ঘ্রাণ। এরই মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। প্রস্তুত আছে প্রশাসনও। আমে যাতে রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ না করা হয়, সেজন্য কড়া নজর রাখছেন তারা। রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তারা সংশ্লিষ্টদের সতর্ক ও সচেতন করছেন। দেশীয় বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি রাসায়নিক বা বিষমুক্ত এ আম রফতানি করা হবে বিভিন্ন দেশে। এ বছর অনেক জায়গায় আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। সেখানকার চাষিরা লাভের আশায় স্বপ্নের জাল বুনছেন। আবার কোথাও আশানুরূপ ফলন হয়নি। সেখানকার চাষিরা লোকসানের আশঙ্কা করছেন। ব্যুরো ও সংবাদদাতাদের খবর
রাজশাহী : রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আবদুল আলীম জানান, এবার রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৯ টন। হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৫ দশমিক ৫৮ টন আম উৎপাদন হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। এবার আমের মুকুল যে হারে এসেছিল, তাতে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করছেন আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এদিকে এবার আম কেমিক্যালমুক্ত রাখতে প্রশাসন কড়া নজরদারি করছে। আম চাষে অনুসরণ করা হচ্ছে ব্যাগিং পদ্ধতি। বাঘায় কেমিক্যাল মেশানোর অভিযোগে বিপুল পরিমাণ আম ধ্বংস করেছে প্রশাসন। চাষি ও ব্যবসায়ীরা প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছেন, তারা কেমিক্যাল মিশিয়ে আম পাকাবেন না। কিছু ব্যবসায়ীর কারণে রাজশাহী অঞ্চলের আম ব্যবসা নিয়ে দেশজুড়ে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিও প্রতিরোধে ব্যবসায়ী ও চাষিরাই একযোগে কাজ করবেন। রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে এরই মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাষি ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে একাধিক বৈঠক, উঠান বৈঠক, ভিডিও কনফারেন্স, আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ : পাঁচ উপজেলায় ২৪ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে আমগাছ রয়েছে ১৮ লাখ ৭৪ হাজার ৯০০। গত বছর ২৪ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৫০ হাজার টন। কৃষি বিভাগ বলছে, আম প্রধান অর্থকরি ফসল হওয়ায় প্রতি বছরই জেলায় আমবাগান ও গাছের সংখ্যা বাড়ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ড. মোহাঃ শামস-ই-তাবরিজ জানান, এ বছর জেলায় ৯০ শতাংশ আমগাছে মুকুল এসেছিল এবং আমের ফলনও ভালো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আমের বাম্পার ফলন হবে। শহরের বাসুনিয়া পট্টির আমবাগান মালিক হাসান আল সাদী পলাশ জানান, এ বছর ৫ লাখ টাকা দিয়ে তিনটি বাগান কিনেছেন তিনি। বাগানে পর্যাপ্ত আম রয়েছে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে তিনি লাভবান হবেন। এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ জাহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এক সভায় ২৫ মে থেকে বিষমুক্ত আম বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত হয়। কেউ আমে রাসায়নিক পদার্থ ছিটালে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে।
মেহেরপুর : জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক এস এম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জেলায় এবার আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জেলায় হিমসাগর, ল্যাংড়া, বোম্বাই, ফজলি, আম্রপালিসহ বিভিন্ন জাতের আম চাষ করা হয়েছে। চাষিরা জানান, বৈরী আবহাওয়ায় এ বছর আমের ফলন ভালো হয়নি। তারপরও এখানকার সুস্বাদু আম ইউরোপে রফতানির উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। এরই মধ্যে বেশকিছু চাষির সঙ্গে চুক্তি করেছেন রফতানিকারকরা। চুক্তি অনুযায়ী মানসম্মত আম পেতে ফ্রুট ব্যাগ দিয়ে আম ঢেকে দেয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চাষিদের আগ্রহ কম।
সাতক্ষীরা : জেলায় ৩ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ টন আম বিদেশে রফতানি করা যাবে। এজন্য এরই মধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশবান্ধব নিয়ম অনুসরণ করে সাতক্ষীরায় উৎপাদিত আম এবারও যাচ্ছে ইউরোপে। উন্নত দেশে কীভাবে গাছ থেকে নিরাপদে আম সংগ্রহ করা হয়ে থাকে, সে কৌশল শেখানো হয়েছে চাষিদের। নিরাপদ আম সংগ্রহে চাষিদের হাতে নির্দিষ্ট তাপে আমের পচন রোধে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, হ্যান্ডগ্লোবসসহ নানা সরঞ্জামও তুলে দেয়া হয়েছে। কোনো আমে রাসায়নিক ছিটানো হয়নি। কলারোয়া উপজেলার ইলিশপুর গ্রামের আম চাষি শিমুল হোসেন জানান, ৮৫ শতাংশ জমিতে ল্যাংড়া ও হিমসাগর আমের বাগান করেছেন তিনি। এ বছর ফলন কম হয়েছে।
নওগাঁ : সাপাহার, পোরশা ও নিয়ামতপুর উপজেলায় এবার আমের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখানে সাধারণত হাইব্রিড জাতের আম্রপালি, চুষা, মল্লিকা, বারি-৩, বারি-৪ ও দেশি জাতের ফজলি, সুরমা ফজলি, নাক ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাতি, মোহনভোগ, দুধসরসহ বিভিন্ন জাতের আম উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে আম সংরক্ষণাগার না থাকায় দরপতনের আশঙ্কায় আছেন চাষিরা। এদিকে মৌসুম শুরুর আগেই আম আড়তগুলো সংস্কারে ধুম পড়েছে। প্রতিদিন শত শত শ্রমিক আড়তে ব্যস্ত সময় পার করছেন। উপজেলার আম ব্যবসায়ী বাবুল মেম্বার জানান, তার আড়তে প্রায় ৫০ শ্রমিক কাজ করেন। আমদানিও হয়ে থাকে প্রচুর। সাপাহার উপজেলা কৃষি অফিসার এ এফ এম গোলাম ফারুক হোসেন জানান, উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫ হাজার ২০০ আমবাগান রয়েছে। বাগানগুলোতে প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির আমগাছ রয়েছে। এ উপজেলা থেকে উৎপাদিত আম দেশের বিভিন্ন স্থানের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব।
দিনাজপুর : ১৩ উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৪ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। এবার সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় আমের ফলন আশানুরূপ হবে না বলে বাগান মালিকরা আশঙ্কা করছেন। চৈত্র ও বৈশাখ মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় তাপপ্রবাহ এবং প্রচ- রোদে আমের প্রচুর মুকুল ঝরে গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক গোলাম মোস্তফা জানান, বাগান মালিকরা শ্যালোমেশিন দিয়ে গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পানি দিয়েছেন। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হবে না। তিনি বলেন, দিনাজপুরে ল্যাংড়া, ছাতাপড়া, ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনীসহ অন্যান্য জাতের আমের ফলন মন্দ হবে না। বাগান মালিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ধারণা, গতবারের তুলনায় এবার আমের দর কিছুটা বাড়বে। তবে লোকসানের আশঙ্কা তারা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।