জাতীয় জাদুঘরে নিদর্শন এক লাখ ছাড়াল

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বছর নোবেল পুরস্কার পান, সে বছর প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা জাদুঘর। লর্ড কারমাইকেল এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট পরিসরে ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট ঢাকা জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। এই জাদুঘরকে তিলে তিলে গড়ে তোলেন ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী। পরে ড. আহমেদ হোসেন দানী, ড. এনামুল হক, ড. ফিরোজ মাহমুদ প্রমুখ জাতীয় পর্যায়ের এই প্রতিষ্ঠানটিকে অনেক সমৃদ্ধ করেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ড. এনামুল হক জাদুঘরের জন্য কাজ করেছেন। তিনিই জাদুঘরের প্রথম মহাপরিচালক হন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর জাতীয় জাদুঘর যাত্রা শুরু করে। শুরুর দিকে ৩৭৯টি নিদর্শনসহ জাদুঘরটি দর্শকের জন্য খুলে দেওয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরের পর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর অধ্যাদেশ ১৯৮৩ জারি করে ঢাকা জাদুঘরের সব সম্পদ, নিদর্শন, দায়দায়িত্ব, কর্মচারী-কর্মকর্তাকে জাতীয় জাদুঘরের সঙ্গে আত্তীকৃত করা হয়। বর্তমানে এ জাদুঘরের ভাণ্ডারে আছে ১ লাখের বেশি দুর্লভ নিদর্শন। গত বছর পর্যন্ত সংগ্রহ ছিল ৮৮ হাজার নিদর্শন। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এই জাদুঘরটি ২০১৩ সালে উদযাপন করেছে প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শাহবাগের এই জায়গা এবং জাদুঘরটি সরকারিকরণের ব্যবস্থা করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার মতোই এই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি অত্যাধুনিক ও বিশ্বমানের জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন। ২০২১ সাল নাগাদ

এই ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হবে। জাতীয় জাদুঘর এরই মধ্যে তাদের প্রায় এক লাখ নিদর্শনের তথ্য ডিজিটালাইজেশন করেছে।

এ বাস্তবতায় আজ বুধবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হবে। এবার দিবসের স্লোগান ‘মিউজিয়ামস অ্যান্ড কালচারাল ল্যান্ডস্কেপ’ বা ‘জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক স্থলভূমির দৃশ্য’। সকাল ১১টায় জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এই বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।

ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা, জাতিতত্ত্ব ও অলঙ্করণ শিল্পকলা, সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা, প্রাকৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন নিদর্শন দেখতে জাদুঘরে দিনে গড়ে আড়াই হাজার দেশি-বিদেশি দর্শক আসছেন। দর্শনার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গত বছর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬০০ দর্শনার্থী জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। তবে জাদুঘরে সংগ্রহ ১ লাখ ছাড়িয়ে গেলেও দর্শকদের বেশিরভাগ নিদর্শন দেখার সুযোগ নেই। জায়গার অভাবে নিদর্শনগুলো প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। মাত্র ৫ হাজার নিদর্শন প্রদর্শন করা হচ্ছে। তবে আশার কথা শোনালেন জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘অচিরেই জাতীয় জাদুঘর থেকে সব প্রশাসনিক কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জাদুঘরের পেছনে নিজস্ব জমিতে প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। সেখান থেকেই প্রশাসনিক কার্যক্রম চলবে। তখন বর্তমান জাদুঘর ভবনটি হয়ে উঠবে পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর। এতে আরও বেশ কিছু নিদর্শন প্রদর্শন করা সম্ভব হবে।

শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের চারতলা ভবনের ৪৪টি গ্যালারিতে ২০ হাজার বর্গমিটারের মধ্যে মাত্র পাঁচ হাজার নিদর্শন সাজানো আছে। অন্য নিদর্শনগুলো গুদামজাত করে রাখা হয়েছে। জায়গা স্বল্পতার কারণে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নতুন করে নিদর্শন সংগ্রহে খুব একটা উৎসাহ পাচ্ছে না। তবে জায়গা থাকুক বা না থাকুক, নিদর্শন সংগ্রহ থেমে নেই। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে বর্তমান মাস পর্যন্ত ১৪ হাজার নিদর্শন সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ব্যবহৃত একটি বাইসাইকেল, নভেরা আহমেদের একটি ভাস্কর্য, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীনের স্মৃতিস্মারক।

জাতীয় জাদুঘরের সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগ চালু হয় ১৯৭৪ সালে। নিদর্শন সংরক্ষণে এ বিভাগের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্তৃপক্ষ জানায়, এ বিভাগেও যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া জাদুঘরে নিদর্শনের রেপ্লিকা তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অবকাঠামো নেই। জাদুঘরের সংগ্রহশালা থেকে সাড়ে ৭ হাজার নিদর্শনের বিশদ বিবরণ দিয়ে একটি ক্যাটালগ প্রকাশ করার কাজ হাতে নিয়েছে জাতীয় জাদুঘর। বিশ্বসভ্যতার গ্যালারি পুনর্স্ট্থাপিত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১ জুন কাজ শুরু হবে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খুলে দেওয়া হবে এই গ্যালারি। যেখানে প্রাচীন আমল থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের তথ্য তুলে ধরা হবে।

বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও জাদুঘরকে তথপ্রযুক্তি ব্যবহারে আধুনিকায়নের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ছয়টি শাখাসহ জাদুঘরে প্রদর্শিত নিদর্শনের দালিলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ায় ‘অবজেক্ট আইডি’ তৈরি করছে জাতীয় জাদুঘর। অতীতে জাদুঘর থেকে বিভিন্ন নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। তাই জাদুঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক করা হয়েছে। জাতীয় জাদুঘরের সঙ্গে ছয়টি শাখা জাদুঘরের নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে। জাতীয় জাদুঘরের অধীনে রয়েছে ছয়টি শাখা জাদুঘর। সেগুলো হলো আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, ওসমানী স্মৃতি জাদুঘর, জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, স্বাধীনতা জাদুঘর, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন সংগ্রহশালা ও সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ জাদুঘর।