‘করের স্বর্গ’ থেকে বাড়ছে বিনিয়োগ

করের স্বর্গ বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ছে। বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, কেম্যান আইল্যান্ড, হংকং, মরিশাস, পানামা, সিসিলিসহ কয়েকটি দেশ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে এফডিআই বেড়েছে। এ ছাড়া মালটা, ভানুয়াতুর মতো দেশ থেকেও বাংলাদেশে বিনিয়োগ আসছে। এফডিআই নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ ষান্মাসিক প্রতিবেদন (ডিসেম্বর ২০১৫ ভিত্তিক) বিশ্লেষণ করে এ প্রবণতা দেখা গেছে।

সম্প্রতি পানামার আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার যে তথ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে ফাঁস করেছে, তাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধনিক গোষ্ঠী ওইসব দেশে অফশোর কোম্পানি খুলে বিনিয়োগ করেছেন বলে তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৩ সালেও এ সংগঠনটি অফশোর লিকস নামে বিভিন্ন দেশে অফশোর কোম্পানি খোলার তথ্য প্রকাশ করে। অফশোর কোম্পানি খুলে যে কোনো ধরনের অর্থ নিরাপদে বিনিয়োগ ও কর সুবিধা থাকায় এসব দেশকে ‘করের স্বর্গ’ বলা হয়ে থাকে।

কোন কোন কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে তা জানা যায়নি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ওইসব দেশ থেকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া থেকে এ ধারণা করা যায় যে, পাচার হয়ে যাওয়া কিছু অর্থ হয়তো ফেরত আসতে পারে। বিশেষত বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ থেকে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টি কিছুটা রহস্যজনক। তবে অনুসন্ধান ছাড়া নিশ্চিত করে বলা ঠিক হবে না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম অর্থ পাচার নিয়ে গবেষণা করেন। জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড বা এরকম করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশ থেকে বাংলাদেশে এফডিআই আসার দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে। এক, হয়তো বাংলাদেশ প্রচারের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যটি হচ্ছে, বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণী, যারা তাদের কালো টাকা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের অর্থই এসব দেশ ঘুরে বিনিয়োগ হিসেবে ফের বাংলাদেশে আসছে। এতে যেমন কালো টাকা বৈধ হলো, তেমনি এফডিআইয়ের যে সুবিধা সেটাও পাওয়া গেল।

বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ এফডিআই হিসেবে ফেরত আসা অসম্ভব কিছু নয়। সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ছাড়া সুনির্দিষ্ট কিছু বলা ঠিক হবে না। সরকারের তদন্ত করা উচিত। গত বৃহস্পতিবার এনইসি বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ থেকে যে অর্থ পাচারের কথা বলা হচ্ছে, তা নানা কারণে হতে পারে। তবে বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন সুযোগ-সুবিধা আছে যে, পাচার করা অর্থও ফিরে আসতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৩ সালে বারমুডা থেকে বাংলাদেশে এফডিআই আসে ৫৭ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা ২০১৪ সালে বেড়ে ৭৮ লাখ ৪০ হাজার এবং ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এক কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ এসেছে। পাঁচ বছর আগে এ দেশ থেকে বাংলাদেশে কোনো বিনিয়োগ ছিল না। ২০১২ সালে প্রথমে তিন লাখ ৮০ হাজার ডলারের বিনিয়োগ আসে।

পানামা থেকে পাঁচ বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ বেড়েছে ১০ গুণ। ২০১০ সালে দেশটি থেকে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার ডলারের বিনিয়োগ এসেছিল। অফশোর কোম্পানির বিনিয়োগ নিয়ে আলোচিত দেশটি থেকে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ২৩ লাখ ৮০ ডলারের এফডিআই এসেছিল। ২০১৪ সালে সেটি বেড়ে ৩৮ লাখ ২০ হাজার এবং ২০১৫ সালে ৫৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার বিনিয়োগ এসেছে।

একইভাবে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড থেকে ২০১৩ সালে পাঁচ কোটি ২৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার এফডিআই আসে। পরের বছর কমে দাঁড়ায় চার কোটি ৬০ হাজার ডলারে। তবে ২০১৫-তে আবারও এ বিনিয়োগ কিছুটা বেড়ে চার কোটি ১০ লাখ ২০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। পানামা পেপারসে আলোচিত এ দেশটি থেকে পাঁচ বছর আগে ২০১০ সালে প্রথমে ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ আসে। বাংলাদেশের যেসব ব্যক্তির নাম পানামা পেপারসে এসেছে তাদের অধিকাংশের বিনিয়োগ ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে।

কেম্যান আইল্যান্ড থেকেও ২০১০ সালে প্রথমে বিনিয়োগ আসে বাংলাদেশে। ওই বছর ১২ লাখ ডলার বিনিয়োগ এসেছিল। এফডিআই ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ক্যারিবিয়ান সাগরের এ দ্বীপরাষ্ট্র থেকে ২০১৩ সালে ১০ লাখ ৮০ হাজার, ২০১৪ সালে ২৯ লাখ ১০ হাজার এবং ২০১৫ সালে ৩০ লাখ ৭০ হাজার ডলার এফডিআই এসেছে। মরিশাস থেকে ২০১৩ সালে দুই কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার, ২০১৪ সালে এক কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ও ২০১৫ সালে এক কোটি ৬৩ লাখ ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ এসেছে।

মালটা থেকে ২০১৫ সালে ৬৯ লাখ ডলার, ফিলিপাইন থেকে ৪৬ লাখ ২০ হাজার ডলার, আয়ারল্যান্ড থেকে সাত লাখ ৭০ হাজার ডলার, উরুগুয়ে থেকে ১০ হাজার ডলার এবং ভানুয়াতু থেকে ৬০ হাজার ডলার এফডিআই এসেছে।

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগে অনেক সুবিধা রয়েছে। মূলধন ও লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীরা ফেরত নিতে পারেন। কর অবকাশ সুবিধা পান বিনিয়োগকারীরা। ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঁচ বছর পর্যন্ত এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিনিয়োগে সাত বছর পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে কর অবকাশ

সুবিধা রয়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ২২৩ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে।

২০১৪ সালে যা ছিল ১৫৫ কোটি ১৩ লাখ ডলার।